Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • নভেম্বর ২৫, ২০২৫

শীতকালীন অধিবেশন নেলী গণহত্যা রিপোর্ট পেশ । জুবিন গর্গ মৃত্যু ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে পারে অসমের বিধানসভা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
শীতকালীন অধিবেশন নেলী গণহত্যা রিপোর্ট পেশ । জুবিন গর্গ মৃত্যু ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে পারে অসমের বিধানসভা

২৫ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে অসম বিধানসভায় শীতকালীন অধিবেশন। মাত্র পাঁচ দিনের এই ক্ষুদ্র অধিবেশনকে কেন্দ্র করে দিসপুরের রাজনৈতিক পরিসর উত্তপ্ত। বিধানসভার প্রধান সচিব দুলাল পেগু জানিয়েছেন, এবারের অধিবেশনে অন্তত ২৬টি বিল উত্থাপিত হতে পারে, যার মধ্যে পাঁচটি নতুন বিল এবং বাকিগুলি সংশোধনী। অর্থাৎ স্বল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্য সরকার অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে। তবে আলোচনার সবচেয়ে শীর্ষে রয়েছে নেলী গণহত্যা রিপোর্ট ও জুবিন গর্গের মৃত্যুরহস্য সম্পর্কিত আলোচনা। আজ প্রয়াত শিল্পী জুবিন গর্গের প্রতি শোক প্রস্তাবের মাধ্যমে বিধানসভার অধিবেশন শুরু হবে।

১৯৮৩ সালের ভয়াবহ নেলী হত্যাকাণ্ড অসমের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। যার দাগ আজও ব্রহ্মপুত্রের রাজ্যে বহমান। অসমের মাটি থেকে বাঙালিদের তাড়াতে ৮০-র দশকে ফুঁসে উঠেছিল অসমের বাসিন্দারা। বাঙালি অধ্যুষিত নেলি-সহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে অভিযান চালিয়ে একরাতে ২ হাজারের বেশি বাঙালিকে হত্যা করা হয়, যাঁদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। বেসরকারি মতে নিহতের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। বহু বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাধীন ভারতে এটিই ছিল জঘন্যতম নরসংহারের ঘটনা। ওই আন্দোলনের মুখ্য সংগঠন ছিল অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, যারা দাবি করছিল যে অসমের ভোটার তালিকা থেকে বাঙালিদের নাম বাদ দিতে হবে। এই দাবির প্রেক্ষাপটে তারা নির্বাচনে বয়কট ঘোষণা করেছিল। কিন্তু নওগাঁও জেলার নেলি ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামগুলি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে এগিয়ে এসেছিল। দীর্ঘ চার দশক অপেক্ষার পর অবশেষে তিওয়ারি কমিশনের রিপোর্ট এবার সদনে পেশ হতে পারে বলে সূত্রের খবর। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দাবি করছেন, রিপোর্ট প্রকাশের মাধ্যমে ইতিহাসের সত্য সামনে আসবে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ওই রিপোর্টটিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

অধিবেশন শুরুর আগে সংসদীয় পরিক্রমা দপ্তরের মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারির আহ্বানে সর্বদলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শাসক-বিরোধী পক্ষ দু-পক্ষই জানায়, এতগুলো বিল এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু পাঁচ দিনের মধ্যে আলোচনা করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই জল্পনা, অধিবেশনের সময়সীমা ১–২ দিন বাড়ানো হতে পারে। অসম বিধানসভায় সাম্ভাব্য আলোচিত বিলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত বিলটি হলো বহুবিবাহ সংক্রান্ত বিল। ‘অসম বহুবিবাহ প্রতিরোধ বিধেয়ক, ২০২৫’-এর মাধ্যমে রাজ্য সরকার সম্পূর্ণভাবে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করতে চায়। তবে তফসিলি উপজাতি এবং ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত এলাকার মানুষকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হবে।

বিজেপি বিধায়ক দুর্গাদাস বড়ুয়া বলেন, ‘প্রত্যেকটি বিলের বিস্তারিত আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি প্রয়াত শিল্পী জুবিন গার্গের মৃত্যু নিয়ে প্রতিটি সদস্য বক্তব্য রাখতে চাইছেন। জনগণ যাকে এত ভালোবাসতেন, সেই শিল্পীর মৃত্যু নিয়ে সদনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠবেই।’ সিপিআইএমের বিধায়ক মনোরঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘সরকার এখনো বিলের সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করেনি। তালিকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত আলোচনার গতি নির্ধারণ করা কঠিন। তবে জুবিন গার্গের মৃত্যু ইস্যু এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এটি অধিবেশনকে আরো উত্তপ্ত করবে।’ বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকীয়া আরও আক্রমণাত্মক সুরে বলেন, ‘আমরা ১০ দিনের অধিবেশন দাবি করেছিলাম। শিক্ষা সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধি, বিদেশি অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব যাচাই, দুর্নীতি— এ সমস্ত বিষয়েই দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু সরকার পাঁচ দিনের মধ্যে সব শেষ করতে চাইছে। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ক সীমিত করার কৌশল।’

অসমে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারের লাগামহীন অবস্থা সাধারণ মানুষের জীবনে তীব্র প্রভাব ফেলেছে। সবজির দাম, ডিম, খাদ্যসামগ্রীর ব্যয়— সব মিলিয়ে জনসাধারণের অসন্তোষ তীব্র। বিরোধীরা দাবি করছে, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি ও জনজীবনের চাপ এবারের অধিবেশনের বিতর্কের কেন্দ্রস্থল হতে পারে। এদিকে, স্বল্প সময়ের হলেও এবারের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে। দিসপুর বিধানসভা চত্বরে একাধিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ড্রোন ও অত্যাধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, রাজনৈতিক তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতিতে সামান্য অসাবধানতাও বড়ো ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, তাই কোনো ঝুঁকি নেওয়া হবে না। তবে, এই পাঁচ দিনের অধিবেশন যে অসমের রাজনৈতিকভাবে বছরের সবচেয়ে উত্তপ্ত অধ্যায় হয়ে উঠতে চলেছে, তা একপ্রকার নিশ্চিত। বিলের পাহাড়, নেলী গণহত্যার রিপোর্ট, বিদেশি সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধি, এবং প্রয়াত শিল্পী জুবিন গার্গের মৃত্যু, সব মিলিয়ে দিসপুর বিধানসভা চত্বরে অগ্নিগর্ভ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!