- দে । শ
- জানুয়ারি ১৫, ২০২৬
গ্রামের প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সুমিলা: প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে স্বপ্নপথে এগোচ্ছে ময়নাগুড়ির বনবস্তির মেয়ে
স্বপ্ন আর আশা; বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে, সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধের পাহাড়সম দৃঢ়তা আর এক আকাশ জেদ নিয়ে দাঁড়ায় সে। লড়তে-লড়তে, শিখতে-শিখতে হার-জিতের সমীকরণ বদলে যায় চিরতরে। এমনই এক অনন্য সংগ্রামের সাক্ষী থাকছে জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম বুধুরাম বনবস্তি। এর আগে সেখানে কেউ মাধ্যমিক পরীক্ষার গণ্ডি পেরোয়নি। ঘন জঙ্গল, দুর্গম কাঁচা রাস্তা এবং বন্যপ্রাণীর আতঙ্কে ঘেরা ওই গ্রামে শিক্ষার আলো পৌঁছানো সহজ কাজ নয়। এমন প্রতিকূলতার মাঝেও এবছর ইতিহাস গড়তে চলেছে এক মেয়ে, সুমিলা ওরাওঁ।
পানবাড়ি ভবানী হাই স্কুলের পড়ুয়া সুমিলা। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব প্রায় সাত কিলোমিটার। ঘন জঙ্গলের হাতি, গণ্ডার, বাইসনসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থলের মধ্য দিয়েই তাঁকে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করতে হয়। মুখোমুখি হতে হয় বিপদের। সকালবেলায় স্কুলে পৌঁছানো, তারপর টিউশন, এবং বিকেলের দিকে ফেরার পথে আবার বন্যপ্রাণীর ভয়— এটাই তার প্রতিদিনের সংগ্রাম। এই সাত কিলোমিটার পথ একটি যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাড়ি দেওয়ার মতো, কিন্তু সুমিলার দৃঢ়চেতা ও স্বপ্নের অদম্য ইচ্ছাশক্তি কোনোকিছুকেই থামাতে পারেনি। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান সুমিলার মা রূপালি ওরাওঁ, চা-বাগানে দিনমজুরি আর কৃষিকাজ করে সংসার চালান। বাবা মঞ্চাল ওরাওঁ কাজের সূত্রে বাইরে থাকেন। সীমিত আয়, অভাব, সংসারের দায়িত্ব, এসব সত্ত্বেও পরিবারটি ৪ মেয়েকে শিক্ষিত করার জন্য আপসহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এ লড়াই আর স্বপ্নের জন্যই সুমিলার হাতে উঠে আসে পড়াশোনার হাতেখড়ি। পরিবার জানে, মেয়ের সাফল্য শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো গ্রামের শিক্ষার পথে দিশা দেখাবে।
এ গ্রামের মধ্যে কেউ দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেননি। সে কারণে সুমিলার মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি গোটা গ্রামকে প্রবল উৎসাহ আর অছোঁয়া এক স্বপ্নে মুখর করে তুলেছে। গ্রামবাসীরা বলছেন, এবার আমাদের মেয়ে ইতিহাস তৈরি করতে চলেছে। সে শুধু নিজের জন্য নয়, আশেপাশের প্রান্তিক গ্রামের অন্য মেয়েদের জন্যও পথ দেখাবে। সুমিলার স্বপ্ন বড়ো, সে নার্স হয়ে নিজের গ্রামবাসীর জন্য কাজ করতে চায়। তাই তাঁর পড়াশোনা কেবল স্বপ্ন পূরণের মাধ্যম নয়, এক ধরনের সামাজিক দায়িত্বও। এই মুহূর্তে রিভিশনে ব্যস্ত থাকলেও স্কুলে যাতায়াতের পথে সাইকেল বা পায়ে পথ পেরোনোর সময় বন্যপ্রাণীর ভয় তার সঙ্গে থাকতেই হয়। তবে অভ্যাসে পরিণত হওয়ায় আর ভয়কে বেশি গুরুত্ব দেয় না সে।
ময়নাগুড়ি ব্লকের বিডিও প্রসেনজিৎ কুন্ডু জানিয়েছেন, পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্কুলে যাতায়াতের জন্য বাস ব্যবস্থা, বনদফতরের টহল, সবই আছে, যাতে সুমিলা কোনো সমস্যায় না পড়ে সে বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা হবে। গ্রামের মানুষও বাড়ি ফেরা পর্যন্ত তার দিকে নজর রাখছে। প্রত্যেকের চোখে তাঁর লড়াইকে দেখার আনন্দ, সহমর্মিতা এবং স্বপ্নপূরণের আশা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে মাধ্যমিক পরীক্ষা। হাতে আর মাত্র দু-সপ্তাহ। সুমিলার চোখে এখন শুধুই পড়াশোনা, প্রতিটি রিভিশন, প্রতিটি যাত্রা তাকে তাঁর স্বপ্নের দিকে আরো এককদম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সুমিলার গল্প শুধুই একটি মেয়ের শিক্ষার লড়াই নয়, এটি পুরো বুধুরাম বনবস্তির জন্য নতুন দিগন্তের প্রতীক। জঙ্গলের ভেতর থেকেও এক মেয়ে স্বপ্ন দেখতেই পারে এবং সে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে, এটাই প্রমাণ করছে সুমিলার অনন্য এ যাত্রা।
❤ Support Us





