- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
নিউটাউনে ২৫ কোটির ‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’-এর শিলান্যাস মুখ্যমন্ত্রীর, দায়িত্ব টলিউডের হাতে, সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মিঠুন
মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ। তাঁকে ঘিরে বাঙালির আবেগ, স্মৃতি এবং নস্ট্যালজিয়ার কমতি নেই। কিন্তু সে আবেগকে শুধু কয়েক দিনের অনুষ্ঠানেই আটকে রাখতে চাইছে না রাজ্য সরকার। মহানায়কের নামেই এ বার নিউ টাউনে তৈরি হতে চলেছে অত্যাধুনিক ‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’। শুক্রবার নিউ টাউনে এই প্রকল্পের ভূমিপুজো ও শিলান্যাসের মধ্য দিয়ে শুরু হলো তার আনুষ্ঠানিক পথচলা। প্রাথমিক ভাবে এই প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শুক্রবার হাজির ছিলেন টলিউডের একাধিক প্রজন্মের শিল্পী। ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী, রঞ্জিত মল্লিক, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, যিশু সেনগুপ্ত, রুদ্রনীল ঘোষ-সহ অনেকে। মহানায়ককে স্মরণ করার পাশাপাশি এ দিনই তাঁর নামে তৈরি হতে চলা ফিল্ম সেন্টারের পরিকল্পনাও প্রকাশ্যে আনেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গোটা প্রকল্পকে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে।
প্রথম অংশে থাকবে ২টি আধুনিক সিনেমা হল। প্রতিটি হলে ৭৫০ জন দর্শকের বসার ব্যবস্থা থাকবে। অর্থাৎ একসঙ্গে ১৫০০ দর্শক ছবি দেখতে পারবেন। তার সঙ্গে থাকবে প্রিভিউ থিয়েটার, ফুড কোর্ট এবং গাড়ি রাখার ব্যবস্থা। দ্বিতীয় অংশটি হবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য। সেখানে তৈরি হবে ১০০০ আসনের একটি অডিটোরিয়াম। পাশাপাশি থাকবে ওপেন এয়ার থিয়েটার। সিনেমার প্রদর্শনের বাইরেও নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিশেষ প্রদর্শনী কিংবা বিভিন্ন চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক কর্মসূচির আয়োজন করা যাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা অবশ্য তৃতীয় অংশে। বাংলা চলচ্চিত্রের আগামী দিনের প্রযুক্তিগত চাহিদার কথা মাথায় রেখে সেখানে তৈরি হবে অ্যানিমেশন, ভিজ্যুয়াল এফেক্টস, গেমিং, কমিক্স এবং এক্সটেন্ডেড রিয়্যালিটির মতো ক্ষেত্রের পরিকাঠামো। থাকবে পোস্ট-প্রোডাকশনের ল্যাবরেটরি ও স্টুডিও। অর্থাৎ, উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারকে শুধু ছবি দেখার জায়গা হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছে না সরকার। ছবি তৈরি, সম্পাদনা, পোস্ট-প্রোডাকশন থেকে শুরু করে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কাজ— চলচ্চিত্র ও বিনোদন শিল্পের একাধিক ক্ষেত্রকে একই ছাতার নীচে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন প্রজন্মের জন্যও সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অ্যানিমেশন, ভিএফএক্স, গেমিং কিংবা এক্সটেন্ডেড রিয়্যালিটির মতো ক্ষেত্র এখন সিনেমা তৈরির সঙ্গে ক্রমশ ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে পড়ছে। সেই জায়গায় কলকাতায় আধুনিক পরিকাঠামো তৈরি হলে শিল্পী, প্রযুক্তিবিদ এবং নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের কাজের পরিসরও বাড়তে পারে। তবে প্রকল্পটি এখনও নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে। জমি নির্বাচন এবং মাটি পরীক্ষার কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। চলছে ‘ডিটেলড প্রজেক্ট রিপোর্ট’ বা ‘ ডিপিআর’ তৈরির কাজ। বর্ষা শেষ হলেই নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নকশা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রেও টলিউডের অভিজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সচিব সৌমিত্র মোহন এবং হিডকোর এমডি বিভু গোয়েলকে শতবর্ষ উদযাপন কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনায় বসে প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের তরফে সব বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হবে না, এদিন এমন বার্তাও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘যাঁদের কাজ, তাঁদের দিয়ে করানোই ভালো।’ অর্থাৎ চলচ্চিত্রকেন্দ্রের নকশা থেকে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো—এই বিষয়ে টলিউডের যাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদের মতামত নিয়েই এগোতে চায় সরকার। এ দিনের অনুষ্ঠানেই আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা বা ‘কালচারাল অ্যাডভাইজার’ করার কথা জানান তিনি। বাংলা চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মিঠুনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
মহানায়কের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানকে ঘিরে টলিউডের বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীদের একত্রিত করতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উত্তম কুমারের সঙ্গে সরাসরি কাজ করা শিল্পী থেকে শুরু করে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেতা; সবাইকে নিয়েই তৈরি হয়েছে এই উদযাপনের আবহ। সে সূত্রেই উঠে এসেছে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কথাও। মহানায়ককে স্মরণ করে তিনি জানিয়েছেন, বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর নিজের চার দশকের পথচলার পিছনেও উত্তম কুমারের অবদান রয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, যে ভিতের উপরে পরবর্তী প্রজন্মের বাংলা সিনেমা দাঁড়াতে পেরেছে, সেই ভিত তৈরি করে দিয়েছিলেন মহানায়ক।
উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে চার দিনের অনুষ্ঠান ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছে আবেগের পরিবেশ। নন্দন চত্বর থেকে শুরু হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। কিন্তু সে আবেগের মধ্যেই নিউ টাউনের প্রকল্পটি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এটি কোনো সাময়িক আয়োজন নয়, বরং মহানায়কের নামে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যেও সে দীর্ঘমেয়াদি ভাবনাই স্পষ্ট। কয়েক দিনের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবে। আলো নিভবে, মঞ্চ খুলবে, অতিথিরাও ফিরে যাবেন। কিন্তু থেকে যাবে একটি প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে উত্তম কুমারের নাম জড়িয়ে থাকবে। লক্ষ্যও তাই শুধু জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন নয়। এমন কিছু তৈরি করে যাওয়া, যা আগামী কয়েক দশক পরেও বাংলা ও বাঙালির মনে থাকবে। আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো তখন থাকবেন না। কিন্তু উত্তম কুমারের ২০০তম জন্মবার্ষিকী যখন আসবে, তখনো যেন তাঁর নামে তৈরি এই প্রতিষ্ঠান বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের যোগসূত্র হয়ে দাঁড়ায়।
❤ Support Us







