- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
নতুন নিয়মে অতিরিক্ত খরচের আশঙ্কা, ‘অনলাইন নয়, নগদ দিন’ নোটিস ব্যবসায়ীদের
২০১৪-তে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর ডিজিটাল পেমেন্ট, ডিজিটাল অর্থনীতির উপর ব্যাপক জোর দিয়েছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার। প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে কেন্দ্রের মন্ত্রীরা বলেছিলেন, দুর্নীতি, অবৈধ লেনদেন রুখতে দেশের অর্থনীতির পরিকাঠামোর আমূল সংস্কার প্রয়োজন। আর সে পথে প্রধান হাতিয়ার কাঁচা টাকার বদলে ডিজিটাল লেনদেন। এরপর শুধু বড়ো আকারের টাকা ট্রান্সফার নয়, দেশের খুচরো ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কর্পোরেট পর্যন্ত ব্যপকভাবে এ কাঠামোয় লেনদেন চলতে থাকে। মুদিখানা থেকে চায়ের দোকান, জামা-কাপড়ের দোকান থেকে রেস্তোরাঁ, পাইকারি ব্যবসায়ী থেকে কল-কারখানা সবই এই মুহূর্তে ইউপিআই পেমেন্ট চলছে।
ডিজিটাল লেনদেনকে ‘নগদহীন ভারত’-এর অন্যতম হাতিয়ার করে তোলার পর এ বার সেই ব্যবস্থাতেই খরচের প্রশ্ন। এতদিন ছোটো দোকান থেকে রাস্তার ধারের চায়ের দোকান—সর্বত্র কিউআর কোডে টাকা মেটানোকে উৎসাহ দিয়েছে কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও একাধিক বার ইউপিআই-নির্ভর লেনদেনের প্রসারকে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির সাফল্য হিসাবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু সে ইউপিআই-তেই নির্দিষ্ট অঙ্কের বাণিজ্যিক লেনদেনে ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ বা ব্যবসায়ীর উপর লেনদেন-খরচ বসানোর প্রশ্ন উঠতেই দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক। কেন্দ্রের বক্তব্য, সাধারণ গ্রাহকের কাছ থেকে সরাসরি কোনো অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হবে না। ছোটো অঙ্কের লেনদেনও এর আওতার বাইরে।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে — যে ব্যবস্থাকে এত দিন প্রায় বিনা খরচে, সহজে ও সর্বস্তরের মানুষের নাগালের ‘ডিজিটাল বিপ্লব’ হিসাবে সামনে আনা হয়েছে, প্রচার করা হয়েছে সে ব্যবস্থারই ভিত শক্ত করতে এ বার ব্যবসায়ীদের উপর খরচ চাপানোর প্রয়োজন হলো কেন? ‘ডিজিটাল ভারত’-এর সাফল্যের খতিয়ানে এত দিন যে বিনামূল্যের লেনদেনকে অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে দেখানো হয়েছে, তার হিসাবেই কি এ বার বদল আসছে? বিতর্কের কেন্দ্রে শুধু খরচ নয়, রয়েছে ইউপিআই-নির্ভর এক বিশাল বাণিজ্যিক পরিসরের চরিত্রও। রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক থেকে বেসরকারি ব্যাঙ্ক, দেশীয় আর্থিক প্রযুক্তি সংস্থা থেকে বিদেশি পুঁজির প্রভাব থাকা বৃহৎ ডিজিটাল মঞ্চ —ইউপিআইকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক বিরাট লেনদেন-পরিকাঠামো। তার রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত খরচ রয়েছে — এই যুক্তি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সেই খরচের দায় শেষ পর্যন্ত কার ঘাড়ে পড়বে? বড়ো বড়ো সংস্থা তুলনামূলক ভাবে তা সামলে নিতে পারলেও ছোটো ছোটো দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা স্বল্প আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিটি লেনদেনের খরচই আলাদা চাপ তৈরি করতে পারে।
ফলে এক দিকে রাষ্ট্রের ডিজিটাল অর্থনীতির প্রচার, অন্য দিকে সেই ডিজিটাল ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ — দুই ছবির ফারাকটিই এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ইউপিআই কি শুধুই সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য তৈরি রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল পরিকাঠামো, না কি তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিপুল বেসরকারি ব্যবসার স্বার্থও ক্রমশ নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে? ইউপিআই লেনদেনে অতিরিক্ত ‘ফি’ বা ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ (এমডিআর) এখনো দেশে কার্যকর হয়নি। কিন্তু তার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনলাইন পেমেন্ট নিয়ে ব্যবসায়ীদের একাংশের আপত্তি সামনে আসতে শুরু করেছে। মুদির