- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ১৩, ২০২৬
চিন মোকাবিলায় অরুণাচলে বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ! উন্নয়নের নামে উচ্ছেদের আশঙ্কা, সিয়াং ঘিরে তীব্র হচ্ছে সংঘাত
চিনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতা। একদিকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন, অন্যদিকে নদীকে ঘিরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা জনজাতির জীবন ও অস্তিত্ব। দুইয়ের টানাপড়েনে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং উপত্যকা। সিয়াং নদীর উপর প্রস্তাবিত ১১,২০০ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে স্থানীয় জনজাতির সঙ্গে রাজ্য সরকারের সংঘাত এখন আর কেবল উন্নয়ন বনাম পরিবেশের বিতর্কে আটকে নেই। তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে মূলনিবাসী মানুষের জমির অধিকার, প্রথাগত শাসনব্যবস্থা, প্রশাসনের ভূমিকা আর সরকারের উপর সাধারণ মানুষের আস্থার প্রশ্নও।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের পোশাকি নাম ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’ বা ‘এসইউএমপি’। অরুণাচল প্রদেশ সরকারের যুক্তি, তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর উপর চিন যে বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তুলছে, তার সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় ভারতেরও সিয়াং নদীতে বিপুল পরিমাণ জল সঞ্চয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সে কারণেই এই প্রকল্পকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রাজ্য সরকার। কিন্তু নদীর তীরে বসবাসকারী আদি জনজাতির বহু মানুষের কাছে এ যুক্তি আশ্বাসের বদলে আশঙ্কাই বাড়িয়েছে। তাঁদের ভয়, বিশাল জলাধার তৈরি হলে একাধিক গ্রাম জলের তলায় চলে যেতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে চাষের জমি, বনভূমি, মাছ ধরার অবলম্বন ও পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সম্পর্কিত পবিত্র ভূমি। বদলে যেতে পারে তাঁদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি আর পরিচয়ের ভিত্তি। এ পরিস্থিতিতে প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ ক্রমশ সংঘাতের চেহারা নিয়েছে। নিরাপত্তাবাহিনীর মোতায়েন, বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং সংবাদমাধ্যমের উপর বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ — সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সিয়াং নদীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃহত্তর ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ভবিষ্যৎ। তিব্বতে এ নদীই ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত। অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করার পরে তার নাম সিয়াং। পরে অসমে অন্যান্য নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ওই জলধারাই ব্রহ্মপুত্রের রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। নদীর উজানে চিনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনাই ভারতের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইয়ারলুং সাংপোর নিম্ন অববাহিকায় ৬০,০০০ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে অনুমোদন দেয় বেজিং। ‘মেদোগ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প’ নামে পরিচিত এই পরিকল্পনায় পাঁচটি ধাপে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কথা রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হওয়ার কথা ঘোষণা করে চিন। বিনিয়োগের আনুমানিক পরিমাণ ১.২ লক্ষ কোটি ইউয়ান। ভারতের আশঙ্কা, উজানে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, জল অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া কিংবা হঠাৎ বিপুল পরিমাণ জল ছেড়ে দেওয়ার ফলে ভাটির দিকে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। সেই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সিয়াং নদীতে বড়ো জলাধার তৈরি করা গেলে জলপ্রবাহের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে অরুণাচল প্রদেশ সরকার।
অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুর বক্তব্য, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা আর জল সঞ্চয়ের পরিমাণ এক বিষয় নয়। চিনের ‘মেদোগ প্রকল্প’-এ প্রায় ৫৫০ কোটি ঘনমিটার জল সঞ্চয়ের ব্যবস্থা থাকতে পারে বলে তাঁর দাবি। অন্যদিকে, প্রস্তাবিত সিয়াং প্রকল্পে ব্যবহারযোগ্য জল সঞ্চয়ের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৯২০ কোটি ঘনমিটার। সরকারের দাবি, এই বিপুল জলাধার উজান থেকে হঠাৎ জল ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কৌশলগত সুরক্ষা তৈরি করতে পারে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবে চিনের বাঁধের সম্ভাব্য প্রভাব কতটা কমাতে পারবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তার জন্য প্রয়োজন বিস্তারিত জলবিদ্যাগত সমীক্ষা, প্রকৌশলগত নকশা এবং জলাধার পরিচালনার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা। বাঁধ নির্মাণের বিরোধীরা অবশ্য সরকারের এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। মানবাধিকার আইনজীবী ও বাঁধবিরোধী আন্দোলনকর্মী এবো মিলির বক্তব্য, চিন সিয়াং নদীকে সম্পূর্ণ শুকিয়ে দিতে চায় — এমন দাবি সঠিক নয়। তাঁর মতে, নদীর জলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যে থাকা হিমবাহের হ্রদ থেকেও আসে। ভারত ও চিনের মধ্যে জলবণ্টন চুক্তি করার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল বলেও মনে করেন তিনি। মিলির আরও বক্তব্য, চিনের বাঁধের সম্ভাব্য বিপদের তুলনায় ভারতের নিজের প্রস্তাবিত ১১,০০০ থেকে ১২,০০০ মেগাওয়াটের বিশাল বাঁধই স্থানীয় মানুষের কাছে বেশি উদ্বেগের কারণ। হিমবাহের হ্রদ থেকে সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলায় রাজ্য সরকারের কোনো পর্যাপ্ত পরিকল্পনা নেই বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
প্রকল্পের বর্তমান পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘প্রাক্-সম্ভাব্যতা রিপোর্ট’ বা ‘পিএফআর’। এই সমীক্ষার উদ্দেশ্য, সিয়াং নদীর উপর বিশাল বাঁধ নির্মাণ প্রযুক্তিগত ভাবে সম্ভব কি না, কোথায় নির্মাণ করা যেতে পারে, ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি কতটা অনুকূল, এসব খতিয়ে দেখা। সরকারের বক্তব্য, ‘পিএফআর’ কোনো নির্মাণের অনুমোদন নয়। এ পর্যায়ে মূলত প্রযুক্তিগত ও ভূতাত্ত্বিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস ধরে সমীক্ষা চালানোর কথা। সম্ভাব্য নির্মাণস্থল, ভূমিকম্পের ঝুঁকি, প্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয়তা আর ভাটির দিকে বন্যার প্রকোপ কমানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, এক বার সমীক্ষা শুরু হয়ে গেলে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়ে যাবে। তাঁদের মতে, সিয়াং উপত্যকার ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ ও জনজাতি জীবনযাত্রায় যে পরিবর্তন ঘটতে পারে, তা এক বার শুরু হলে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সে কারণেই ‘সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরাম’ বা ‘এসআইএফএফ’ সমীক্ষার কাজ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে নিরাপত্তাবাহিনী প্রত্যাহার ও স্থানীয় জনজাতির সঙ্গে অর্থবহ আলোচনার দাবিও উঠেছে।
অরুণাচল প্রদেশ সরকার অবশ্য জানিয়েছে, প্রযুক্তিগত ভাবে প্রকল্পটি উপযুক্ত বলে বিবেচিত হলেও নির্মাণের আগে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট, প্রয়োজনীয় আইনি অনুমোদন এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনজাতির সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী খান্ডুর আশ্বাস, বিশেষজ্ঞেরা যদি মনে করেন প্রকল্পটি উপযুক্ত নয়, তা হলে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়েই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু এ আশ্বাসে যে বিক্ষোভকারীদের আস্থা ফিরছে না, সাম্প্রতিক ঘটনাবলিই তার প্রমাণ। সিয়াং প্রকল্প ঘিরে সবচেয়ে বড়ো উদ্বেগ বাস্তুচ্যুতি। ‘এসআইএফএফ’-এর দাবি, প্রস্তাবিত জলাধার তৈরি হলে ২৭টি গ্রাম সম্পূর্ণ বা আংশিক ভাবে জলের তলায় চলে যেতে পারে। আরও কয়েক ডজন গ্রাম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংগঠনটির আশঙ্কা, এর ফলে এক লক্ষ থেকে দেড় লক্ষ মূলনিবাসী মানুষকে নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়তে হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, সম্ভাব্য ক্ষতির পরিধি শুধু বাড়িঘর হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধও থাকবে না। এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা অনেকাংশেই কৃষিকাজ, ধানচাষ, ঝুম চাষ, ফলের বাগান, বনজ সম্পদ ও নদীকে ঘিরে নানা কর্মকাণ্ডের উপর নির্ভরশীল। জলাধার তৈরি হলে উর্বর কৃষিজমি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বনভূমি ও মৎস্যসম্পদ। একই সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বসম্পন্ন নানা স্থান। জনজাতির কাছে জমি নিছক সম্পত্তি নয়। তাঁদের বিশ্বাস, এই ভূমি তাঁদের আদিপুরুষ আবো তানির সঙ্গে সম্পর্কিত। সিয়াং নদী তাঁদের কাছে ‘আনে সিয়াং’, অর্থাৎ ‘মা সিয়াং’। তাঁদের সংস্কৃতি, পরিচয় এবং সামষ্টিক স্মৃতির সঙ্গে নদী ও ভূমির সম্পর্ক গভীর। জনজাতি গবেষকের মতে, পরিবেশগত ক্ষতি ও ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাস্তব হলেও বড়ো বাঁধের বিরুদ্ধে মানুষের আপত্তির আরও গভীর কারণ রয়েছে। নিজেদের জীবনযাত্রা হারানোর ভয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার খর্ব হওয়ার আশঙ্কাই তাঁদের বিরোধিতাকে তীব্র করেছে। সিয়াং উপত্যকার মানুষের কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়। তাঁদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষদের জমির ভবিষ্যৎ কে নির্ধারণ করবে, সেটাই বড়ো প্রশ্ন।
অরুণাচল প্রদেশের জনজাতির সমাজে গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করার একটি প্রথাগত ব্যবস্থা রয়েছে। ‘কেবাং’ নামে পরিচিত এই পরিষদের নেতৃত্বে থাকেন প্রবীণরা। বৃহত্তর জনজাতির সম্মিলিত স্বার্থের প্রশ্নে বিভিন্ন আদি গোষ্ঠীকে একত্র করে যে সর্বোচ্চ পরিষদ গঠিত হয়, তার নাম ‘বোগুম বোকাং কেবাং’। এ ধরনের বৈঠক সচরাচর হয় না। ২৫ বছরের ব্যবধানের পর ২০২৫ সালের অগস্টে আপার সিয়াং জেলার গেকুতে এমনই এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রস্তাবিত বাঁধ আর তার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষার বিরোধিতা করতেই ওই বৈঠক ডাকা হয়। এই প্রথাগত প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা এখন বিরোধের অন্যতম কেন্দ্র। স্থানীয় সংগঠনগুলির বক্তব্য, কয়েকটি পরিবারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে প্রকল্পের পক্ষে সম্মতি রয়েছে বলে দাবি করা যায় না। গোটা গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলোচনা ও প্রথাগত প্রতিষ্ঠানগুলির মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ‘অল আদি ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন’ও কেবাংয়ের মাধ্যমে আলোচনার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, গ্রামবাসী ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে তারা। অরুণাচল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির বক্তব্যও একই দিকে। দলের দাবি, স্থানীয় জনজাতির সুস্পষ্ট সম্মতি ছাড়া প্রকল্পের কাজ এগোনো উচিত নয়। সেই সঙ্গে ‘গাঁও বুড়া’ ও সাসপেন্ড হওয়া সরকারি কর্মীদের পুনর্বহাল করার দাবিও জানানো হয়েছে।
প্রকল্পের বিরোধিতা ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত সমীক্ষার কাজে নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েনকে কেন্দ্র করে। সিয়াং উপত্যকার উগেং-কমকার এলাকায় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আগে সমীক্ষা ও খননকাজের সুবিধার্থে নিরাপত্তাকর্মীদের দল পাঠানো হয়েছিল। তার পর থেকেই বিরোধিতা তীব্র হতে থাকে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুর আপার সিয়াং সফরের সময় বিক্ষোভকারীরা রাস্তা অবরোধ করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্থানীয় বিধায়কের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। একটি পুলিশের গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ৪ অক্টোবর ফের সংঘর্ষ বাধে। বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে আহতের সংখ্যা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি সামনে এসেছে। ‘এসআইএফএফ’-এর সাধারণ সম্পাদক লিকেং লিবাং ৬ অক্টোবর দাবি করেন, প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এমন পরিবারের ৬৭ জন সদস্যও সংঘর্ষে আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, পুলিশের দাবি, আট জনেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন। ওই ঘটনায় পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে দু-জন মহিলা।
