Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ২৬, ২০২৬

রাজ্যের স্কুলে ফিরছে পাশ–ফেল প্রথা ? আগামী শিক্ষাবর্ষে একাধিক পরিবর্তনের মুখ্যমন্ত্রীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
রাজ্যের স্কুলে ফিরছে পাশ–ফেল প্রথা ? আগামী শিক্ষাবর্ষে একাধিক পরিবর্তনের মুখ্যমন্ত্রীর

প্রাথমিক স্তর থেকে পাশ–ফেল চালু, স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ, পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপর জোর—শিক্ষাব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

স্কুলে পাশ–ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনার পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরে এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, স্কুলে পাশ–ফেল ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা প্রয়োজন বলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন। পাশাপাশি, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় ধাপে ধাপে একাধিক পরিবর্তন আনারও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “শিক্ষা দপ্তরে এখন শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন রয়েছেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে রাজ্য সরকারকে রিপোর্ট দেবেন। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, স্কুলে পাশ–ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনা দরকার।”

তাঁর মতে, স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা, পাশ–ফেল ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসকে আধুনিক পদ্ধতিতে পড়ুয়াদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। এই পরিবর্তনগুলি আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ধীরে ধীরে কার্যকর করা হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বর্তমানে সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে প্রাথমিক স্তর থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রচলিত পাশ–ফেল ব্যবস্থা নেই। তবে শিক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে রাজ্য সিলেবাস কমিটি মনে করছে, প্রাথমিক স্তরকে বাদ রেখেও অন্তত পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাশ–ফেল ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

শনিবার, ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত ‘এই সময়’ সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, স্কুলে পাশ–ফেল ফেরানোর উদ্যোগ নিচ্ছে রাজ্য সিলেবাস কমিটি। রবিবার মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই উদ্যোগ আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

পাশ–ফেল প্রথা তুলে দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল স্কুলছুটের সংখ্যা কমানো। তবে বর্তমান সিলেবাস কমিটির বিশেষজ্ঞদের মতে, পড়ুয়াদের শেখার মান উন্নত করতে মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনও পড়ুয়া পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে ফল প্রকাশের পর তাকে আরও একবার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত বিশেষ বা রেমেডিয়াল ক্লাসের ব্যবস্থা করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। দ্বিতীয়বার পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে না পারলে ওই পড়ুয়াকে আগের শ্রেণিতেই রেখে দেওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য, অকৃতকার্য পড়ুয়াদের আরও একবার নিজেদের দক্ষতা উন্নত করার সুযোগ দেওয়া। সিলেবাস কমিটির চেয়ারপার্সন দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় ‘এই সময়’-কে জানিয়েছিলেন, এই মর্মে রাজ্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য রাজ্য সরকারের অনুমোদন ও পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলে পাশ–ফেল ব্যবস্থা তুলে দেওয়া নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৮২ সালে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রাথমিক স্তরে, অর্থাৎ চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি স্কুলে পাশ–ফেল তুলে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন হয়েছে। ১৯৯৮ সালে এই বিষয়কে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক ধর্মঘটও হয়েছিল। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।

পরবর্তী সময়ে, ২০০৯ সালে শিক্ষার অধিকার আইন বা রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট কার্যকর হওয়ার পর দেশের সরকারি স্কুলগুলিতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ–ফেল তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়।

২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ২০১৮ সালে শিক্ষার অধিকার আইনে সংশোধন এনে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পাশ–ফেল ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করা হয়। তবে সেই ব্যবস্থা কার্যকর করা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে জটিলতা ও বিলম্বের অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালেও কেন্দ্রের তরফে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে সরকারি স্কুলে পাশ–ফেল ফেরানোর পক্ষে যাঁরা সওয়াল করে আসছেন, মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য তাঁদের সেই দাবিকে নতুন করে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে তাঁদের একাংশের মত, শুধু পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নয়, একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকেই পাশ–ফেল ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা উচিত।
পাশ–ফেল ব্যবস্থা ছাড়াও স্কুলে পড়ুয়াদের মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

