Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জানুয়ারি ১৬, ২০২৬

পরিচয় ঘিরে দেশে বাড়ছে হেনস্থা । উত্তরাখন্ডের পর এবার উত্তরপ্রদেশে আক্রান্ত উত্তর-পূর্ব ভারতের পড়ুয়া

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পরিচয় ঘিরে দেশে বাড়ছে হেনস্থা । উত্তরাখন্ডের পর এবার উত্তরপ্রদেশে আক্রান্ত উত্তর-পূর্ব ভারতের পড়ুয়া

ফের এক বার প্রশ্নের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা। উত্তর-পূর্ব ভারতীয় পরিচয়ের জেরে মধ্যপ্রদেশের এক কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে নির্মম হামলার শিকার হলেন অসমের এক ছাত্র। গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। ঘটনাকে ঘিরে উত্তাল ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ট্রাইবাল ইউনিভার্সিটি (আইজিএনটিইউ) চত্বর। বিক্ষোভের মুখে পড়ে পাঁচ জন ছাত্রকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। মামলা রুজু করেছে পুলিশ। পড়ুয়াদের অভিযোগ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ভূখণ্ডগত, অস্তিত্বগত, জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে দীর্ঘ  অস্বস্তিকর আক্রমণের ধারাবাহিকতারই অংশযার ভয়াবহ পরিণতি আমরা সদ্য দেখেছি অ্যাঞ্জেল চাকমার মৃত্যুর ঘটনায়।

ঘটনার বিবরণ যতটুকু সামনে এসেছেতা উদ্বেগজনক। নামরাজ্যপরিচয়— এই টি প্রশ্নের পরেই চলেছে হেনস্তা, মারধর। অভিযোগনেশাগ্রস্ত অবস্থায় কয়েক জন ছাত্র এক অসমিয়া পড়ুয়াকে আক্রমণ করেছেতাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দিয়েছে। এটি নিছক ছাত্রদের মধ্যে বিবাদ নয়। যদি অভিযোগ সত্যি হয়তবে এটি স্পষ্টতই পরিচয়-ভিত্তিক হেনস্থার ঘটনা। একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে এমন ঘটনা ঘটার অর্থসমস্যা কেবল কয়েক জন উচ্ছৃঙ্খল পড়ুয়ার আচরণে সীমাবদ্ধ নয়বরং তার শিকড় প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও সামাজিক অসহিষ্ণুতার গভীরে।

জানা যাচ্ছে, আক্রান্ত ছাত্রের নাম হিরো জ্যোতি দাস। বয়স ২২। তিনি আইজিএনটিইউ-র অর্থনীতি বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্র। অভিযোগ১৩ জানুয়ারি ভোররাতেপ্রায় ৪টে নাগাদ গুরু গোবিন্দ বয়েজ হোস্টেলে শৌচাগার থেকে নিজের ঘরে ফেরার সময় তাঁকে আটকায় ৬৭ জন ছাত্র। তারা সকলেই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিল বলে অভিযোগ। প্রথমে তাঁর নাম ও বাড়ির রাজ্য জানতে চাওয়া হয়। আক্রান্ত পড়ুয়া জানান যে, তিনি অসমের বাসিন্দা। তার পরেই শুরু হয় মারধর। অভিযোগহামলাকারীরা শুধু মারধরই করেনিতাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দেয়। এক পর্যায়ে তাঁর হাত বেঁধে মুখনাকচোখ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে লাথি ও ঘুষি মারা হয়। এক জনের হাতে থাকা ধাতব ব্রেসলেট দিয়েও আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ। ঘটনায় তাঁর নাকের হাড় ভেঙে যায়। চোখে জমে রক্ত। মুখমণ্ডলে ও শরীরে একাধিক গুরুতর চোট লাগে। আক্রান্ত ছাত্রের দাবিতিনি গত  বছর ধরেই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। তবু তাঁকে বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করে হেনস্থা করা হয়।

প্রথমে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসপেনসারিতে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হলেও অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে ছত্তিশগড়ের গৌরেলা-পেন্দ্রা-মারওয়াহি জেলা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। চিকিৎসকেরা জানানতাঁর আঘাত গুরুতর। ঘটনার খবর ছড়াতেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ক্ষোভ উগরে দেন পড়ুয়ারা। ১৪ জানুয়ারি ছাত্রছাত্রী ও এনসিসি ক্যাডেটেরা প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখান। দীর্ঘ সময় ধরে স্লোগান চলে। মৌখিক আশ্বাসে সন্তুষ্ট না হয়ে পড়ুয়ারা রেজিস্ট্রারের দফতরেও তালা ঝোলানোর চেষ্টা করেন। বিক্ষোভকারী ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগহোস্টেলে নিরাপত্তার চূড়ান্ত অভাব রয়েছে। ঘটনার সময় কোনো নিরাপত্তারক্ষী উপস্থিত ছিলেন না। এক পড়ুয়া জানানআক্রান্ত ছাত্রকে নাকি বলা হয়েছিল, ‘এই ঘর আগে ওদের ছিল।’ যা থেকে হোস্টেলে দখলদারি ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। পড়ুয়াদের প্রশ্ন, ‘কেউ যদি কাউকে তার রাজ্য জিজ্ঞেস করে মারধর করেতা হলে আমরা কী ধরনের সমাজে বাস করছিঅসম তো ভারতেরই অংশ।’ আরো অভিযোগ, একাধিক ঘটনায়, কমিটি গঠন হচ্ছেকিন্তু বাস্তবে কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। পড়ুয়ারা কর্তৃপক্ষের উপর আস্থা হারাচ্ছে।

