Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬

ডিভিসির জলে দক্ষিণবঙ্গে ফের বন্যার ভ্রুকুটি! নবান্নে উদ্বেগ, দামোদর সংলগ্ন চার জেলায় জারি সতর্কতা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ডিভিসির জলে দক্ষিণবঙ্গে ফের বন্যার ভ্রুকুটি! নবান্নে উদ্বেগ, দামোদর সংলগ্ন চার জেলায় জারি সতর্কতা

পুজোর মুখে ফের প্লাবনের আশঙ্কা দক্ষিণবঙ্গে। এক দিকে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে টানা বৃষ্টি, অন্যদিকে ঝাড়খণ্ড ও বিহারে প্রবল বৃষ্টির জেরে ডিভিসির জলাধারগুলিতে বাড়ছে জলের চাপ। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার থেকে জল ছাড়তে শুরু করেছে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (ডিভিসি)। ফলে দামোদরের নিম্ন অববাহিকা জুড়ে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ নজরে রাখা হয়েছে হাওড়া, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমানএই চার জেলাকে।

ডিভিসি সূত্রে খবর, বুধবার থেকেই মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার থেকে জল ছাড়া শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার মাইথন থেকে প্রায় ৫৮ হাজার কিউসেক এবং পাঞ্চেত থেকে প্রায় ৬০ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হচ্ছে। দুই জলাধার মিলিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ১৮ হাজার কিউসেক জল দামোদর হয়ে এসে পৌঁছচ্ছে দুর্গাপুর ব্যারাজে। অন্যদিকে, আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে গত কয়েক দিনের বৃষ্টির জলও দুর্গাপুর ব্যারাজে জমা হচ্ছে। সেচ দফতর সূত্রে খবর, ব্যারাজ থেকেও জল ছাড়ার পরিমাণ এক লক্ষ কিউসেক ছাড়িয়েছে। কোথাও কোথাও তা ১ লক্ষ ১১ হাজার কিউসেকেরও বেশি হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।

ডিভিসির জলাধারগুলিতে জলের চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ ঝাড়খণ্ডের প্রবল বৃষ্টি। কোনার ও তিলাইয়া জলাধার থেকে জল মাইথনে আসে। তেনুঘাটের জল আসে পাঞ্চেতে। মাইথন ও পাঞ্চেত থেকে ছাড়া জল আবার দামোদর নদ হয়ে পৌঁছয় দুর্গাপুর ব্যারাজে। সেখান থেকেই সে জল নেমে যায় দামোদরের নিম্ন অববাহিকার দিকে। ফলে উপর দিকে বৃষ্টির জেরে জলাধারগুলিতে চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নীচের দিকেও তৈরি হচ্ছে বাড়তি জলপ্রবাহের চাপ। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ডিভিসির তরফে কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সাধারণত দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকে এক লক্ষ কিউসেকের বেশি জল ছাড়া হলে নিম্ন দামোদর অববাহিকায় প্লাবনের আশঙ্কা তৈরি হয়। এ বারও সেই সীমা পেরিয়েছে জল ছাড়ার পরিমাণ। ফলে দামোদর তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলিতে আগাম সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।

ডিভিসি সূত্রে জানা গিয়েছে, জল দুর্গাপুরে পৌঁছনোর কথা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ জল পৌঁছতে পারে সদরঘাটে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ তা পৌঁছতে পারে সুরেকালনায়। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ চাপাডাঙায় এবং শনিবার রাত আড়াইটে নাগাদ আমতায় জল পৌঁছনোর সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, স্থানীয় ভাবে বৃষ্টি কমে গেলেও ডিভিসি থেকে ছাড়া জলের প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দক্ষিণবঙ্গের নদীগুলিতে জলস্তর বাড়ার আশঙ্কা থাকছে। তার মধ্যে ঝাড়খণ্ডে ফের ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যেই ডিভিসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছেন রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিকেরা। ভবিষ্যতে আরও কত পরিমাণ জল ছাড়া হতে পারে, সেই বিষয়ে ডিভিসির কাছ থেকে নিয়মিত তথ্য নেওয়া হচ্ছে। সে অনুযায়ী আগাম প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে হাওড়া, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমান জেলা প্রশাসনকে।

নবান্নের তরফে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলির জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। নদীর জলস্তর বাড়লে নিচু এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ জায়গা বা ফ্লাড সেন্টারে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। নদীবাঁধগুলির উপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সেচ দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকে জল ছাড়ার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। বৃষ্টি না কমলে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাড়তি জল ছাড়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাই নিম্ন দামোদর এলাকার জেলা প্রশাসনকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

