Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ৫, ২০২৬

‘নাগরিকদের গণহারে ভোটাধিকার হারানো সংবিধানের সমতার ভিত্তিতে আঘাত’ : মন্তব্য শীর্ষ আদালতের বিচারপতির

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘নাগরিকদের গণহারে ভোটাধিকার হারানো সংবিধানের সমতার ভিত্তিতে আঘাত’ : মন্তব্য শীর্ষ আদালতের বিচারপতির

ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার মতো কোনো পদক্ষেপকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য বলে মানা যায় না। এমন প্রক্রিয়া যদি লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভোটদানের অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তাঁদের নিজের দেশেই কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের অবস্থানে ঠেলে দেয়, তা হলে সেটি স্বভাবতই স্বেচ্ছাচারী — এমনই মত প্রকাশ করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া।

রবিবার হায়দরাবাদের নালসার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভোটাধিকার, সাংবিধানিক সমতা এবং গণতন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার খর্ব করতে পারে এমন কোনো প্রক্রিয়ার পক্ষে পাল্টা যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন। তাঁর মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিচারপতি ভূঁইয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় সংবিধানের কাঠামোয় নাগরিকদের একাংশের ভোটাধিকার থাকবে এবং অন্য একটি অংশ সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে — এমন বিভাজনের কোনও স্বীকৃতি নেই।

তাঁর দাবি, কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক সংখ্যক ভারতীয়কে ভোটাধিকার থেকে বাদ দেওয়া হলে তা সংবিধানের ১৪ এবং ৩২৬ নম্বর ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার প্রশ্ন তৈরি করে। ভোটাধিকারকে কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে দেখার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক সমতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তিনি বলেন, সংবিধান প্রণেতারা স্বাধীনতার পর নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা থাকা সত্ত্বেও সর্বজনীন ভোটাধিকারের পথে হেঁটেছিলেন। সাধারণ মানুষের প্রতি আস্থার প্রকাশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।

বি আর অম্বেদকরের ভাবনার প্রসঙ্গ টেনে বিচারপতি জানান, ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট’ নীতি মূলত সমতার ধারণাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে—অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, একজন কোটিপতি এবং একজন রিকশাচালকের ভোটের সাংবিধানিক মূল্য একই। গণতন্ত্রে ভোটাধিকারের গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে এটিই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন। ভোটাধিকারকে সংবিধানে সরাসরি মৌলিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি—এ বিষয়টিও উল্লেখ করেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তবে তাঁর বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে ভোটাধিকারের সাংবিধানিক চরিত্র স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁর মতে, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য ভোটাধিকার অপরিহার্য।

নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও নিজের মত জানান বিচারপতি। তাঁর বক্তব্য, তাত্ত্বিক দিক থেকে এই দুই বিষয়কে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখা যায় না। নাগরিকত্বের সঙ্গে ভোটদানের অধিকার গভীর ভাবে যুক্ত এবং একটি বিষয়কে অন্যটি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয় বলেই তিনি মনে করেন। বিচারপতি ভূঁইয়ার এই বক্তব্য এমন একটি সময়ে সামনে এল, যখন নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছে। যদিও নালসারের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় বিচারপতি ভূঁইয়া নির্বাচন কমিশন বা এসআইআরের নাম সরাসরি করেননি, তবু তাঁর মন্তব্যের সঙ্গে বর্তমান ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত বিতর্কের যোগ খুঁজছেন অনেকে।

সাম্প্রতিক প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ওই প্রতিবেদনের দাবি, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী এবং সুখবীর সিং সান্ধু মোট ১৪ বার লিখিত ভাবে কমিশনের নামে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও জারি করা নির্দেশের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, সেই আপত্তি সত্ত্বেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার একক ভাবে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের নতুন ফর্ম-৬ নিয়েও আপত্তির বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে আসে। পাশাপাশি, ‘এসআইআর’র আওতায় ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। সে মামলা এখনো দেশের শীর্ষ আদালতে বিচারাধীন। এরই মধ্যে আরও কয়েকটি রাজ্যে একই ধরনের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে। এসআইআর ঘিরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিবাদও জোরদার হয়েছে। পথে নেমে আন্দোলনের পাশাপাশি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতেও ধারাবাহিক কর্মসূচি হয়েছে। এই রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের মধ্যেই নালসার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চ থেকে ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক সমতার গুরুত্ব নিয়ে বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়ার বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও তাঁর বক্তব্যে কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত পদক্ষেপের উল্লেখ ছিল না, তাঁর মন্তব্যে গণতন্ত্রে সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং নাগরিক সমতার সাংবিধানিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!