- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- অক্টোবর ২৯, ২০২৬
শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা ! মুখ্যমন্ত্রীর নয়া বিধিভাবনা ঘিরে তুমুল বিতর্ক, কী বলছে আইন ?
পশ্চিমবঙ্গে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই নতুন শর্ত যুক্ত করার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর এ ঘোষণাকে ঘিরে শুরু হয়েছে তুমুল রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক। সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী ও শিক্ষক মহলের একাংশ।
বুধবার, মন্ত্রীসভার বৈঠকের পর, ১১৯৯টি নতুন শূন্যপদ তৈরির কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি জানান, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা কিংবা লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তাঁর দাবি, দেশের অন্যান্য রাজ্যেও শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উপর বিধিনিষেধ রয়েছে। রাজ্য মন্ত্রিসভার এ সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রেই এ শর্ত কার্যকর করা হবে। তবে, বর্তমানে কর্মরত যে সব শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা আপাতত প্রযোজ্য হবে না বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারের এহেন পদক্ষেপ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, বিধি তৈরি হওয়ার আগে সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তাঁর হুঁশিয়ারি, মানুষের স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার উদ্দেশ্যে কোনো বিধি তৈরি করা হলে তা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বামেরা শাসন করেছে এমন রাজ্যগুলি (বর্তমানে কোনো রাজ্যে বামেরা ক্ষমতায় নেই) ছাড়া অন্যত্র শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। এ বক্তব্যেরও বিরোধিতা করেছেন বিকাশরঞ্জন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রস্তাবিত বিধিকে সংবিধানসম্মত নয় বলে দাবি করে তিনি জানিয়েছেন, নিয়ম কার্যকর হলে তার বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জ করার পথ খোলা থাকবে। রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ডিএ মঞ্চের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষও। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত রাখাই যদি সরকারের উদ্দেশ্য হয়, তা হলে শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটির ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করা উচিত। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষাক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন কোনও সমতুল্য বিধিনিষেধের কথা বলা হয়নি।
ভাস্কর আরও বলেন, রাজ্যের বিদ্যমান শিক্ষা আইন ও বিধিতে শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উপর যে বিধিনিষেধ রয়েছে, তার পরিধি বিবেচনা না করে নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে গেলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, শিক্ষকদের সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দেওয়া হলে তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়টি আরও স্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে বিচার করা সম্ভব। ফলে, মূল বিতর্কটি শুধু শিক্ষকদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকারেই সীমাবদ্ধ নেই। নতুন নিয়োগের শর্ত হিসাবে এই নিষেধাজ্ঞা কতটা আইনসঙ্গত, বিদ্যমান বিধির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য কী, সাংবিধানিক অধিকারের উপর এর প্রভাব কতটা — এখন সেই প্রশ্নগুলিই সামনে আসছে।
নয়া বিধি চালুর ক্ষেত্রে শিক্ষার পরিবেশ, পেশাগত নিরপেক্ষতা ও শিক্ষকতার মর্যাদা রক্ষার যুক্তি দেখিয়েছে সরকার। কিন্তু যে শিক্ষক এক দিন স্বাধীনতা আন্দোলনে ছাত্রসমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, দেশভাগের ক্ষতবিক্ষত সমাজে সম্প্রীতি ও যুক্তিবাদের পাঠ দিয়েছেন, স্বাধীনতার পরে গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায় এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে জনমত গঠনে ভূমিকা নিয়েছেন, তাঁর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সীমা কোথায়? প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষককে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন থেকেও দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না। প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষকতা কি নিছক একটি পেশা, যার পরিধি শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ? না কি সমাজের বিবেক গঠনের দায়িত্বও এই পেশার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষকের ভূমিকা কখনো শুধুমাত্র ছাত্রদের পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে আটকে থাকেনি। