- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ২৮, ২০২৬
সন্ধ্যায় মশাল মিছিল, মাঝরাতে ক্যাম্পাসে পুলিশ! ‘এসআরএফটিআই’-এ তুঙ্গে উপাচার্য-পড়ুয়া সংঘাত
সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই)-এর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে প্রতিষ্ঠানের ভিতরে প্রায় ৬০ জন পুলিশকর্মীর প্রবেশ ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। একদিকে কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই পুলিশ ডাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে দমন করতে এবং তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতেই এহেন পদক্ষেপ। বুধবার এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিবৃতি জারি করেন উপাচার্য সন্তোষ অজমেরা। পাল্টা বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ‘এসআরএফটিআই’ ছাত্র সংসদও। আন্দোলনের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করছেন উপাচার্য। অন্যদিকে, পড়ুয়াদের প্রশ্ন, তাঁদের নিরাপত্তা যখন বিঘ্নিত হয়েছিল, তখন কেন একই রকম তৎপরতা দেখাননি কর্তৃপক্ষ?
মঙ্গলবার রাত প্রায় ১১টা নাগাদ ‘এসআরএফটিআই’ ক্যাম্পাসের ছাত্রাবাসের পিছনে অতিথিশালার কাছে পুলিশকর্মীদের জমায়েত হতে দেখেন পড়ুয়ারা। তাঁদের দাবি, ওই রাতে প্রায় ৬০ জন পুলিশকর্মী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। এ ঘটনা সামনে আসতেই প্রতিষ্ঠানের ভিতরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়। ক্যাম্পাসে পুলিশি নজরদার, স্থায়ী ভাবে পুলিশ মোতায়েনের বিরোধিতা করে বিবৃতি জারি করেছে ছাত্র সংসদ। পড়ুয়াদের বক্তব্য, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ তাঁদের মশাল মিছিল শুরু হয়েছিল। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি শেষ হওয়ার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পরে কেন বিপুল সংখ্যক পুলিশকর্মীকে ক্যাম্পাসে আনা হলো, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। তাঁদের অভিযোগ, আন্দোলনের মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপ আসলে ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা। অথচ, এর আগে পড়ুয়াদের উপর হামলা এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও কর্তৃপক্ষের তরফে একই রকম তৎপরতা দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, বুধবার বিবৃতি দিয়ে উপাচার্য সন্তোষ অজমেরা জানান, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ও ক্যাম্পাসে থাকা প্রত্যেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশ ডাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন তিনি। তাঁর দাবি, দিনের বেলায় বক্তৃতা ও জমায়েত শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার পর আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বদলাতে শুরু করে। এর ফলে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। উপাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, আগাম অনুমতি ছাড়াই পড়ুয়ারা জ্বলন্ত মশাল হাতে মিছিল করেন। প্রায় ৫০ জন পড়ুয়া মশাল নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অংশে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ঘোরেন। সে মিছিল ছাত্রাবাস এবং অতিথিশালার দিকেও যায়। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট কয়েক জনের উদ্দেশে স্লোগান দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। অজমেরার মতে, এই ধরনের কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভয় দেখানোর শামিল হতে পারে।
তিনি আরও দাবি করেছেন, দিনের বেলায় ক্যাম্পাসের মূল ফটকের বাইরেও প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন বহিরাগতেরা। তাই গোটা ঘটনাকে নিছক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেই মনে করেন তিনি। উপাচার্যের আশঙ্কা, পড়ুয়ারা নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে পারেন। এতে প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি এবং ক্যাম্পাসে বসবাসকারী ও উপস্থিত ব্যক্তিদের জীবন বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সে আশঙ্কা থেকেই পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশি সহায়তা চাওয়া হয় বলে জানিয়েছেন তিনি। ‘এসআরএফটিআই’-এর বর্তমান আন্দোলনকে শুধুমাত্র পড়ুয়াদের প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন না উপাচার্য সন্তোষ অজমেরা। তাঁর দাবি, এই আন্দোলনের নেপথ্যে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। আন্দোলনকে রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বাইরে থেকে বহু মানুষ আন্দোলনকারীদের উস্কানি দিচ্ছেন। এ ছাড়াও, ছয় পড়ুয়াকে বহিষ্কার করার পরেও তাঁরা ক্যাম্পাসে থেকে গিয়েছেন বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেন উপাচার্য। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে এ ভাবে ক্যাম্পাসে অবস্থান করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