পুলিশের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করার সময় নিরাপত্তাকর্মীদের উপর হামলা চালানো হয়। একটি অভিযোগ অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন বিক্ষোভকারী নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। আত্মরক্ষার চেষ্টা করার সময় ‘সিআরপিএফ’-এর এক সহকারী কমান্ড্যান্টের হাতে গভীর ক্ষত হয় বলেও অভিযোগ। পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করা হয়, কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়। পাল্টা কৃষক সংগঠনটির অভিযোগ, নিরাপত্তাবাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। প্রশাসনের বক্তব্য, হিংসাত্মক বিক্ষোভের মোকাবিলা করতেই নিরাপত্তাকর্মীরা পদক্ষেপ করেছিলেন। এর মধ্যেই ১৪ অক্টোবর অরুণাচল প্রদেশের বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন, ২০১৪-এর অধীনে চার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। তাঁদের মুক্তির দাবিতে গেকুতে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। আটক চার জনের মুক্তির পাশাপাশি প্রকল্প নিয়ে সরকারি আলোচনা বয়কট করারও আহ্বান জানিয়েছে ‘এসআইএফএফ’-এর যুব শাখা। ১১ অক্টোবর সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী খান্ডু আটক করার সিদ্ধান্তের পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর বক্তব্য, হিংসা বরদাস্ত করা হবে না এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে গ্রামবাসীদের উদ্বেগ শোনার জন্য সরকার প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
সিয়াং প্রকল্প ঘিরে রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনও উল্লেখযোগ্য। এক সময় বড়ো বাঁধের বিরোধিতায় সরব ছিলেন ওজিং তাসিং। এখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী খান্ডুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও রাজ্যের গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েতিরাজ মন্ত্রী। বর্তমানে প্রকল্পের স্বপক্ষে তাঁর যুক্তি, ভারত যদি নিজেদের বাঁধ তৈরি না করে, তা হলে চিনের উজানের বাঁধ ভবিষ্যতে ভারতের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে।তাসিংয়ের এ অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তাঁর বক্তব্য, প্রকল্পটি ভারতের জলসম্পদ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেছেন তিনি। সিয়াং-এ বাঁধবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস অবশ্য আরও পুরনো। ২০১০ সালে তৎকালীন ‘সিয়াং পিপলস ফোরাম’-এর চেয়ারম্যান ওজিং তাসিং প্রকল্প বাতিলের দাবিতে তৎকালীন কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। সে সময় অরুণাচল প্রদেশে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে কেন্দ্রের ভিতরেও আলোচনা চলছিল।
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে নরেন্দ্র মোদিও পাসিঘাটে নির্বাচনী প্রচারে বড়ো বাঁধের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের আপত্তির কথা স্বীকার করেছিলেন। পরিবেশ রক্ষা করে ছোটো প্রকল্পের মাধ্যমে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন তিনি। বর্তমানে অরুণাচল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি প্রকল্পের বিরোধিতা করে বলছে, চিনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতার যুক্তি দেখিয়ে স্থানীয় জনজাতির সম্মতির অধিকার খর্ব করা যায় না। দলের রাজ্য সভাপতি বসিরাম সিরাম জুলাইয়ে জমা দেওয়া স্মারকলিপিতেও একই বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। ভারতীয় যুব কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক তারহ জনিও সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্য ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের মনোভাবকে ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ বলে সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে স্বচ্ছ ও অর্থবহ আলোচনা প্রয়োজন।