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিস্তার থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, জাতপাতের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, নারীশিক্ষার প্রসার কিংবা শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি — বিভিন্ন পর্বে শিক্ষক, অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদেরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। ভারতে আধুনিক শিক্ষার বিস্তার ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে জড়িত হলেও, সে শিক্ষাব্যবস্থার ভিতর থেকেই এক সময় ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছিল। উনিশ শতকের নবজাগরণ, জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রসার এবং স্বদেশি আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষক, অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও ছাত্রসমাজের একাংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁদের কাছে শিক্ষা ক্রমশ শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির সোপান থাকেনি; হয়ে উঠেছিল সমাজকে বুঝতে শেখার এবং শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার হাতিয়ার।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে স্বদেশি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষাক্ষেত্রও সে আন্দোলনের বাইরে থাকেনি। বিদেশি পণ্য বর্জন, স্বদেশি শিল্পের প্রসার এবং জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি পাশাপাশি এগিয়েছিল। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন শিক্ষার বিকল্প হিসাবে জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগের পিছনে ছিল একটি রাজনৈতিক উপলব্ধি — শিক্ষা কেমন হবে, কোন ইতিহাস পড়ানো হবে, শিক্ষার্থীকে কী ভাবে নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলা হবে, তা নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সমাজের ভবিষ্যৎ। এই পর্বে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠা, জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ঋষি অরবিন্দ ঘোষের মতো ব্যক্তিত্ব জাতীয় শিক্ষার ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শিক্ষা, স্বদেশি চেতনা, সমাজের আত্মশক্তি বিকাশের প্রশ্নে নিজস্ব অবস্থান নিয়েছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে শিক্ষকদের ভূমিকার অর্থ অবশ্য এই নয় যে, প্রতিটি শিক্ষককে কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মী হতে হবে। বরং এর তাৎপর্য অন্যত্র। ঔপনিবেশিক শাসনের সময় শিক্ষা, ভাষা, ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে যে বিতর্কগুলি তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের একটি অংশ সক্রিয় ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের অনেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে জনসভা, লেখালেখি, সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনমত গড়ে তুলেছিলেন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে ছাত্রদের অংশগ্রহণও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ছাত্রদের একাংশ পড়াশোনা ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের সংস্পর্শে রাজনৈতিক চেতনা অর্জন করেছিলেন, যদিও ছাত্রদের আন্দোলনে অংশগ্রহণের পিছনে পারিবারিক পরিবেশ, স্থানীয় সংগঠন, জাতীয় নেতাদের আহ্বান এবং সমকালীন ঘটনাবলিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সে সময় শিক্ষা ও রাজনীতি পরস্পরবিচ্ছিন্ন কোনও ক্ষেত্র ছিল না। দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, নাগরিকের স্বাধীনতার অর্থ কী, শাসকের কাছে মানুষের অধিকার কতটা — এই প্রশ্নগুলি শিক্ষার জগৎকেও আলোড়িত করেছিল।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সামনে যে প্রশ্নগুলি এসে দাঁড়িয়েছিল, তার নিছক প্রশাসনিক ছিল না। দেশভাগের বিপর্যয়, সাম্প্রদায়িক হিংসা, দারিদ্র, জাতপাতের বৈষম্য, নিরক্ষরতা এবং বিপুল জনসংখ্যার জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা — সব মিলিয়ে নতুন রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে হয়েছিল। সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নাগরিকদের শুধু ভোট দেওয়ার সুযোগ দিলেই চলবে না, তাঁদের অধিকার, দায়িত্ব, রাষ্ট্রের কাজকর্ম সম্পর্কে সচেতন করে তোলাও জরুরি ছিল। সে কাজে শিক্ষকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের স্কুলে প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পড়ানো থেকে শুরু করে শহরের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন রাষ্ট্রের নীতি, ইতিহাস, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক — শিক্ষার পরিসর