উপাচার্যের বক্তব্যের পাল্টা বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাম্পাসে এত বিপুল সংখ্যক পুলিশকর্মী মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের প্রশ্ন, প্রতিবাদ কর্মসূচি সন্ধ্যায় শেষ হওয়ার পরেও কেন মাঝরাতে পুলিশ ডাকার প্রয়োজন পড়ল? ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে সত্যিই উদ্বেগ থাকলে সেই উদ্বেগের নির্দিষ্ট কারণ কী, তা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। আন্দোলনকারী পড়ুয়া সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘সন্ধ্যায় মশাল মিছিল বেরোল, আর উপাচার্য মধ্যরাতে নিরাপত্তার অভাব বোধ করে পুলিশ ডাকলেন, এটা খুবই হাস্যকর। আজও তিনি অফিসে এসেছেন পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী এবং বাউন্সার নিয়ে।’ সুদীপের আরও অভিযোগ, ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি শুভমের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এসআরএফটিআই-এর ইতিহাসে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। পড়ুয়াদের বক্তব্য, তাঁদের আন্দোলনকে ঘিরে নিরাপত্তার প্রশ্নে কর্তৃপক্ষ যে তৎপরতা দেখাচ্ছেন, পড়ুয়াদের উপর হামলার ঘটনা ঘটার সময় সেই তৎপরতা দেখা যায়নি। তাঁদের মতে, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন কর্তৃপক্ষের, তেমনই পড়ুয়াদের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষাও তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
‘এসআরএফটিআই’ ছাত্র সংসদের বিবৃতিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পুলিশি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে পরিণত করা যায় না। চলচ্চিত্র, শিল্পচর্চা, স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং মতপ্রকাশের জন্য তৈরি একটি প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের নির্ভয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। ছাত্র সংসদের আশঙ্কা, নিরাপত্তার নামে ক্যাম্পাসে স্থায়ী ভাবে পুলিশ মোতায়েন করা হলে পড়ুয়াদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এর ফলে স্বাধীন চিন্তাভাবনা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পড়ুয়াদের মতে, কেবল কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের ভিত্তিতে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ক্যাম্পাসের প্রত্যেক সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সব পক্ষের উদ্বেগকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পুলিশি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করার পাশাপাশি শিক্ষার গৈরিকীকরণের বিরোধিতা এবং পড়ুয়াদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষারও ডাক দিয়েছে ছাত্র সংসদ।
‘এসআরএফটিআই’-এর আন্দোলনকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ২৭ অক্টোবর দেশজুড়ে ক্যাম্পাস আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন পড়ুয়ারা। সেই কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারাও নিজেদের ক্যাম্পাসে প্রতীকী বিক্ষোভ দেখান। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (আইএসআই)-এর মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও সংহতির বার্তা আসে। এর আগে বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা নসীরুদ্দীন শাহ আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছিলেন। শাসকের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সকলকে একজোট হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন তিনি। ২৭ অক্টোবর ‘এসআরএফটিআই’ ক্যাম্পাসের বাইরে উপস্থিত হয়েছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় সহ অনান্যরা। আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের প্রতি সংহতি জানিয়ে তাঁদের পাশে থাকার বার্তা দেন তিনি। তবে নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে ক্যাম্পাসের ভিতরে প্রবেশ করতে দেননি বলে অভিযোগ।
দিনভর বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির পর সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসের ভিতরেই মশাল মিছিল করেন পড়ুয়ারা। উপাচার্যের দাবি, ওই মিছিলের ধরন আর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অংশে তার বিস্তারের কারণে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে, পড়ুয়াদের বক্তব্য, তাঁদের কর্মসূচি শেষ হওয়ার দীর্ঘ সময় পরে মধ্যরাতে পুলিশ ডাকার সিদ্ধান্তের কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা মেলেনি।
‘এসআরএফটিআই’-এ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন, ক্যাম্পাসে পুলিশ ডাকার সিদ্ধান্ত কি শুধুই নিরাপত্তার স্বার্থে, নাকি এর মাধ্যমে আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের উপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা হচ্ছে? উপাচার্য যেখানে আন্দোলনের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথা বলছেন, সেখানে পড়ুয়ারা একে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীন মতপ্রকাশের উপর হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন। এক দিকে কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ, অন্য দিকে পড়ুয়াদের প্রতিবাদের অধিকার — এই দুইয়ের সংঘাতেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ‘এসআরএফটিআই’ ক্যাম্পাস। স্থায়ী পুলিশি নজরদারি নিয়ে ছাত্র সংসদের আপত্তি এবং উপাচার্যের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
❤ Support Us








