- দে । শ
- ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫
এসআইআর শুনানিতে বিএলএদের উপস্থিতি নিয়ে ইসির সঙ্গে সংঘাত, প্রয়োজনে আইনি পথে মোকাবিলা, বার্তা অভিষেকের
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার শুনানি পর্ব শনিবার থেকে শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপে দলের করণীয় ঠিক করতে রবিবার প্রায় এক লক্ষ নেতা-কর্মীর সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈঠকে তিনি দলের জন্য দু’টি স্পষ্ট নির্দেশ দেন। প্রথমত, শুনানি পর্বে দলের বুথ লেভেল এজেন্টদের (বিএলএ) অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুনানি কেন্দ্রের বাইরে তৃণমূলের তরফে সহায়তা শিবির খুলে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করতে হবে।
তবে বিএলএদের উপস্থিতি সংক্রান্ত এই নির্দেশকে কেন্দ্র করেই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংঘাতের ইঙ্গিত রয়েছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের একাংশ নেতা। কারণ, নির্বাচন কমিশন শুনানি পর্বে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিকে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না। সূত্রের খবর, রবিবারের বৈঠকে অভিষেক স্পষ্টভাবে বলেন, কমিশন অনুমতি না দিলেও বিএলএদের শুনানিতে থাকতেই হবে। প্রয়োজনে আইনি লড়াইয়ের পথেও যেতে হবে বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করে অভিষেক বলেন, বিএলএদের শুনানি কেন্দ্রে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিদির তরফ থেকেই এসেছে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিষেক বলেন, কমিশনের কৌশল হল মানুষকে দীর্ঘ অপেক্ষায় রেখে অধৈর্য করে তোলা, যাতে তাঁরা শুনানি কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরে যান। তাতে সহজেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া সম্ভব হবে। এই পরিস্থিতিতে বুথস্তরে কাদের শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, কেন ডাকা হচ্ছে—তা নজরে রেখে দলীয়ভাবে পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেন তিনি।
বিএলএদের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অভিষেক বলেন, এসআইআরের প্রথম পর্বে রাজনৈতিক দলগুলির বিএলএরা যুক্ত ছিলেন। ভোটের সময় প্রতি বুথে রাজনৈতিক দলের এজেন্ট থাকেন, গণনাকেন্দ্রেও এজেন্ট রাখা হয়। তাহলে শুনানি পর্বে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে না কেন—এই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর এই যুক্তি সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হলেও তৃণমূলের অন্দরে অনেকের মত, বুথভিত্তিক শুনানিতে পর্যাপ্ত লোক দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি তৃণমূল ছাড়া অন্য কোনও দলের নেই, তা বুঝেই অভিষেক এই বক্তব্য রেখেছেন।
এসআইআরের শুনানি পর্বে কঠোর সাংগঠনিক নজরদারির নির্দেশ দিয়ে অভিষেক আবারও আসন্ন বিধানসভা ভোটের প্রেক্ষিতে এই প্রক্রিয়াকে ‘যুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেন। সূত্রের দাবি, বৈঠকে তিনি বলেন, বিজেপির নেতারা রাজ্যে এক কোটি রোহিঙ্গা থাকার দাবি করলেও বাস্তবে মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটার মিলিয়ে ইতিমধ্যেই ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। শুনানি পর্বে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ আরও প্রকট হতে পারে বলেও দলকে সতর্ক করেন তিনি।
শুনানি চলাকালীন জেলায় জেলায় প্রবীণ নাগরিকদের হয়রানির অভিযোগ তুলে সোমবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরে তৃণমূলের প্রতিনিধিদল যাবে বলেও জানানো হয়। পাশাপাশি, পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ভার্চুয়াল শুনানির ব্যবস্থা কেন করা হচ্ছে না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অভিষেক। তাঁর বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টে ভার্চুয়াল শুনানি হয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভার্চুয়াল মাধ্যমে ভাষণ দেন—তাহলে নির্বাচন কমিশন কেন সেই পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে না? এই দাবিগুলি জানাতেই আগামী ৩১ ডিসেম্বর দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দফতরে যাওয়ার কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
এ ছাড়া আবাস প্রকল্পে যাঁরা বাড়ি পেয়েছেন, তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রের বন্দোবস্ত করছে তৃণমূল। সেই নথি তাঁরা শুনানির সময় দেখাতে পারবেন বলে জানানো হয়। বৈঠকের শুরুতে প্রারম্ভিক ভাষণ দেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী। পরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অভিষেক একদিকে দলের বিএলএদের কাজের প্রশংসা করেন, অন্যদিকে স্পষ্ট করে দেন—ভোট পর্যন্ত নাওয়া-খাওয়া ভুলে সংগঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। একই সঙ্গে সাংগঠনিক শক্তির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ বজায় রাখার বার্তাও স্পষ্ট করে দেন তিনি।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসককে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, শুনানিকেন্দ্রে কোনও রাজনৈতিক দলের বুথ স্তরের এজেন্ট (বিএলএ)কে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না । যদি কোনও দলের এজেন্ট শুনানিকেন্দ্রে ঢুকতে চেষ্টা করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা বা আধিকারিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে ।
রবিবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভার্চুয়াল মাধ্যমে দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে শুনানিকেন্দ্রে এজেন্টদের উপস্থিতি সংক্রান্ত নির্দেশনা দেন । এর পরের দিন হুগলিতে বিধায়ক অসিত মজুমদার চুঁচুড়া-মগড়া ব্লক অফিসে গিয়ে শুনানি বন্ধ করে দেন । তাঁর দাবি, বিএলএদের কেন শুনানিতে রাখা হচ্ছে না, তা কমিশনের লিখিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন । পরবর্তীতে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে সমস্ত জেলাশাসকের কাছে নির্দেশিকা পাঠানো হয়, যাতে নিশ্চিত করা হয়:
১. কোনও রাজনৈতিক দলের এজেন্টকে শুনানিকেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না।
২.শুনানি প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা যাবে না।
চুঁচুড়া-মগড়া কেন্দ্র থেকে সোমবার অসিত জানান, “অভিষেক এবং মমতা যে নির্দেশ দেবেন, আমি সে অনুযায়ী লড়াই চালাব ।” তিনি দাবি করেন, কমিশন সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করছে, কারণ বয়স্ক ও অসুস্থ ভোটারদেরও লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে । তিনি মানবিক কারণে প্রাথমিক অবস্থান তুলে নেন, কিন্তু ভবিষ্যতে শুনানি বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দেন । একইদিন বর্ধমানের একটি কেন্দ্রে শুনানি ঘিরে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ এবং অশান্তির খবরও এসেছে। তৃণমূলের এজেন্টদের উপস্থিতি নিয়ে যে সংঘাতের পথে তারা হাঁটছে, তার মোকাবেলায় কমিশন অনড় অবস্থান রেখেছে।
❤ Support Us