ক্রমশ দেশ গঠনের বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, রাষ্ট্রের হাতে পর্যাপ্ত সম্পদ না থাকায় কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার পাশাপাশি স্থানীয় সমাজ, নাগরিক উদ্যোগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের উপরও নির্ভর করতে হয়েছিল। স্কুল প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার কাজে স্থানীয় উদ্যোগের গুরুত্ব ছিল। তবে এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও ছিল: যে অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ বেশি, সেখানে শিক্ষার সুযোগ তুলনামূলক ভাবে বাড়ানো সহজ হয়েছিল; ফলে বৈষম্যও পুরোপুরি দূর হয়নি। ১৯৫০ সালে দেশে সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরে শিক্ষা ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়। শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, ভাষানীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে একাধিক কমিশন ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। রাধাকৃষ্ণন কমিশন, মুদালিয়ার কমিশন এবং পরবর্তী কালে কোঠারি কমিশনের মতো উদ্যোগগুলি শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও কাঠামো নিয়ে জাতীয় স্তরে বিতর্ককে এগিয়ে নিয়ে যায়। এ পরিসরে শিক্ষাবিদদের কাজ শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ছিল না; গবেষণা, নীতি নির্ধারণ, মতামত প্রদান এবং শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনামূলক মূল্যায়নও ছিল তার অংশ। এখানে অবশ্য শিক্ষক ও রাজনৈতিক কর্মীর ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো শিক্ষক, শিক্ষাবিদ সরকারের শিক্ষানীতির সমালোচনা করলেই তিনি দলীয় রাজনীতি করছেন, এমন নয়। আবার কোনো শিক্ষক রাজনৈতিক দলের সদস্য হলেই তিনি শিক্ষার স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছেন, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যায় না।
পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক ও অধ্যাপকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাস দীর্ঘ। রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে শিক্ষকসমাজের উপস্থিতি, শিক্ষক সংগঠনগুলির ভূমিকা এবং শিক্ষানীতি নিয়ে আন্দোলন বহু দশক ধরেই দৃশ্যমান। বিশেষত বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনকালে শিক্ষক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলির সম্পর্ক রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী সময়েও শিক্ষকসমাজের একাংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। এ সম্পর্কের ইতিবাচক দিক যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। শিক্ষক সংগঠনগুলি বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, বদলি, নিয়োগ, পেনশন এবং বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো নিয়ে দাবি তুলতে পারে। সংগঠিত অবস্থান প্রশাসনের কাছে শিক্ষকদের সমস্যাগুলি তুলে ধরতে সাহায্য করে। শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছনোর একটি মাধ্যমও হতে পারে এই সংগঠনগুলি। কিন্তু কোনো সংগঠন যদি পেশাগত স্বার্থের বদলে রাজনৈতিক দলের আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সমস্যা তৈরি হয়। নিয়োগ বা বদলিতে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় আধিপত্য, বিরোধী মতের শিক্ষককে কোণঠাসা করা কিংবা ছাত্রদের উপর রাজনৈতিক মত চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠলে শিক্ষকতার স্বাধীনতা ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের এই দিকটি অস্বীকার করার উপায় নেই।
শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষানীতির সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও এই দ্বৈততা চিহ্নিত হয়েছে। একদিকে, শিক্ষক সংগঠনগুলি শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো ও নীতি সংস্কারের দাবিতে প্রভাব ফেলতে পারে; অন্য দিকে, সংগঠিত স্বার্থের সংঘাত, জবাবদিহির অভাব এবং শিক্ষার গুণমানের প্রশ্নে বিরোধও সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ, শিক্ষক সংগঠন থাকা বা শিক্ষকদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়া নিজে থেকেই শিক্ষার উন্নতি কিংবা অবনতির নিশ্চয়তা দেয় না। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার মান নিয়ে বিতর্কের উত্তর কেবল শিক্ষকরা রাজনীতি করবেন কি না, এই একটি প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। নিয়োগে স্বচ্ছতা, পর্যাপ্ত শিক্ষক, নিয়মিত ক্লাস, উপযুক্ত পরিকাঠামো, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ের জবাবদিহি এবং ছাত্রছাত্রীদের শেখার বাস্তব ফল — সবকিছুকেই পাশাপাশি বিবেচনা করতে হবে।
