Advertisement
  • বি। দে । শ
  • নভেম্বর ৩, ২০২৬

ইজরায়েলের চাপেই যুদ্ধের আগুনে ঘৃতাহুতি ! ইরানের কেশম দ্বীপে আমেরিকার হামলা, ফের বাড়বে তেলের দাম?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ইজরায়েলের চাপেই যুদ্ধের আগুনে ঘৃতাহুতি ! ইরানের কেশম দ্বীপে আমেরিকার হামলা, ফের বাড়বে তেলের দাম?

পশ্চিম এশিয়ায় আবারও যুদ্ধ পরিস্থিতি? কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা যতই উজ্জ্বল হয়ে উঠুক, যুদ্ধের মেঘ যে এখনো কাটেনি, তারই ইঙ্গিত মিলল সোমবার রাতে। ইরানের বৃহত্তম দ্বীপ কেশমে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ। আকাশে দেখা গেল যুদ্ধবিমানের আনাগোনা। আর তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দাবি, হরমুজ প্রণালীর মুখে অবস্থিত ইরানের ওই দ্বীপে হামলা চালিয়েছে আমেরিকার সেনাবাহিনী। ওয়াশিংটনের তরফে অবশ্য আনুষ্ঠানিক ভাবে হামলার কথা স্বীকার করা হয়নি। তবে মার্কিন আধিকারিকদের দাবি, এ অভিযান সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক। ইরানের সঙ্গে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।

মার্কিন আধিকারিকদের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজের উপর ইরান যাতে নির্বিচারে হামলা চালাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ। ইরানের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলিই ছিল মার্কিন হামলার লক্ষ্য। তবে হামলার পরিধি ছিল সীমিত। আমেরিকা যে ফের বড়ো মাপের সামরিক অভিযান শুরু করতে চলেছে, এমন কোনো ইঙ্গিত এ হামলায় নেই বলেই দাবি মার্কিন আধিকারিকদের। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের সময়টাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এক দিকে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন। অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক তৎপরতা। তারই মধ্যে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপর চাপ সৃষ্টি করছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আরও এক দফা হামলা চালানোর পক্ষে সওয়াল করছেন নেতানিয়াহু। ফলে কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের ঘটনা নিছক বিচ্ছিন্ন সামরিক পদক্ষেপ, না কি বৃহত্তর সংঘাতের পূর্বাভাস, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘আইআরএনএ’ জানিয়েছে, সোমবার গভীর রাতে কেশম দ্বীপে অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, দ্বীপের আকাশে দু–টি বিমান উড়তে দেখা যায়। শুধু কেশম নয়, ইরানের বন্দরনগরী বন্দর লেঙ্গে থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। সমুদ্রের দিক থেকে সে শব্দ ভেসে আসছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়েরা।

মার্কিন আধিকারিকদের বক্তব্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে ছোটো আকারের সামরিক অভিযান চালাচ্ছে আমেরিকা। তবে সেই সব অভিযানের কথা প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। চলতি সপ্তাহের গোড়ায় হরমুজ প্রণালীতে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)। মার্কিন আধিকারিকদের দাবি, ইরানেরক্ষেপণাস্ত্রের জবাবে আত্মরক্ষায় পাল্টা হামলা চালায় মার্কিন যুদ্ধবিমানটি। একই দিনে কেশম দ্বীপ থেকে ছোড়া আরও একটি ক্ষেপণাস্ত্র বাণিজ্যিক জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছিল। মার্কিন বাহিনী সেটিকে মাঝপথে প্রতিহত করে বলে দাবি। অন্যদিকে, সোমবারই ‘আইআরজিসি’ দাবি করেছে, ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কেশম দ্বীপের দক্ষিণে আমেরিকার দু–টি চালকবিহীন নজরদারি বিমান আটক করেছে তারা। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীর পূর্ব দিকে একটি এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংস করার দাবিও করেছে ইরানের সেনাবাহিনী। যদিও এই দাবির সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা যায়নি।

