Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৫

জুবিনের মৃত্যুতে অসমে শোকতুফান, কালো তালিকাভুক্ত তাঁর অনুষ্ঠান আয়োজকরা। সিবিআই তদন্তের দাবি তুঙ্গে

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জুবিনের মৃত্যুতে অসমে শোকতুফান, কালো তালিকাভুক্ত তাঁর অনুষ্ঠান আয়োজকরা। সিবিআই তদন্তের দাবি তুঙ্গে

সিঙ্গাপুরের সমুদ্রতটে প্রাণ হারিয়েছেন অসমের গর্ব, সঙ্গীতশিল্পী জুবিন গর্গ। তিনি আর নেই—এই খবর মেনে নিতে পারেননি লক্ষ লক্ষ ভক্ত। শোকে মুহ্যমান গোটা দেশ। আর শিল্পীর মৃত্যুর পরেও থামেনি জলঘোলা। বরং তার আঁচে উত্তাল অসম। আঙুল উঠেছে অনুষ্ঠান আয়োজক শ্যামকানু মহন্ত ও শিল্পীর ম্যানেজার সিদ্ধার্থ শর্মার দিকে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—‘ক্ষমা নেই, কেউ রেহাই পাবে না।’ বুধবার রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে, শ্যামকানু মহন্তর সঙ্গে যুক্তকোনো সংগঠনকে অসমে অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হবে না। শুধু তাই নয়, তাঁদের কোনো প্রকল্প বা আয়োজনে সরকারি বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ বা আর্থিক অনুদানও বন্ধ করে দিচ্ছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর আরো সংযোজন, কেন্দ্র সরকারকেও অনুরোধ করা হবে, যেন তাঁরাও এ সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটান।

এই ঘোষণার নেপথ্যে রয়েছে একের পর এক অভিযোগ, যেগুলির ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন থানায় দায়ের হয়েছে ৫৫টিরও বেশি এফআইআর। সে সব অভিযোগে নাম রয়েছে মোট ৪ জনের—ফেস্টিভ্যাল আয়োজক শ্যামকানু মহন্ত, শিল্পীর ম্যানেজার সিদ্ধার্থ শর্মা, জুবিন গর্গের ব্যান্ডের ড্রামার শিখরজ্যোতি গোস্বামী এবং ব্যবসায়ী সঞ্জিভ নারায়ণ। এই ৪ জনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি হালকা নয়—অবহেলা, গাফিলতি, মানসিক চাপ সৃষ্টি, এমনকি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠার মতো ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। অসম পুলিশের ডিজিপিকে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, সব এফআইআর একত্রিত করে একটি সম্মিলিত মামলা হিসেবে সিআইডির হাতে তুলে দেওয়া হোক। নির্দেশ মতোই গঠন করা হয়েছে ৯ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি। তদন্তে গতি আনতেই এই বিশেষ দল মাঠে নামানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

জুবিনের প্রথম ময়নাতদন্ত সিঙ্গাপুরেই হয়। তাতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়, ‘জলে ডুবে মৃত্যু’। কিন্তু ভক্ত ও পরিবারের সদস্যদের অনুরোধে গুয়াহাটিতে ফের একবার ময়নাতদন্ত হয়, যার ভিত্তিতে সংগ্রহ করা ভিসেরা নমুনা পাঠানো হয়েছে দিল্লির কেন্দ্রীয় ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে। রিপোর্ট হাতে আসার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আরও স্পষ্ট হবে বলে ধারণা প্রশাসনের। অভিযোগের সূত্রপাত হয়েছিল সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা ‘নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া ফেস্টিভ্যাল’কে কেন্দ্র করে। বহু বছর ধরে এই উৎসবের আয়োজন করে আসছেন শ্যামকানু মহন্ত। সেই উৎসবেই আমন্ত্রিত ছিলেন জুবিন গার্গ। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা সেসময় আদৌ মঞ্চে পারফর্ম করার উপযুক্ত ছিল কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন। জানা যাচ্ছে, চিকিৎসকদের পরামর্শ ছিল, শিল্পী যেন জল বা আগুন থেকে দূরে থাকেন। অথচ তাঁকে দেখা যায় একটি ইয়ট পার্টিতে অংশ নিতে, যার কিছু ক্ষণের মধ্যেই জলে পড়ে মৃত্যু হয় তাঁর।

একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরো একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য, জানা গিয়েছে, জুবিনকে নাকি মানসিকভাবে ব্ল্যাকমেল করে ফেস্টিভ্যালে পারফর্ম করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ অভিযোগ তুলে ধরে প্রশ্ন তুলেছে ‘দ্য হিন্দু’ এবং আরও কিছু জাতীয় সংবাদমাধ্যম। যদিও শ্যামকানু মহন্ত একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দাবি করেন, জুবিন গর্গ কেবল উৎসবের জন্য সিঙ্গাপুরে যাননি। তিনি সিঙ্গাপুরের অসম অ্যাসোসিয়েশনের আমন্ত্রণে গিয়েছিলেন বিশ্রামের উদ্দেশ্যে। ওই পোস্টে মহন্ত আরো বলেন, আয়োজকদের কেউই জানতেন না জুবিন ইয়ট ট্রিপে যাচ্ছেন। এদিকে, শিল্পীর মৃত্যুর পর তাঁর ম্যানেজার সিদ্ধার্থ শর্মার বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের দাবি, জুবিন গার্গ মিউজিক এলএলপি নামের যে কোম্পানি তাঁর গানগুলির ডিজিটাল স্বত্ব নিয়ন্ত্রণ করে, তা এখন একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন সিদ্ধার্থ। ইউটিউব, স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিক, জিওসাভন, গানা—প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে কোটি টাকার বেশি রয়্যালটি আসছে, যার একক অধিকার এ মুহূর্তে সিদ্ধার্থ শর্মার হাতেই। এমন খবর সামনে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ভক্তরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ড করছে—‘#NotARupeeForHim’। বহু ভক্ত বলছেন, ‘জুবিনের কণ্ঠকে মুনাফার যন্ত্র বানানো চলবে না। এখনই থামাও এসব।’

বিতর্কের আঁচ রাজনীতিতেও ছড়িয়েছে। অসম প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ এবং রাইজর দলের নেতা অখিল গগৈ একসুরে জানিয়েছেন, রাজ্য সরকারের তদন্তে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে বিষয়টি সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়া হোক এবং হাইকোর্টের নজরদারিতে তদন্ত চলুক। এ দাবির সঙ্গে সহমত জানিয়ে, গৌহাটি হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেছেন আইনজীবী সন্দীপ চামারিয়া। মামলার শুনানি হবে আগামী ১০ নভেম্বর। শিল্পীর স্ত্রী গরিমা সাইকিয়া গার্গ জানিয়েছেন, জুবিনের অসমিয়া সংগীতচিত্র ‘রৈ রৈ বিনলে’ মুক্তি পাবে ঠিক ৩১ অক্টোবর। কিন্তু এখনো তাঁর নিজের ডাবিং অসম্পূর্ণ। গলা ধরে আসে গরিমার—‘হয়তো ওর গলাটা সিনেমায় আর শোনা যাবে না। তবু এই ছবিটা আমরা শেষ করব। ওর জন্য, ওর ভক্তদের জন্য।’

জুবিনের অকাল মৃত্যুর পর তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গোটা অসম নেমে আসে রাস্তায়। গায়কের মরদেহ সিঙ্গাপুর থেকে নিয়ে আসা হয় গুয়াহাটি। রাখা হয় সরুসজাই স্টেডিয়ামে, টানা ৪৮ ঘণ্টা। গানের গলা চিরতরে থেমে গেলেও, মানুষের ভালোবাসার আওয়াজে মুখর হয়ে উঠেছিল গোটা স্টেডিয়াম। দাহকার্য সম্পন্ন হয় সোনাপুরে, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। রাষ্ট্র এক শিল্পীকে বিদায় জানাল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেল—কেন এমন হলো?


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!