Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • অক্টোবর ৯, ২০২৬

নন্দীগ্রামে রেকর্ড ভোটে জয়ী হাসিরানি রথ, রেজিনগরেও পদ্মের উত্থান

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নন্দীগ্রামে রেকর্ড ভোটে জয়ী হাসিরানি রথ, রেজিনগরেও পদ্মের উত্থান

উপনির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের গলাতেই জয়মাল্য ঝোলে। বিশেষ করে যদি পালাবদলের কয়েকমাসের মধ্যে সে নির্বাচন হয়, তাহলে বিশ্লেষকদের অন্যরকম বার্তা বিশেষ সুযোগ থাকে না। পশ্চিমবঙ্গের দুটি আসন রেজিনগর ও নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন হয়েছিল ৬ অক্টোবর। ফলাফল ঘোষণা ঘলো ৯ অক্টোবর। নন্দীগ্রামে জয় নিয়ে কোনোরকম সন্দেহ ছিল না পদ্মশিবিরের, শুভেন্দু অধিকারীর ছেড়ে আসা আসনে এবারের প্রার্থী ছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীর নিহত আপ্তসহায়কের মা, হাসিরানি রথ। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে ছিলেন কংগ্রেসের মিলন প্রধান। বিভক্ত তৃণমূলের প্রতীক ও অর্থনৈতিক বিবাদ, মমতাপন্থী দলের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধানের মননয়ন প্রত্যাহারের প্রহসন, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেসের চরম সাংগঠনিক দুর্বলতা, বাম-আইএসএফের দুই প্রার্থীও তেমন নজর কারেন নি, ফলত ভোটের ফলাফল প্রকাশের আগেই, একপ্রকার নিশ্চিত ছিল শুভেন্দু অধিকারীর গড় বলে পরিচিত নন্দীগ্রামে, আবারও বিপুল ভোটে জিতছে বিজেপি। হয়েছেও তাই, অন্য প্রার্থীরা বিজেপির ভোটপ্রাপ্তির ধারেকাছে পৌঁছাতে পারেনি।

দুই কেন্দ্রেই বিজেপির জয়ের ব্যবধান নিয়ে আগাম প্রত্যাশা ছিল গেরুয়া শিবিরের। নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই ‘রেকর্ড’ জয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে, কৌতূহল ছিল রেজিনগরের ফলাফল ঘিরে। দুই সিটে জিতে, নওদা রেখে, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রেজিনগরের ছেড়েছিলেন ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’-র প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ূন কবীর। রেজিনগর ঘিরে নানা মুনির নানা মত ছিল। অনেকেই বলেছিলেন, মুর্শিদাবাদের এই কেন্দ্রে বিজেপি বিশেষ দাঁত ফোটাতে পারবে না। তবে যাবতীয় চর্চা ফুঁৎকারে উড়িয়ে ওই কেন্দ্রে বড়ো ব্যবধানে জিতলেন বিজেপির শাখারভ সরকার। নন্দীগ্রামে জয়ের ব্যবধান এক লক্ষের বেশির টার্গেট দিয়েছিলেন বিজেপি নেতৃত্ব।  সে গণ্ডি ছাপিয়ে ১৫ রাউন্ড গণনার শেষে নন্দীগ্রামে ১,২২৭৫৩ ভোটে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ। অন্যদিকে, ১৫ রাউন্ডের শেষে রেজিনগরের বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার ৭৫,৭৪৮ ভোটে জয়ী হয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে এজেইউপি প্রার্থী হুমায়ূন কবীরের ছেলে গোলাম নবী আজাদ (রবিন), তৃতীয় স্থানে কংগ্রেস, চতুর্থ মমতা তৃণমূল, পঞ্চম সিপিআই (এম), ষষ্ঠ স্থানে ঋতব্রত তৃণমূলের প্রার্থীরা রয়েছেন।

শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হয় নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ভোটগণনা। প্রথম রাউন্ড থেকেই নন্দীগ্রামে এগিয়ে ছিলেন বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ। গণনার প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর ব্যবধান বেড়েছে। প্রথম রাউন্ডের শেষে প্রায় ৯,৬০০ ভোটে এগিয়ে ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্যবধান বেড়ে হয় ১৯,২৯১। পঞ্চম রাউন্ডের শেষে তাঁর লিড ছিল ৪১,৫০০ ভোট। দশম রাউন্ডে ব্যবধান পৌঁছয় ৮৫,২৭৩-এ। একাদশ রাউন্ডে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০,২০৩ ভোটে। দ্বাদশ রাউন্ডে ব্যবধান ছিল ৯৭,৪০২ ভোট। ত্রয়োদশ রাউন্ডে এক লক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে যায় সে ব্যবধান। শেষ পর্যন্ত ১৫ রাউন্ডের গণনা শেষে ১ লক্ষ ২২ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন হাসিরানি। তবে ব্যবধানের নির্দিষ্ট অঙ্ক যা-ই হোক, নন্দীগ্রামে বিজেপির এই জয় যে বড়ো রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় নেই। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে প্রায় ৮১ হাজার ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০২১ সালে বিজেপির টিকিটে লড়ে তিনি পরাজিত করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সে বার জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ১,৯৫৬ ভোট। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু। ব্যবধান ছিল ৯,৬৬৫ ভোট। এ বার তাঁর ছেড়ে আসা কেন্দ্রে হাসিরানির বিপুল জয় পুরনো সব হিসাবকে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে।