রাজ্য সরকারের বক্তব্য, শিক্ষার মান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষকতার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মুক্ত রাখার লক্ষ্য এবং শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করার মধ্যে কি কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই? শিক্ষক যদি দলীয় নির্দেশে ছাত্রদের প্রভাবিত করেন, তা যেমন উদ্বেগের, তেমনই রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, সামাজিক বৈষম্য কিংবা নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে শিক্ষককে নীরব থাকতে বাধ্য করাও কি সমান ভাবে সমস্যাহীন? সরকারি ঘোষণার সঙ্গে আইনি সংশোধন, পেশাগত নিরপেক্ষতার শর্ত আর সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নগুলি তাই আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। কারণ, রাজনীতি বলতে কেবল নির্বাচনে দাঁড়ানো কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের পদাধিকারী হওয়াকে বোঝায় না। সমাজের নীতি, ক্ষমতার বণ্টন, নাগরিকের অধিকার ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে মত প্রকাশও বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরের অংশ।
সরকারের ঘোষণায় প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উপর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ সীমা যদি ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে রাজনৈতিক বিষয়ে মত প্রকাশ, সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ কিংবা শিক্ষানীতির সমালোচনার ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করে, তা হলে কয়েকটি মৌলিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, শিক্ষকদের পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে জননীতি বঞ্চিত হতে পারে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের সমস্যা, গ্রামের স্কুলে পরিকাঠামোর ঘাটতি, দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা — এসব বিষয়ে শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁরা যদি সংগঠিত ভাবে নীতিগত আলোচনায় অংশ নিতে না পারেন, তবে প্রশাসনের কাছে বাস্তব পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছনোর একটি পথ সংকুচিত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমতের পরিসর সঙ্কুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিক্ষকেরা শুধু তথ্য পরিবেশন করেন না; শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, যুক্তি খুঁজতে এবং বিভিন্ন মতের তুলনামূলক বিচার করতে শেখান। শিক্ষক নিজেই যদি পেশাগত কারণে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে সম্পূর্ণ নীরব থাকতে বাধ্য হন, তা হলে শিক্ষার্থীদের সামনে স্বাধীন চিন্তার চর্চা নিয়ে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে নিজের দলীয় মত প্রচার করবেন। বরং নিরপেক্ষ ভাবে বিভিন্ন মত ব্যাখ্যা করা এবং শিক্ষার্থীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে সম্মান করাই শিক্ষার গণতান্ত্রিক ভিত্তি। তৃতীয়ত, সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের ভূমিকা সীমিত হয়ে যেতে পারে। জাতপাতের বৈষম্য, লিঙ্গবৈষম্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সমস্যা — এ ধরনের বিষয়ে শিক্ষকরা স্থানীয় সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। এ কাজের অনেকটাই দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকেও সম্ভব। কিন্তু সামাজিক প্রশ্নকে যদি অত্যন্ত বিস্তৃত অর্থে ‘রাজনৈতিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়, তা হলে জনস্বার্থে কথা বলার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
চতুর্থত, স্থানীয় গণতন্ত্রে অভিজ্ঞ মানুষের অংশগ্রহণ কমতে পারে। পঞ্চায়েত বা পুরসভা শুধু রাস্তা, নিকাশি কিংবা পানীয় জলের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; স্কুল, গ্রন্থাগার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং শিশুদের সামাজিক সুরক্ষার মতো বিষয়েও স্থানীয় স্তরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোনো শিক্ষক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হলে তিনি এই ক্ষেত্রগুলিতে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। পঞ্চমত, শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য আলাদা নিষেধাজ্ঞা থাকলে একই বিদ্যালয়ে কর্মরত দুই শিক্ষক একই পেশাগত দায়িত্ব পালন করেও ভিন্ন রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করবেন। এই পার্থক্য আইনি ভাবে ন্যায্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিধির ভিত্তিতে বিচার্য। কিন্তু সামাজিক ভাবে এই প্রশ্ন এড়ানো কঠিন—একজন নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার কি তাঁর চাকরিতে যোগ দেওয়ার তারিখের উপর নির্ভর করবে?
যাবতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক পার্থক্য। দলীয় রাজনীতি আর রাজনৈতিক সচেতনতা এক নয়। কোনো শিক্ষক নির্বাচনে প্রার্থী না হয়েও সংবিধান, গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, শ্রমের মর্যাদা কিংবা সামাজিক বৈষম্য নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। কোনো শিক্ষক রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও শিক্ষানীতির সমালোচনা করতে পারেন। আবার কোনও শিক্ষক দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত থেকেও শ্রেণিকক্ষে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেন—যদিও তার জন্য পেশাগত সংযম ও দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। শিক্ষকতার ক্ষেত্রে আসল প্রশ্ন তাই রাজনৈতিক মতামত থাকবে কি থাকবে না, তা নয়। বরং সেই মতামত কী ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এবং তা শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তার উপর কোনও চাপ তৈরি করছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, কোননো শিক্ষক বিদ্যালয়ে মেয়েদের নিরাপত্তা, জাতপাতের বৈষম্য কিংবা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। এই প্রশ্নগুলির সঙ্গে সরকারের নীতি, সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা জড়িয়ে থাকতে পারে। সে কারণে সেগুলিকে রাজনৈতিক প্রশ্নও বলা যায়। কিন্তু এ প্রশ্ন তোলাকে দলীয় প্রচারের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। অন্যদিকে, কোনও শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষে নিজের দলের পক্ষে প্রচার করেন, বিরোধী মতের শিক্ষার্থীকে হেনস্থা করেন কিংবা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করেন, তা হলে তা পেশাগত নিরপেক্ষতার পরিপন্থী। রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার যুক্তি দিয়ে এমন আচরণকে সমর্থন করা যায় না। অর্থাৎ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার লক্ষ্য এবং শিক্ষককে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশ্নে নীরব করে দেওয়ার মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা থাকা দরকার।
শিক্ষক ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে ভারতে আলোচনার ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৮৩ সালে গঠিত জাতীয় শিক্ষক কমিশনের প্রতিবেদন, যা সাধারণত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট নামে পরিচিত, সেখানে শিক্ষকদের সামাজিক ভূমিকা, কাজের পরিবেশ, প্রশিক্ষণ, মর্যাদা এবং শিক্ষক সংগঠনগুলির রাজনৈতিকীকরণ-সহ একাধিক বিষয় আলোচিত হয়েছিল। অর্থাৎ, শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব ও তাঁদের সংগঠিত সামাজিক অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি নতুন নয়। শিক্ষকদের কাজের পরিবেশ, বেতন, চাকরির নিরাপত্তা কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো নিয়ে মত প্রকাশকে তাঁদের পেশাগত জীবনের বাইরে রাখা যায় না। একই সঙ্গে শিক্ষক সংগঠনগুলি যদি রাজনৈতিক দলের শাখায় পরিণত হয়, তা হলে পেশাগত দাবি ও দলীয় স্বার্থের মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে। এ দ্বন্দ্বের সমাধান শিক্ষকসমাজকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত ঘোষণা করার মধ্যে, না কি সংগঠনের গণতান্ত্রিক চরিত্র ও পেশাগত জবাবদিহি শক্তিশালী করার মধ্যে — সেটিই আলোচনার বিষয়। শিক্ষককে সমাজের কাছে দায়বদ্ধ হতে হবে। কিন্তু সেই দায়বদ্ধতা শুধু সরকারের কাছে নয়, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় সমাজ এবং বৃহত্তর গণতান্ত্রিক পরিসরের প্রতিও। শিক্ষকতার মর্যাদা রক্ষার নামে যদি শিক্ষকদের নীতিগত বিতর্কে অংশ নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়, তা হলে এক ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়, তা হলেও শিক্ষকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আইনি দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার জন্য বিদ্যমান বিধির পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ২০১৮ সালের ‘Appointment, Confirmation, Conduct and Discipline of Teachers and Non-Teaching Staff Rules’-এর ২২(১) নম্বর বিধিতে, প্রযোজ্য নিয়ম, নির্দেশ এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে শিক্ষকদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগের উল্লেখ রয়েছে। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে এই বিধির সম্পর্ক কী হবে, তা স্পষ্ট করা জরুরি।
আরও একটি বিষয় বিবেচ্য। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষকরা প্রত্যেক ক্ষেত্রে সরাসরি সরকারি কর্মচারীর সমতুল্য কি না, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য আচরণবিধির সঙ্গে তাঁদের অবস্থানকে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক হবে না। সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ১৯(১)(গ) অনুচ্ছেদ সংগঠন গঠনের স্বাধীনতা স্বীকার করে। অন্যদিকে, সরকারি চাকরির নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বৈধ আচরণবিধি আরোপের সুযোগও রয়েছে। নতুন বিধি কতটা বিস্তৃত হবে, তার আইনি ভিত্তি কী হবে এবং তা সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না — এসব প্রশ্নের উত্তর বিধির চূড়ান্ত রূপ ও প্রয়োগের উপর নির্ভর করবে।
শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকতার মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজন নিয়ে দ্বিমত থাকার কথা নয়। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান, নিয়োগে স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা, উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা — এসবই একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু সে লক্ষ্য অর্জনের উপায় কী হবে, সে প্রশ্নে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। শিক্ষকরা রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেই শিক্ষার মান নষ্ট হয়, এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। একই ভাবে, শিক্ষকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সব সময় গণতন্ত্র বা শিক্ষার পক্ষে ইতিবাচক ফল দেয়, এমন দাবিও করা যায় না। শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষানীতি নিয়ে গবেষণায় এই দ্বৈততার কথাই উঠে এসেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের জাতীয় শিক্ষা উদ্যোগ থেকে স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা—বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সেই ইতিহাসকে বর্তমানের কোনও একটি নীতির সরল সমর্থন বা বিরোধিতার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার না করে, তার জটিলতা বোঝা প্রয়োজন।
গণতন্ত্রে শিক্ষক শুধু রাষ্ট্রের নির্দেশ পালনকারী কর্মী নন, আবার নিজের রাজনৈতিক মত শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকারীও নন। তাঁর দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের আলোক দেওয়া, প্রশ্ন করতে শেখানো, স্বাধীন ভাবে বিচার করার ক্ষমতা তৈরি করা। আবার ব্যক্তিগত স্তরে তিনি সাংবাদিক মৌলিক অধিকারের ভিত্তিতে নিজের রাজনৈতিক মত প্রকাশেরও অধিকারী। ফলে, শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি নিজে সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে পারবেন কি না, নতুন নিয়োগবিধি নিয়ে বিতর্কের গভীরে রয়েছে সে প্রশ্নই। নিষেধাজ্ঞার চূড়ান্ত বিধি কী হবে, তার পরিধি কতটা বিস্তৃত হবে, তা আদালতের পরীক্ষায় টিকবে কি না, তা দেখার বিষয়। কিন্তু শিক্ষকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনাকে শুধু দলীয় রাজনীতির পক্ষে বা বিপক্ষে সীমাবদ্ধ রাখলে দেশ গঠনে, সমাজ গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকার অনেকাংশ যে ব্রাত্য থেকে যাবে তা নিয়ে সংশয় নেই।
❤ Support Us





