- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ৩, ২০২৬
জনগণনার কাজের জেরে পিছতে পারে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক ! ফেব্রুয়ারির বদলে মার্চে পরীক্ষার প্রস্তাব
২৭ সালের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার নির্ঘণ্ট ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। পূর্বনির্ধারিত সূচি মেনে পরীক্ষা হলে এক দিকে জনগণনার কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে বহু শিক্ষক-শিক্ষিকাকে, অন্যদিকে তাঁদেরই সামলাতে হবে রাজ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড পরীক্ষা। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষক সঙ্কটের আশঙ্কা থেকেই মাধ্যমিকের দিনক্ষণ বদলের প্রস্তাব দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। একই পথে হাঁটার কথা ভাবছে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদও। সব ঠিক থাকলে ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে মার্চে শুরু হতে পারে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী, আগামী বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু সে সূচি কার্যকর করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। পর্ষদ সূত্রে খবর, ১৫ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে ২ মার্চ থেকে পরীক্ষা শুরু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, প্রথম ভাষার পরীক্ষা দিয়ে শুরু হতে পারে মাধ্যমিক। ১৬ মার্চের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে সূচি এখনো চূড়ান্ত নয়। স্কুলশিক্ষা দফতরের অনুমোদন মিললেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হবে।
হঠাৎ পরীক্ষার সূচি বদলের ভাবনা কেন? এর নেপথ্যে রয়েছে জনগণনার কাজ। দেশজুড়ে জনগণনার কাজে বিপুল সংখ্যক সরকারি কর্মীর পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও নিয়োগ করার সম্ভাবনা রয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তৈরি— জনগণনার বিশাল কর্মযজ্ঞে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হতে পারে। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে জনগণনার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়ে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত চলার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সে সময়ের মধ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষা আয়োজন করা কার্যত কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা।
মাধ্যমিক পরীক্ষার আয়োজনের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভূমিকা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। পরীক্ষাকেন্দ্রে পরিদর্শক হিসাবে দায়িত্ব পালন, পরীক্ষার্থীদের উপর নজরদারি, পরীক্ষা পরিচালনার বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ— সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় পর্যাপ্ত শিক্ষককর্মীর। অন্যদিকে, জনগণনার কাজেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব থাকবে তাঁদের উপর। একই সময়ে দুই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজে শিক্ষকদের নিয়োগ করা হলে কোনও একটি ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দিতে পারে। পরীক্ষার কাজে শিক্ষকদের ব্যস্ত রাখলে জনগণনার কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা, আবার জনগণনার দায়িত্বে তাঁদের নিয়োগ করা হলে পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে তৈরি হতে পারে কর্মীসঙ্কট। এই জটিলতা এড়াতেই পরীক্ষার সূচি পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব বলে জানা গিয়েছে।
সূত্রের খবর, গত ২ নভেম্বর মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি লালু দাস স্কুলশিক্ষা দফতরের কমিশনারকে চিঠি দিয়ে পরীক্ষার সূচি পরিবর্তনের প্রস্তাব জানিয়েছেন। ওই চিঠির সঙ্গে বিকল্প নির্ঘণ্টও পাঠানো হয়েছে। নতুন সূচি তৈরির সময় শুধু জনগণনার বিষয়টিই নয়, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন প্রবেশিকা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দিনক্ষণও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। যাতে মাধ্যমিকের সঙ্গে অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সূচির সংঘাত না ঘটে, সে দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু মাধ্যমিক নয়, একই কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সূচিতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংসদ সূত্রে খবর, জনগণনার কাজে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়োগ করা হলে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেই কথা মাথায় রেখেই নতুন করে পরীক্ষার দিনক্ষণ নির্ধারণের কথা ভাবছে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ।
মঙ্গলবার সংসদ সভাপতি অসিতকুমার মণ্ডল জানিয়েছেন, আগামী বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা ১৬ মার্চের পর থেকে শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। সেই অনুযায়ী নতুন পরীক্ষাসূচি তৈরির কাজও চলছে। অর্থাৎ, মাধ্যমিকের প্রস্তাবিত সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই উচ্চমাধ্যমিকের দিনক্ষণ নির্ধারণ করতে চাইছে সংসদ। যদিও এ ক্ষেত্রেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা সামনে আসতেই শিক্ষকমহলে শুরু হয়েছে বিতর্ক। একাংশের বক্তব্য, জনগণনার কাজে যদি অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকাকে নিয়োগ করা হয়, তা হলে পরীক্ষার সময় তাঁদের পাওয়া যাবে না। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের মতো বড়ো মাপের পরীক্ষা পরিচালনা করতে গেলে পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন। সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে পরীক্ষার স্বাভাবিক পরিচালনাতেই সমস্যা হতে পারে। তাই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব অযৌক্তিক নয়।
যদিও ভিন্ন মতও রয়েছে। অনেক শিক্ষকের প্রশ্ন, জনগণনার কাজে যাঁদের নিয়োগ করা হবে, তাঁদের বাদ দিয়েও কি বিকল্প ব্যবস্থায় পরীক্ষা পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না? তাঁদের মতে, জনগণনার দায়িত্বে না থাকা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দিয়ে পরীক্ষার কাজ সামলানোর কথা ভাবা যেতে পারত। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়া পড়ুয়াদের পরীক্ষার সূচি বদলানোর প্রয়োজন হত কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। কারণ, বোর্ড পরীক্ষার দিনক্ষণ বদলালে শুধু পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতির উপরেই নয়, পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতির উপরেও তার প্রভাব পড়তে পারে। শিক্ষকদের শিক্ষা-বহির্ভূত কাজে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন ‘বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষকদের বার বার স্কুলের বাইরে বিভিন্ন সরকারি কাজে নিয়োগ করার ফলেই শিক্ষা ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের শিক্ষা বহির্ভূত কাজে ব্যবহার করলে সার্বিক ভাবে যে শিক্ষারই ক্ষতি হয়, তা আজ রাজ্যবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। ‘এসআইআর’, নির্বাচনের কাজ থেকে শুরু করে জনগণনা— গত এক বছরের অধিকাংশ সময়ই শিক্ষক-শিক্ষিকারা স্কুলের বাইরে থেকেছেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে স্কুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু-টি পরীক্ষা পিছিয়ে দিতে হচ্ছে।’ তাঁর আরও অভিযোগ, এর পরেও শিক্ষার অবনতি হলে তার দায় শিক্ষকদের উপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তা অন্যায়। একই বিষয়ে পড়ুয়াদের স্বার্থের কথা তুলে ধরেছেন ‘শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চ’-এর সাধারণ সম্পাদক কিংকর অধিকারী। তাঁর মতে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সূচি পরিবর্তন না করে প্রয়োজনে জনগণনার সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। না হলে পড়ুয়াদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। ওরা দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে পড়াশোনার উপর প্রভাব পড়বে। শিক্ষক হিসেবে সেটা আমরা মেনে নিতে পারি না।
❤ Support Us