এর পাশাপাশি, আগের সরকারের আমলে একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের মোবাইল ফোন কেনার জন্য ১০ হাজার টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন তিনি। শুভেন্দু অধিকারী জানান, শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা দপ্তরের সচিবকে তিনি ইতিমধ্যেই বলেছেন, প্রয়োজনে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ করে পড়ুয়াদের হাতে শিক্ষার কাজে ব্যবহারযোগ্য ইলেকট্রনিক ট্যাব তুলে দেওয়া যেতে পারে।
তাঁর বক্তব্য, পড়ুয়ারা যাতে শিক্ষার পরিবর্তে মোবাইল ফোন কেনার দিকে ঝুঁকে না পড়ে, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তবে এই বিষয়ে কী ধরনের নিয়ম কার্যকর হবে, তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি।

শিক্ষার পাশাপাশি পড়ুয়াদের মধ্যে দেশাত্মবোধ ও সাংস্কৃতিক চেতনা বাড়ানোর উপরেও জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর প্রস্তাব, বছরে অন্তত তিন দিন বিতর্ক, কুইজ কিংবা তাৎক্ষণিক বক্তৃতার মতো অনুষ্ঠানকে স্কুলের সাংস্কৃতিক কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

এই প্রসঙ্গে তিনি ‘আরশোলা’, ‘ছারপোকা’, ‘দিমাগি নকশাল’ এবং ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে কয়েকটি গোষ্ঠী ও মতাদর্শের সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, পড়ুয়াদের মধ্যে রাষ্ট্রবাদী মনোভাব গড়ে তুলতে এ ধরনের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বক্তব্যে রাজ্যের পূর্ববর্তী সরকারগুলিকেও আক্রমণ করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার এবং পরবর্তী ১৫ বছরের তৃণমূল সরকার পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এনসিসি ও ব্রতচারীর মতো কার্যক্রম তুলে দিয়েছে এবং প্রচলিত শব্দ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এনেছে।

পড়ুয়াদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের জন্য স্কুলের পাঠ্যক্রমে বাদ্যযন্ত্র শিক্ষার উপরেও গুরুত্ব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রাথমিক স্তর থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি তবলা, হারমোনিয়াম, গিটার, সেতার, মৃদঙ্গ ও খঞ্জনির মতো বাদ্যযন্ত্র শেখানোর সুযোগ থাকা উচিত।

তিনি মনে করেন, শুধু পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ না রেখে পড়ুয়াদের সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা বিকাশেরও সুযোগ করে দিতে হবে। সেই লক্ষ্যেই স্কুলের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব সামনে এসেছে।

রাজ্যের পূর্ববর্তী সরকারগুলিকে আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী এবং তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ।
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, সব কিছু মুখ্যমন্ত্রীর কথায় চলতে পারে না। তাঁর বক্তব্য, সমাজে প্রতিবাদী মানুষ থাকবেনই। সরকার প্রতিবাদীদের উপর অত্যাচার করলে মানুষ আইনের পাশাপাশি রাস্তায় নেমেও আন্দোলন করবেন।
অন্যদিকে, তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী সব সময় রাগী সুরে কথা বলছেন এবং বিরোধীদের হুমকি দিচ্ছেন। তাঁর মতে, মুখ্যমন্ত্রীর আরও সংযত হওয়া উচিত।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও সিলেবাস কমিটির আলোচনার ভিত্তিতে আগামী শিক্ষাবর্ষে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় একাধিক বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাশ–ফেল ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব, অকৃতকার্য পড়ুয়াদের জন্য বিশেষ ক্লাসের পর দ্বিতীয়বার পরীক্ষার ব্যবস্থা, স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, মোবাইলের পরিবর্তে শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহারযোগ্য ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনা, ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস আধুনিক পদ্ধতিতে পড়ানো, বছরে অন্তত তিন দিন বিতর্ক-কুইজ-তাৎক্ষণিক বক্তৃতার আয়োজন এবং প্রাথমিক স্তর থেকেই বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র শেখানোর সুযোগ তৈরি করা।

তবে এই বিষয়গুলির সবকটিই এখনও চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘোষিত হয়নি। পাশ–ফেল ব্যবস্থা নিয়ে সিলেবাস কমিটির প্রস্তাব, শিক্ষা দপ্তরের পর্যালোচনা এবং রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে, কোন কোন পরিবর্তন কবে থেকে কার্যকর হবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!