- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- অক্টোবর ২৭, ২০২৬
এসআইআর নির্দেশিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে ইসির হলফনামা পেশ
এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্কের মধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল নির্বাচন কমিশন। সুপ্রিম কোর্টে সোমবার জমা দেওয়া হলফনামায় কমিশন জানিয়েছে, এসআইআর সংক্রান্ত সমস্ত নির্দেশিকাই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সাঁধু ও বিবেক জোশীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জারি করা হয়েছে। শুধু নির্দেশিকা জারির ক্ষেত্রেই নয়, আদালতে জমা দেওয়া হলফনামাটিও তিন জনের সম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
সম্প্রতি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই প্রতিবেদনে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সাঁধু ও বিবেক জোশীর একাধিক অভ্যন্তরীণ নোটের উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের আপত্তি বা প্রশ্নের ইঙ্গিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং এসআইআর পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন সমাজসেবী রাকেশকুমার সিংহ। সেই মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই নিজেদের বক্তব্য জানিয়ে হলফনামা জমা দিল কমিশন।
হলফনামায় কমিশন উল্লেখ করেছে, ২০২৫ সালের ২৪ জুন থেকে এসআইআর সংক্রান্ত যে তিনটি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল, সেগুলি ছাড়াও ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের ১৪ মে জারি হওয়া নির্দেশিকাগুলি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই প্রকাশ করা হয়েছিল। কমিশনের বক্তব্য, এই নির্দেশিকাগুলির কোনওটিই একক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জারি হয়নি।
কমিশনের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কার্যপদ্ধতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের একটি অংশ সম্পর্কেও হলফনামায় ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের নির্দেশিকা ও তাঁর আচরণ নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার আলাদা করে ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথনকে চিঠি দিয়েছিলেন। হলফনামায় কমিশন এই চিঠি পাঠানোর বিষয়টি অস্বীকার করেনি।
তবে কমিশনের দাবি, দুই নির্বাচন কমিশনারের যৌথ নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট নির্দেশিকাটি কখনও কার্যকর করা হয়নি। অর্থাৎ, ওই নির্দেশিকা বাস্তবে প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছয়নি বলেই আদালতে জানিয়েছে কমিশন।
এসআইআর চলাকালীন ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে নির্বাচন কমিশনের ‘ইসিআইনেট’ অ্যাপ ব্যবহার করতে গিয়ে ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরও-দের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। এই বিষয়েও নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে কমিশন।
হলফনামায় জানানো হয়েছে, ইআরও-র নির্দেশ ছাড়া কোনও ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা, বাদ দেওয়া কিংবা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের স্বাধীনভাবে বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও কমিশন গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ইসিআইনেটের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে ইআরও-রা নিজেদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা পান এবং প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীন না হন।
নতুন ভোটার হিসেবে তালিকায় নাম নথিভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ফর্ম ৬-এর সঙ্গে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টিও হলফনামায় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছে নির্বাচন কমিশন। এই ঘোষণাপত্র নিয়ে বিভিন্ন মহলে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলিকে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে তারা।
কমিশনের বক্তব্য, ফর্ম ৬-এর মূল কাঠামোয় পরিবর্তন করা হয়নি। সংশোধন আনা হয়েছে কেবল তার সঙ্গে সংযুক্ত অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রে। এসআইআর চলাকালীন ভোটারদের পুরনো তথ্যের সঙ্গে নতুন আবেদনকারীর বিবরণ মেলানোর বা ‘ম্যাপিং’ করার প্রয়োজনেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
হলফনামায় আরও বলা হয়েছে, ফর্ম ৬ সংশোধনের ক্ষমতা একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রের উদ্দেশ্য হল, ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদনকারীকে নিজের বক্তব্য বা আপত্তি জানানোর পর্যায়ে গিয়ে নতুন করে নথিপত্র জমা দেওয়ার ঝামেলা থেকে রেহাই দেওয়া।
কমিশন স্পষ্ট করেছে, এই অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র শুধুমাত্র এসআইআর প্রক্রিয়ার সময়েই প্রযোজ্য। সাধারণ সময়ে ভোটার তালিকা তৈরি বা সংশোধনের ক্ষেত্রে নতুন ভোটারদের শুধু ফর্ম ৬ জমা দিলেই চলবে। ঘোষণাপত্রটিকে ফর্ম ৬-এর অংশ হিসেবেও গণ্য করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কমিশন।
তবে এসআইআর চলাকালীন নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করতে চাইলে ফর্ম ৬-এর পাশাপাশি এই ঘোষণাপত্রও জমা দিতে হবে। এর মাধ্যমে আবেদনকারীর বর্তমান তথ্যের সঙ্গে পূর্ববর্তী এসআইআর-এর নথিতে থাকা তথ্যের সামঞ্জস্য যাচাই করা হয়। সেই কারণেই আবেদনকারীকে নিজের পাশাপাশি বাবা-মা অথবা ঠাকুরদা-ঠাকুমার তথ্য দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলে হলফনামায় ব্যাখ্যা করেছে কমিশন।
নির্দেশিকা তৈরির আগে কমিশন কী ধরনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, হলফনামায় তারও বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের দাবি, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের পরামর্শ, পর্যবেক্ষণ এবং মতামত খতিয়ে দেখা হয়। এরপর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও দুই নির্বাচন কমিশনারের সামনে আসা বিষয়গুলি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিভিন্ন বিভাগ থেকে আসা ফাইল প্রথমে একজন নির্বাচন কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়। তিনি তা খতিয়ে দেখার পর ফাইলটি দ্বিতীয় নির্বাচন কমিশনারের কাছে যায়। পরবর্তী পর্যায়ে সেটি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়।
কোনও প্রস্তাব অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট ফাইলে সেই সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয় এবং তিন জনের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। তার পর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। শেষ পর্যায়ে কমিশনের সচিবালয় সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার দায়িত্ব পালন করে।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এই পদ্ধতিতে প্রতিটি প্রস্তাব বিবেচনা ও অনুমোদনের পরেই নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। এসআইআর সংক্রান্ত নির্দেশিকাগুলিও একই প্রক্রিয়া মেনে জারি হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হলফনামায় দাবি করেছে কমিশন।
❤ Support Us