ডিভিসির ছাড়া জল নেমে আসার ফলে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ হুগলির আরামবাগ মহকুমা, পুরশুড়া ও খানাকুল, হাওড়ার আমতা ও উদয়নারায়ণপুর এবং পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর ও রায়নার নিচু এলাকাগুলিকে ঘিরে। দামোদরের জল দ্বারকেশ্বর, মুণ্ডেশ্বরী, রূপনারায়ণ-সহ বিভিন্ন নদীতে এসে পড়লে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আরামবাগ মহকুমার বিভিন্ন নদীতে ইতিমধ্যেই জলস্তর বাড়ছে। খানাকুলের নিচু এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। প্রশাসনের তরফে রাতেই মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে। ফেরিঘাটগুলিতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নদীপথে যাতায়াতের সময় নৌকায় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। খানাকুলের বিধায়ক সুশান্ত ঘোষও নদীপথে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় হুগলির জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদরি জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।

ডিভিসির জল ছাড়ার উদ্বেগের পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টিতে নিকাশি ব্যবস্থার বেহাল ছবিও সামনে এসেছে। কলকাতা ও শহরতলিতে গত কয়েক দিন ধরে দফায় দফায় বৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও অল্প বৃষ্টিতেই জল জমছে। সেই জল নামার আগেই ফের বৃষ্টি হওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে। বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই কলকাতা ও শহরতলিতে কয়েক ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় বৃষ্টি হয়েছে। কলকাতা শহরের বড়ো কোনো এলাকায় জল জমার খবর না এলেও সংলগ্ন জেলাগুলির একাধিক জায়গায় জলমগ্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার দমদম, পানিহাটি ও বারাসতের বেশ কিছু ওয়ার্ডে জল জমেছে। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের একাধিক এলাকাও জলমগ্ন। খড়দহ ও নৈহাটিতেও জল জমেছে। বনগাঁ শহর সংলগ্ন কয়েকটি এলাকায় চাষের জমিতে জল ঢুকতে শুরু করেছে। বৃষ্টির জেরে ইছামতী নদীর জলস্তরও বেড়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছয়নি। রেল ও সড়কপথে গণপরিবহণও মোটের উপর স্বাভাবিক।

ডিভিসির জল ছাড়ার আশঙ্কার মধ্যেই হুগলির বিভিন্ন এলাকায় নিকাশি ব্যবস্থার বেহাল দশা নতুন করে সমস্যা তৈরি করেছে। সপ্তগ্রাম পঞ্চায়েতের চক বাঁশবেড়িয়া ও শঙ্খনগর এলাকায় রাস্তা থেকে জল নামছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে উদাসীনতার অভিযোগও উঠেছে। পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ফিরোজ আনসারি জানিয়েছেন, নিকাশির একটি জায়গা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সেটি করা হলে আগামী দিনে সমস্যা থাকবে না। যদিও জমা জল কবে নামবে, সেই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও উত্তর মেলেনি। উত্তরপাড়া শহরেও একই ছবি। বিভিন্ন রাস্তায় জল জমে রয়েছে। এমনকি উত্তরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতাল চত্বরেও গোড়ালিসমান জল জমেছে। সেই জল পেরিয়েই ওপিডি থেকে জরুরি বিভাগে যেতে হচ্ছে রোগী ও তাঁদের পরিজনদের।

টানা বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে বীরভূমেও। জেলার একাধিক নদীর জলস্তর বেড়েছে। কোপাই নদীর জল বাড়ায় ফের জলমগ্ন হয়েছে কঙ্কালীতলা মন্দির। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে জলমগ্ন এলাকা ঘিরে দিয়েছে। ডিভিসির জল ছাড়ার প্রভাব পড়লে জেলার আরও কয়েকটি নদীর জলস্তর বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফুলেফেঁপে উঠেছে লাভপুরের কুয়ে নদীও। কাঁদরকুলা থেকে বাঘসিনা যাওয়ার রাস্তা সম্পূর্ণ জলের তলায় চলে যাওয়ায় ওই পথে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। নদী পারাপারের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জলস্তর আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নদীর জল বাড়লে কীর্ণাহারের পাশাপাশি বাঘসিনা, জয়চন্দ্রপুর, খাঁপুর, চতুর্ভুজপুর-সহ প্রায় ১৫টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সব মিলিয়ে দক্ষিণবঙ্গে এখন জোড়া আশঙ্কাএক দিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে ঝাড়খণ্ড থেকে নেমে আসা জল। বৃষ্টি থামলেও ডিভিসির ছাড়া জল নিম্ন দামোদর অববাহিকায় পৌঁছতে সময় লাগবে। ফলে আগামী ৪৮ ঘণ্টা হাওড়া, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমানের নদী তীরবর্তী এবং নিচু এলাকাগুলিতে বাড়তি সতর্কতা জারি রাখছে প্রশাসন। মজুত রাখা হচ্ছে ত্রিপল, শুকনো খাবার, ওষুধ ও পানীয় জল। প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীও। নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার আবেদন জানানো হয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!