কৌশলগত দিক থেকে কেশম দ্বীপের গুরুত্ব অপরিসীম। হরমুজ প্রণালীর মুখে অবস্থিত এই দ্বীপে রয়েছে ইরানের বিশাল ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, নৌসেনার গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ও লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র। অতীতেও ইরানের সঙ্গে সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বীপটিকে নিশানা করেছে আমেরিকা। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের উপর নজরদারি এবং জলপথের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ক্ষেত্রে কেশমের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর সামনে আসার কয়েক ঘণ্টা আগেও যুদ্ধের সম্ভাবনাকে কার্যত উড়িয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। বরং ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছনোর আশাই দেখিয়েছিলেন তিনি। সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়েছিল। আমরা জিতেছি। আদৌ একে যুদ্ধ বলা যায় কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কারণ, গত কয়েক মাস ধরে আমরা কোনো লড়াই করছি না।’ইরানের সঙ্গে চুক্তির সম্ভাবনা নিয়েও যথেষ্ট আশাবাদী ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ‘খুব তাড়াতাড়ি চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেলের দামের পতনকে যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন ট্রাম্প। তিনি লেখেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০ ডলার কমেছে। কারণ, বাজারের ধারণা, ইরানের সঙ্গে আর যুদ্ধ হবে না। তেহরানও দ্রুত সমঝোতা চাইছে বলে দাবি করেন তিনি। শুধু ট্রাম্প নন, আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে আশাবাদী আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। সোমবার তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে সে দিনই মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁর। ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মহসেন রেজ়াইকে গত সপ্তাহে পাঠানো একটি চিঠি সম্পর্কে ভ্যান্স বলেন, ‘ইরানিদের সঙ্গে আমাদের বেশ কয়েক দফা ভাল আলোচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ও আমি, দু–জনেই মনে করছি, আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছনোর সম্ভাবনা যথেষ্ট রয়েছে। আমরা সে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।’

তেহরানের তরফেও আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়নি। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই জানিয়েছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাঁদের দাবিগুলি ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট ভাবে জানানো হয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আমেরিকার। তাঁর দাবি, হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। আমেরিকা শর্ত মেনে নিলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তা কার্যকর করা সম্ভব। ইরানের শর্তগুলির মধ্যে রয়েছে, দেশটির বন্দরগুলির উপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং সংঘাত বন্ধের নিশ্চয়তা। তেহরানের বক্তব্য, শর্ত পূরণ হলেই হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া ও পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা শুরু করা সম্ভব হবে। তবে কাতারের মধ্যস্থতায় কয়েক দিন ধরে চলা আলোচনা শেষ হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান সূত্র মেলেনি। প্রস্তাবগুলিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে খবর।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবারের ভোটে হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস এবং সেনেট — মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে লড়ছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। যুদ্ধের জেরে আমেরিকায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন জনমত সমীক্ষায় তার প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে। ফলে ভোটের আগে যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনাকে সামনে আনতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। সোমবার প্রচারের শেষ পর্যায়ে ওয়াশিংটন থেকে দেওয়া বার্তায় তেলের দাম কমার বিষয়টিকেও নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন ট্রাম্প। তবে মঙ্গলবার তিনি বলেন, ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে যুদ্ধ শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেন, মধ্য ইরানের সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ আমেরিকাকে হামলা চালাতে হতে পারে। ওই স্থাপনাটি ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ।

তবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যাই দাবি করুন না কেন, হরমুজ প্রণালী ঘিরে নয়া উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপক ভাবে কমে গিয়েছে। অথচ যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হত। ফলে হরমুজ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সোমবার ইরান ও কাতারের আধিকারিকদের মধ্যে আলোচনা এবং যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৭ শতাংশেরও বেশি কমেছিল। কিন্তু মঙ্গলবার কেশম দ্বীপে আমেরিকার হামলার খবর সামনে আসতেই ফের কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী দাম। মঙ্গলবার অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ সেন্ট বা ০.২১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬.৬৬ ডলারে। ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ৩ সেন্ট বা ০.০৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪.৮ ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, কেশমে হামলার খবর বাজারে নতুন করে ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি করেছে। যখন বাজার কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল, তখনই সামরিক তৎপরতার খবর পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

সব মিলিয়ে এক দিকে তেহরান-ওয়াশিংটন আলোচনায় সমঝোতার সম্ভাবনা, অন্যদিকে ইরানের উপর মার্কিন হামলার খবর, নেতানিয়াহুর নতুন সামরিক অভিযানের জন্য চাপ—তিনের টানাপড়েনে ক্রমশ জটিল হচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি। তার উপর আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন। ফলে ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেই নয়, ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতেও নতুন করে উদ্যোগী হয়েছে আমেরিকা। আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর আবু ধাবিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা মার্কিন প্রতিনিধিদের। যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সংঘাত প্রশমন এবং মস্কো-কিয়েভের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে সেখানে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!