ন্যাক্কারজনক ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পাঁচ জন ছাত্রঅনুরাগ পাণ্ডে, যতিন সিংরঞ্জিত ত্রিপাঠীবিশাল যাদব ও উৎকর্ষ সিংকে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার করে। পরে পুরো রিপোর্ট পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অমরকন্টক থানায় আক্রান্ত ছাত্রের অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছেভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১১৫(২) (স্বেচ্ছায় আঘাত)২৯৬ (অশালীন আচরণ)৩৫১(৩) (অপরাধমূলক ভয় দেখানো) ও ৩(৫) (সাধারণ অভিপ্রায়) ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। যদিও এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তবে বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্য করা হয়েছিল কি নাসে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে নারাজ পুলিশ। অনুপপুরের এসডিপিও নবীন তিওয়ারি জানিয়েছেন, ‘বিষয়টি তদন্তাধীন। অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ না করা পর্যন্ত ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্ট হবে না।’

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র। শাসক ও বিরোধীদুপক্ষই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে ব্যস্ত। এ ঘটনার জন্য শাসক দল বিজেপিকে সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছে মধ্যপ্রদেশ কংগ্রেস। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা উমং সিংহার অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়টি কার্যত বিজেপি ও আরএসএসের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। তাঁর দাবি, ‘অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে নামমাত্র পদক্ষেপ করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে অসামাজিক কার্যকলাপ বেড়েছেমাদক সেবন হচ্ছে প্রকাশ্যেঅথচ কর্তৃপক্ষ নীরব দর্শক। অভিযুক্তেরা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত এবং মত্ত অবস্থাতেই হামলা চালানো হয়েছে।’ তিনি এ ঘটনাকে স্পষ্ট বর্ণবিদ্বেষের উদাহরণ বলেও দাবি করেছেন। শাহডোলের বিজেপি সাংসদ হিমাদ্রি সিং একে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতেরকম ঘটনা শুধু ছাত্রদের নিরাপত্তা নয়বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও মর্যাদাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সাইলানা বিধায়ক কমলেশ্বর দোডিয়ার ও মানাওয়ারের বিধায়ক হিরালাল আলাও একই সুরে প্রশাসনের গাফিলতির কথা বলেন। তরজা যাই হোক, প্রশ্ন হলো, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কি মূলধারার রাজনৈতিক দখলের ক্ষেত্রবিশ্ববিদ্যালয় যদি নিরাপদমুক্ত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিসর না হয়তা হলে সমাজের ভবিষ্যৎ তৈরি হবে কোথায়উত্তর-পূর্ব ভারতের পড়ুয়াদের কি এখনো দেশের অন্য’ অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছেনা?

অ্যাঞ্জেল চাকমার মৃত্যু এখনো আমাদের সম্মিলিত বিবেককে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। গত ডিসেম্বর মাসে উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ পড়তে গিয়ে অ্যাঞ্জেল ও তাঁর ভাই মাইকেল চাকমার উপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ৯ ডিসেম্বর স্থানীয় কয়েক জন যুবক তাঁদের উপর চড়াও হয় বলে অভিযোগ। জাত তুলে গালিগালাজ করা থেকেই সে ঘটনার সূত্রপাত। অভিযোগঅ্যাঞ্জেল ও মাইকেলকে চাইনিজ মোমো’ বলে কটাক্ষ করা হয়। তার প্রতিবাদ করায় ছুরি দিয়ে অ্যাঞ্জেলের ঘাড় ও পেটে আঘাত করা হয়। গুরুতর জখম অবস্থায় ১৭ দিন লড়াই করার পর ২৬ ডিসেম্বর মৃত্যু হয় অ্যাঞ্জেলের। ত্রিপুরা থেকে পড়তে গিয়ে দেরাদুনে প্রাণ হারানো সে ছাত্রের ক্ষেত্রেও প্রথমে বলা হয়েছিলএটি কোনো জাতিগত আক্রমণ নয়। আজমধ্যপ্রদেশের ঘটনায় একই প্রশ্ন উঠছে। প্রতিবারই যদি প্রশাসন জাতিগত বা পরিচয়-ভিত্তিক বিদ্বেষের দিকটি এড়িয়ে যেতে চায়তবে সমস্যার মূল কোথায় ধরা পড়বে?

ভারত বহুভাষিকবহুসাংস্কৃতিক দেশ। সে বৈচিত্র্য যদি শিক্ষার অমৃতভূমেই নিরাপদ না থাকেতা হলে তা কেবল শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়রাষ্ট্রের ব্যর্থতাও বটে। শুধু বহিষ্কার বা তদন্ত কমিটি গঠন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্পষ্ট বার্তাপরিচয়ের ভিত্তিতে হেনস্থা বরদাস্ত করা হবে নাএবং তা হলে কঠোরতম শাস্তি অনিবার্য। নামচেহারাউচ্চারণ— এসব যেন আর কাউকে বিপন্ন না করে। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই ভবিষ্যৎ গড়ার জায়গাভয় পাওয়ার নয়। এই সত্যটি রাষ্ট্রপ্রশাসন ও সমাজতিন পক্ষকেই নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে। ভাষাভিন্ন চেহারা বা ভিন্ন রাজ্য কি আজও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছেউত্তর-পূর্ব ভারতের পড়ুয়ারা কি সত্যিই দেশের মূল স্রোতে নিরাপদপ্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে, অবহেলা করলে এরকম ন্যাক্কারজনক ঘটনা আগামীতেও ঘটে চলবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!