ফলে, সিয়াং প্রকল্প ঘিরে বিরোধের পরিধি এখন আর বাঁধ নির্মাণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় জনজাতির জন্য প্রস্তাবিত ৩৫০ কোটি টাকার বিশেষ উন্নয়ন ও জীবিকা প্যাকেজ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির দাবি, প্যাকেজটির উপর সম্পূর্ণ স্থগিতাদেশ জারি করে স্বাধীন নিরীক্ষা করা হোক। স্থানীয় গ্রামসভাগুলির মাধ্যমে নির্দেশিকা এবং উপভোক্তাদের তালিকা স্বচ্ছ ভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এই অর্থ বণ্টন করা উচিত নয় বলে মনে করছে দলটি। কংগ্রেসের অভিযোগ, জনকল্যাণমূলক তহবিল ব্যবহার করে জনজাতির মধ্যে বিভাজন তৈরি করা কিংবা দুর্বল পরিবারগুলিকে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে চাপ দেওয়া উচিত নয়। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার কিংবা ‘এনএইচপিসি’-র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সিয়াং প্রকল্প ঘিরে বিক্ষোভের আবহে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ৫ অক্টোবর অরুণাচল প্রেস ক্লাব এবং ‘অরুণাচল প্রদেশ ইউনিয়ন অব ওয়ার্কিং জার্নালিস্টস’ অভিযোগ করে, প্রকল্প সংক্রান্ত খবর ও ভিডিয়োর উপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের একাংশের অভিযোগ, তাঁদের প্রকল্প সংক্রান্ত ভিডিয়ো ও অন্যান্য বিষয়বস্তু ভারতে দেখা যাচ্ছে না। কারও কারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের উপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে দাবি। সংগঠন দুটির যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কিছু ব্যবহারকারী এমন বার্তা পেয়েছেন, যাতে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি বিধির অধীনে বিষয়বস্তু সীমাবদ্ধ করার কথা জানানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের সংগঠনগুলির বক্তব্য, বিক্ষোভ, পরিবেশগত উদ্বেগ, বাস্তুচ্যুতি ও সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে খবর প্রকাশ করা সাংবাদিকতার অপরিহার্য দায়িত্ব। বিষয়গুলি বিতর্কিত বলে সংবাদ পরিবেশনের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা যায় না।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন মঞ্চকে এই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের নির্দেশ রাজ্য সরকার দিয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে তাঁরা।
উল্লেখ্য, সিয়াং প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রথম সামনে এসেছিল কয়েক দশক আগে। ১৯৮২ সালে ব্রহ্মপুত্র বোর্ড সিয়াং নদীতে বাঁধের প্রস্তাব দিয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকে সিয়াং আপার, মিডল ও লোয়ার বাঁধের পরিকল্পনা সামনে আসে। ২০০৮ সালে ৯,৫০০ মেগাওয়াটের সিয়াং আপার প্রকল্পকে জাতীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৯ সালে জলমগ্ন হওয়ার এলাকা কমানোর লক্ষ্যে এনএইচপিসি প্রকল্পটিকে ৬,০০০ মেগাওয়াট ও ৩,৭৫০ মেগাওয়াটের দুটি পর্যায়ে ভাগ করে। ২০১৭ সালে নীতি আয়োগ দুই পর্যায়কে একত্র করে ১০,০০০ মেগাওয়াটের প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়। পরবর্তী সময়ে সে পরিকল্পনাই বর্তমান ১১,২০০ মেগাওয়াটের প্রকল্পের রূপ নেয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত পরিকল্পনার এই দীর্ঘ ইতিহাসের পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় মানুষের আপত্তি, পরিবেশগত উদ্বেগ আর প্রথাগত জীবনযাত্রা হারানোর ভয়।
সরকারের কাছে সিয়াং প্রকল্প জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, জল সঞ্চয়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও চিনের উজানের প্রকল্পের মোকাবিলায় কৌশলগত প্রস্তুতির সম্ভাব্য হাতিয়ার। অন্যদিকে, জনজাতি মানুষের কাছে এটি তাঁদের জমি, নদী, সংস্কৃতি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের প্রশ্ন। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত বিশাল এই প্রকল্প স্থানীয় মানুষের অধিকার ও সম্মতিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না। সিয়াং নদীকে ঘিরে বিরোধ তাই কেবল একটি বাঁধের প্রশ্ন নয়। এটি উন্নয়নের অর্থ কে নির্ধারণ করবে, জাতীয় স্বার্থের জন্য মূল্য চোকাবে কারা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি নদীর সঙ্গে যাঁদের জীবন জড়িয়ে রয়েছে, তাঁদের মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে — সেই বৃহত্তর বিতর্কেরও প্রতিফলন। আপাতত সিয়াং উপত্যকা দাঁড়িয়ে রয়েছে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। এক দিকে দেশের জল ও জ্বালানি নিরাপত্তার যুক্তি, অন্য দিকে নিজেদের ভিটেমাটি, জীবন-জীবিকা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানোর আশঙ্কা। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে না পারলে প্রকল্প ঘিরে সংঘাত আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
❤ Support Us







