Advertisement
  • বি। দে । শ
  • নভেম্বর ৪, ২০২৬

শ্রমিক আন্দোলনে উত্তাল বাংলাদেশ ! পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত এক, জখম শতাধিক

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
শ্রমিক আন্দোলনে উত্তাল বাংলাদেশ ! পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত এক, জখম শতাধিক

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন আরও তীব্র হচ্ছে। ঢাকায় আন্দোলন চলছিলই, এবার আন্দোলনের আঁচে উত্তপ্ত গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, মিরপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ-সহ বিভিন্ন অঞ্চল। কোথাও জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ, কোথাও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, আবার কোথাও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ। পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছুড়েছে পুলিশ। পাল্টা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে আন্দোলনকারীদের একাংশের বিরুদ্ধে।

সংঘর্ষে পুলিশকর্মী, শ্রমিক, সাংবাদিক ও পথচারী-সহ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর। শ্রমিক অসন্তোষের জেরে একাধিক শিল্পাঞ্চলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বহু পোশাক কারখানা। এরই মধ্যে আন্দোলনে এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে গাজীপুরে। মৃতের নাম তৌফিক হোসেন (৩৫)। তিনি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বাসিন্দা, স্থানীয় কারখানার কর্মী। সোমবার বাহাদুরপুর এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনের সময় লাঠি ও ইটের আঘাতে মাথায় গুরুতর চোট পান তিনি। পরে তাঁকে ঢাকার উত্তরার একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

মঙ্গলবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তৌফিকের মৃত্যুর প্রতিবাদে বুধবার সকাল পৌনে ১০টা নাগাদ গাজীপুরে মিছিল বের করেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা। ঢাকা-টাঙ্গাইল এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ জাতীয় সড়কের একাধিক জায়গায় অবরোধের জেরে স্তব্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে দু-পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। পাল্টা কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। কয়েক জন পুলিশকর্মী এবং শ্রমিক আহত হন। অভিযোগ, বিক্ষোভের মধ্যে বিভিন্ন গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজীপুরে সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। শ্রমিক অসন্তোষের জেরে জেলার অন্তত ৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের সুপার আমজাদ হোসাইন দাবি করেছেন, আন্দোলনে শুধু কারখানার শ্রমিকেরাই অংশ নিচ্ছেন না, বাইরে থেকেও কেউ কেউ ইন্ধন জোগাচ্ছেন। শ্রমিক নন, এমন সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ঢাকা সংলগ্ন মিরপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দলে দলে জমায়েত করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। কোথাও কাঠের আসবাব জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়, কোথাও পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে অতিরিক্ত পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়। পরে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে পুলিশ। কয়েক জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে বলে খবর।

অশান্তি আরও ছড়িয়ে পড়েছে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে। হেমায়েতপুর, উলাইল এবং নিশ্চিন্তপুর এলাকায় সকাল থেকেই দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, বুধবার সকালে শ্রমিকেরা নিয়মমাফিক কারখানায় ঢুকে হাজিরা নথিভুক্ত করার পর সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ বাইরে বেরিয়ে আসেন। তার পর হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে জমায়েত করে বিক্ষোভ শুরু করেন তাঁরা। এক সময়ে রাস্তা অবরোধ করলে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তখনই দু-পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এর পর শ্রমিকেরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে পদ্মার মোড়, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। হেমায়েতপুরের সিঙ্গাইর সড়কের বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ শুরু হয়। আটকে পড়েন বহু যাত্রী।

আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকার একাধিক কারখানার ভিতরেও বুধবার সকাল থেকে বিক্ষোভ চলছিল। বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ শ্রমিকেরা দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। বহু সড়ক কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। পুলিশের তৎপরতায় ওই এলাকায় পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে এসেছে, যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে জানা যাচ্ছে। তবে নতুন করে অশান্তি এড়াতে একাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। গোটা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে নামানো হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-কেও।

মাঠে নেমেছেন বিনেপি বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও। তাঁদের দাবি, শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে বহিরাগতেরা ঢুকে পড়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটাচ্ছেন। অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি শ্রমিক সেজে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। যদিও এই অভিযোগের স্বাধীন ভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠনগুলির একাংশের বক্তব্য, আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর বহিরাগতদের হামলা ও ধরপাকড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু জানিয়েছেন, বুধবার বিকেলের দিকে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছিল। অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা হওয়ায় শ্রমিকেরা বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। তবে শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের গ্রেফতার, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ধরপাকড় ও নিপীড়নের ফলে পরিস্থিতি আরও হিংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে। গ্রেফতার হওয়া শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের দ্রুত নিঃশর্ত মুক্তির দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

আন্দোলনের আঁচ পৌঁছেছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাতেও। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো পথে নেমেছেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। বুধবার তাঁরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে কয়েক জনকে আটকও করা হয়। তবে শ্রমিকদের অভিযোগ, মজুরি বৃদ্ধি-সহ একাধিক দাবিতে তাঁরা শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন করছিলেন। সে সময় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা এসে তাঁদের মারধর করেন।পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এত সংঘর্ষ, অবরোধ আর অগ্নিসংযোগের মধ্যেই শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে তারেক রহমানের সরকার। জানা যাচ্ছে, পোশাকশিল্পে নতুন মজুরি কাঠামো আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। জানুয়ারি থেকে শ্রমিকেরা বর্ধিত বেতন হাতে পেতে পারেন বলে জানিয়েছেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বোর্ডের প্রথম বৈঠক শেষে এই সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। মজুরি বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী জানান, পরবর্তী বৈঠকে মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষ নিজেদের মজুরি প্রস্তাব পৃথক ভাবে জমা দেবে। বোর্ডের নিরপেক্ষ সদস্যও প্রস্তাব পেশ করবেন। তার পর তিনটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এ বি এম শামসুদ্দিন এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার জানিয়েছেন, দ্রুত নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন ‘বিজিএমইএ’। বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি জানান, দ্রুত মজুরি বোর্ডের বৈঠক করে মজুরি পুনর্নির্ধারণের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, নতুন মজুরি কাঠামো কবে চূড়ান্ত হবে, তা স্পষ্ট করে জানানো গেলে শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কিছুটা কাটতে পারে। তবে মজুরি বোর্ডের বৈঠক, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের আশ্বাসের পরেও শ্রমিক অসন্তোষ কতটা প্রশমিত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এক দিকে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবি, অন্যদিকে কারখানা বন্ধ, গ্রেফতার আর সংঘর্ষের ঘটনা — সব মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। দেশের রফতানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই শিল্পে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং শ্রমিকদের দাবি মেটানোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন তারেক রহমানের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!