রেজিনগরের ফলাফল ঘিরে কৌতূহল ছিল যথেষ্ট। মুর্শিদাবাদের এই বিধানসভা কেন্দ্রটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। ফলে এখানে বিজেপির জয়ের ব্যবধান রাজ্য রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। গণনার শুরু থেকেই এগিয়ে ছিলেন বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার। দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষে তাঁর প্রাপ্ত ভোট ছিল ১১,৬১৪। ওই পর্যায়ে কংগ্রেস পেয়েছিল ৫৮১ ভোট, হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি পেয়েছিল ৪৪৬ ভোট। পরবর্তী রাউন্ডগুলিতে বিজেপির ব্যবধান বাড়তে থাকে। পঞ্চম রাউন্ডের শেষে বিজেপি প্রার্থীর এগিয়ে থাকার খবর প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত রেজিনগরেও বড়ো ব্যবধানে জয়ী হন শাখারভ। প্রায় ৭৫ হাজার ভোটে জিতেছেন শাখারব।

দুই কেন্দ্রের ফল প্রকাশের পরে সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, ধর্মীয় পরিচয়ের বিভাজনকে অতিক্রম করে মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। বিশেষ করে রেজিনগরে সংখ্যালঘু পরিবারের মহিলাদের সমর্থন পাওয়ার দাবি করে তিনি জানান, উন্নয়ন এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নে ভোটাররা নতুন ভাবে ভাবছেন। তাঁর বক্তব্য, রেজিনগরে বন্ধুত্বের যে আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন, ভোটাররা তাতে সাড়া দিয়েছেন। হুমায়ুন কবীরকেও আক্রমণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, হুমায়ুনের রাজনৈতিক বক্তব্যের বিরুদ্ধেও সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশ মত দিয়েছেন। পাশাপাশি রেজিনগরের উন্নয়নের জন্য কলেজ, নারকেলবাড়ি সেতু, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিল্পস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। দুগ্ধশিল্পের প্রসারে আমুলের কারখানা গড়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন শুভেন্দু। তবে সংখ্যালঘু ভোটের সমর্থন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দাবির সঙ্গে বাস্তব ভোটের প্রবণতা কতটা মেলে, তা নির্ধারণ করতে আরও তথ্য প্রয়োজন। একটি কেন্দ্রে বিজেপির জয় থেকেই গোটা সংখ্যালঘু সমাজের ভোটদানের প্রবণতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। বুথভিত্তিক ফল, ভোটদানের হার এবং বিভিন্ন এলাকায় দলগুলির প্রাপ্ত ভোটের তুলনামূলক বিশ্লেষণই এ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে।

বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই কেন্দ্রেই ভোটে কারচুপি এবং রিগিংয়ের অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দলগুলি। রেজিনগরের বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকারের বিরুদ্ধে বুথে ঢুকে ছাপ্পা ভোট দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস। নির্বাচন বাতিল করার পাশাপাশি নির্ধারিত ভোটগণনা স্থগিত রাখার দাবিতে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছিল তারা।যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাখারভ। তাঁর বক্তব্য, ইভিএমে প্রযুক্তিগত ত্রুটি হয়েছে বলে খবর পেয়ে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, কংগ্রেসের অভিযোগ ভিত্তিহীন। নন্দীগ্রামেও ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিল বিরোধী দলগুলি। বিজেপির পাল্টা বক্তব্য, জনসমর্থন হারিয়ে বিরোধীরা পরাজয়ের আগেই কারচুপির অভিযোগকে হাতিয়ার করছে। ফলে ভোটের ফলাফলের পাশাপাশি নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও অব্যাহত রয়েছে।

নন্দীগ্রামের ফলাফলে আরও একটি বিষয় নজর কেড়েছে। বিজেপির বিপুল জয়ের পাশাপাশি গণনার বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থানে কংগ্রেস। কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেফতারিকে ঘিরে ভোটের আগে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সে ঘটনা কংগ্রেসের পক্ষে সহানুভূতি তৈরি করেছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য কংগ্রেসকে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাহুল গান্ধীকে সামনে রেখে প্রচার করলেও বাংলায় দলটির বিশেষ লাভ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা বিরোধী ভোটের পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এই প্রবণতা কতটা স্থায়ী, তা বোঝার জন্য ভবিষ্যতের নির্বাচন এবং বুথভিত্তিক ফলাফলের দিকে নজর রাখতে হবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!