Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬

এয়ারসেল-ম্যাক্সিস মামলায় প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়ার অনুমোদন পেল ইডি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
এয়ারসেল-ম্যাক্সিস মামলায় প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়ার অনুমোদন পেল ইডি

এয়ারসেল-ম্যাক্সিস অর্থপাচার মামলায় প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পথে বড় পদক্ষেপ নিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। সংস্থাটি দিল্লির একটি বিশেষ আদালতে প্রসিকিউশন স্যাংশন বা বিচার অনুমোদনের আদেশ দাখিল করেছে, যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগত বাধা দূর হয়েছে।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এই অনুমোদন নেওয়া হয়। ২০০৬ সালে বিদেশি বিনিয়োগ প্রোমোশন বোর্ড (FIPB)-এর অনুমোদন সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া তদন্তে বহু বছর ধরে বিলম্ব হচ্ছিল। নতুন এই অনুমোদনের ফলে এখন মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে পারবে।

ইডির অভিযোগ, মালয়েশিয়ার টেলিকম সংস্থা ম্যাক্সিসের ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় ৩,৫৬৬ কোটি টাকা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) প্রস্তাবে পি চিদাম্বরম তৎকালীন অর্থমন্ত্রী হিসেবে এফআইপিবি অনুমোদন দেন। কিন্তু প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ তাঁর ৬০০ কোটি টাকার অনুমোদনসীমা অতিক্রম করায়, এটি মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটি (CCEA)-র অনুমোদনের জন্য পাঠানো উচিত ছিল বলে দাবি ইডির।

এয়ারসেল-ম্যাক্সিস মামলা প্রায় দুই দশক পুরনো একটি বহুল আলোচিত আর্থিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক, যার সূত্রপাত ২০০৬ সালে। বিষয়টির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম, বিদেশি বিনিয়োগ প্রোমোশন বোর্ড (FIPB)-এর অনুমোদন প্রক্রিয়া, এবং টেলিকম সংস্থা এয়ারসেলে মালয়েশিয়ার কোম্পানি ম্যাক্সিসের বিনিয়োগ।

২০০৬ সালে মালয়েশিয়াভিত্তিক টেলিকম গ্রুপ ম্যাক্সিস, তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল কমিউনিকেশন সার্ভিসেস হোল্ডিংসের মাধ্যমে ভারতীয় টেলিকম সংস্থা এয়ারসেলে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (তৎকালীন প্রায় ৩,৫৬৬ কোটি টাকা) বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। সে সময় বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব ছিল FIPB-এর, যা অর্থ মন্ত্রকের অধীনস্থ ছিল।

ইডি ও সিবিআইয়ের অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এই প্রস্তাবে অনুমোদন দেন, যদিও তাঁর একক অনুমোদনের সীমা ছিল ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। অভিযোগ ওঠে, বিনিয়োগের পরিমাণ সেই সীমা অতিক্রম করায় বিষয়টি মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটি (CCEA)-র কাছে পাঠানো উচিত ছিল। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই অনুমোদন দেওয়া হয় বলে তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি।

পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে যে, এয়ারসেলের তৎকালীন মালিক সি. শিবশঙ্করণকে চাপ সৃষ্টি করে তাঁর শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়েছিল, যাতে ম্যাক্সিস সংস্থা এয়ারসেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং অভিযুক্ত পক্ষ তা অস্বীকার করেছে।

তদন্তকারী সংস্থার আরও দাবি, এফআইপিবি অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত কিছু সংস্থায় অর্থ প্রবাহিত হয়, যা অর্থপাচারের সন্দেহ উত্থাপন করে। এই সূত্র ধরেই অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন (PMLA)-এর অধীনে তদন্ত শুরু করে ইডি।

২০১১ সালে সিবিআই প্রথমে এই মামলায় এফআইআর দায়ের করে। পরে ইডি অর্থপাচারের অভিযোগে পৃথক মামলা রুজু করে। তদন্ত চলাকালীন একাধিকবার তলব, জিজ্ঞাসাবাদ এবং চার্জশিট দাখিল করা হয়।

২০১৮ সালে পি চিদাম্বরমের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। তাঁর পুত্র কার্তি চিদাম্বরমের নামও তদন্তে উঠে আসে। অভিযোগ ছিল, বিনিয়োগ অনুমোদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সংস্থার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযুক্তরা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং দাবি করেছেন যে অনুমোদন আইনসম্মত ও নিয়ম মেনেই দেওয়া হয়েছিল।

এই মামলায় অন্যতম বড় প্রশ্ন ছিল প্রসিকিউশন স্যাংশন বা বিচার শুরুর অনুমোদন। সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা চালাতে সরকারের নির্দিষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, আপিল এবং শুনানির কারণে মামলার অগ্রগতি বারবার বিলম্বিত হয়েছে। সম্প্রতি প্রসিকিউশন স্যাংশন মঞ্জুর হওয়ায় মামলার বিচার প্রক্রিয়া এগোনোর পথ আরও সুগম হয়েছে।

এয়ারসেল-ম্যাক্সিস মামলা শুধুমাত্র একটি আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, এটি প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা, নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং বিদেশি বিনিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। এই মামলা ভারতের রাজনৈতিক পরিসরেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং কেন্দ্রের তৎকালীন সরকারকে চাপে ফেলে।

সব মিলিয়ে, এয়ারসেল-ম্যাক্সিস মামলা ভারতের আর্থিক প্রশাসন, রাজনৈতিক জবাবদিহিতা এবং আইনি কাঠামো—এই তিনটির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত অধ্যায়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!