দোকান থেকে শুরু করে স্বর্ণের দোকান, বিউটি পার্লার এমনকি পেট্রল পাম্পেও কোথাও ঝুলছে ‘অনলাইন পেমেন্ট চলবে না’ নোটিস, আবার কোথাও জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ইউপিআইয়ের মাধ্যমে টাকা দিলে ক্রেতাকেই অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে। অনেক ব্যবসায়ী সরাসরি বলছেন, বিল মেটাতে হবে নগদে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী ২,০০০ টাকার বেশি ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘এমডিআর’ কার্যকর হওয়ার কথা। তবে বাস্তবে সে নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগেই তার প্রভাব নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমনকী যেসব দোকানে সাধারণত ২,০০০ টাকার বেশি লেনদেন হয় না, সেখানেও অনলাইন পেমেন্ট না নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গাজিয়াবাদের স্বর্ণ ব্যবসায়ী অক্ষয় কুমার গুপ্তার কথাতেও সে আশঙ্কারই প্রতিফলন। তাঁর বক্তব্য, তাঁর দোকানে সাধারণত ২,০০০ টাকার কমে লেনদেন হয় না। ফলে তিনি ক্রেতাদের নগদে দাম মেটানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। তাঁর যুক্তি, অনলাইনে টাকা নিলে যদি অতিরিক্ত ফি দিতে হয়, সেই খরচ ব্যবসায়ীরা কেন বহন করবেন? একই অবস্থান গাজিয়াবাদের এক বিউটি পার্লারের মালকিন শেহনাজেরও। তাঁর দাবি, ব্যবসায় এমনিতেই নানা সমস্যা রয়েছে এবং লাভের পরিমাণও কম। তার উপর অতিরিক্ত ফি দিতে হলে ব্যবসায়ীদের উপর আরও চাপ তৈরি হবে। তাই অনলাইনে পেমেন্ট করবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত ক্রেতাদেরই নিতে হবে বলে মনে করছেন তিনি।
শুধু সোনার দোকান বা পার্লার নয়, মধ্যপ্রদেশের একাধিক পেট্রল পাম্পেও একই ধরনের নোটিস দেখা গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে সমস্যার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে। মুদির দোকানেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সাধারণত মুদিখানায় ২,০০০ টাকার মতো বড়ো অঙ্কের লেনদেন খুব বেশি হয় না। কিন্তু ব্যবসায়ী সঞ্জয় বিন্দালের বক্তব্য, ২,০০০ টাকার বেশি কেনাকাটা একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। ফলে বেশি দামের পণ্য কিনলে ক্রেতাদের নগদে টাকা দিতে হতে পারে বলেই তিনি মনে করছেন।
গত কয়েক বছরে দেশে ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহ দিতে ইউপিআই ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। গত ছয় বছর ‘এমডিআর’ না থাকার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনলাইন লেনদেনের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন নিয়ম সামনে আসার পর বিরোধীদের তরফে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, ব্যবসায়ীরা শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত ফি-র বোঝা সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন। গাজিয়াবাদ-সহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসায়ীদের একাংশের অবস্থান সেই আশঙ্কাকেই সামনে নিয়ে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক বলে জানা যাচ্ছে। ‘এমডিআর’ আদায়ের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা যাতে সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ না নেন, তা নিশ্চিত করতে নজরদারি চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রের খবর।
জানা গিয়েছে, আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে কোনো অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিদিন নজর রাখার জন্য ব্যাঙ্কগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নিয়ম অনুযায়ী এমডিআর প্রযোজ্য হলেও তার খরচ যাতে সরাসরি ক্রেতার উপর চাপানো না হয়, সেটিই নিশ্চিত করতে চাইছে কেন্দ্র। তবে প্রশ্ন উঠছে, ব্যাঙ্কের নজরদারি থাকলেও বাস্তবে তৃণমূল স্তরে পরিস্থিতি কতটা বদলাবে? দোকানে ‘অনলাইন পেমেন্ট নয়’ কিংবা ‘অনলাইনে পেমেন্ট করলে অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে’—এমন নোটিস যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ডিজিটাল পেমেন্টের অভ্যাসে তার কী প্রভাব পড়বে, এখন সেটাই দেখার।
❤ Support Us






