- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জানুয়ারি ৬, ২০২৬
ইরানি বিক্ষোভে নিহত ৩৫, আটক হাজারো প্রতিবাদি। দেশ ছেড়ে ‘পালানোর ছক’ কষছেন খামেনেই?
ইরানের রাস্তায় ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে অশান্তির মেঘ। লাগাতার অর্থনৈতিক বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলি। গ্রেফতার করা হয়েছে ১,২০০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই বিক্ষোভ থামার কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই দেশ ছাড়ার বিকল্প পরিকল্পনাও নাকি তৈরি করে রেখেছেন— এমনই দাবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একাংশের।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ২৯ জন বিক্ষোভকারী, ৪ জন শিশু এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ২ সদস্য। সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৭টিতে, মোট ২৫০টিরও বেশি জায়গা আন্দোলনের তাপে পুড়ছে। তেহরানের পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণের একাধিক এলাকায় রাস্তায় নেমেছেন মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে প্রায় ২৫০ জন পুলিশকর্মী এবং বাসিজ বাহিনীর ৪৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। দেশের এমন অচলাবস্থার মধ্যেই সামনে এসেছে খামেনেইকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য টাইমস’-এর একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে খামেনেই ‘প্ল্যান বি’ হিসেবে রাশিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছেন।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, যদি তিনি বুঝতে পারেন যে সেনা বা নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমনে ব্যর্থ হচ্ছে কিংবা আদেশ মানতে অস্বীকার করছে, ৮৬ বছর বয়সি খামেনেই প্রায় ২০ জন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পরিবারের সদস্যকে নিয়ে তেহরান ছাড়তে পারেন। সেই ঘনিষ্ঠ বৃত্তে রয়েছেন তাঁর পুত্র ও সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী মুজতবা খামেনেইও। যদিও, প্রকাশ্যে নিজের শক্ত অবস্থানই দেখাচ্ছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। শনিবার, তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ‘দাঙ্গাবাজদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে কথা বলা যায়, কর্মকর্তাদের কথা বলা উচিত। কিন্তু দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ নেই।’
এই রক্তক্ষয়ের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষ করে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘তেহরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সহিংস ভাবে হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে’। যদিও আমেরিকা কী ভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ট্রাম্পের মন্তব্যের পরেই ইরানের শাসকগোষ্ঠীর তরফে পাল্টা হুমকি শোনা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের নিশানা করার কথাও বলেছেন তেহরানের কর্মকর্তারা। এ প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে আর একটি ঘটনা। শনিবার, মার্কিন সেনা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে বলে খবর। মাদুরো দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ফলে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও এই সামরিক পদক্ষেপকে মিলিয়ে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
প্রশ্ন উঠছে, কেন আবার জ্বলে উঠল ইরান? মূলত অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকেই নাগরিক বিক্ষোভের সূত্রপাত। গত ২৮ ডিসেম্বর প্রথমে দোকানদারদের ধর্মঘট থেকেই আন্দোলনের শুরু। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অর্থনৈতিক দাবির সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে রাজনৈতিক স্লোগানও। তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং রিয়ালের বিপর্যয়ই ক্ষোভের মূল কারণ। গত এক বছরে ডলারের তুলনায় ইরানি রিয়ালের মূল্য প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৪২ শতাংশ, খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে তা ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। কোনো কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে ১১০ শতাংশেরও বেশি। পাশাপাশি, ইজরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং তার পর মার্কিন হামলায় ইরানের একাধিক কলকারখানা, তেল সংশোধনাগার, পরমাণু স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর অর্থনীতি কার্যত দিশাহারা। নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার আশায় তেহরান সম্প্রতি দাবি করেছে, তারা আর কোনো জায়গায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করছে না। কিন্তু সে নিয়ে আলোচনার পথ এখনো খোলেনি। ট্রাম্প ও ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দুজনেই তেহরানকে পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় শুরু না করার কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
অস্থির এই পরিস্থিতিতে ইরানের সাধারণ মানুষের রুজি-রুটির বিক্ষোভের প্রকৃত চেহারা ধরা পড়ছে না সহজে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কার্যত নীরব। সমাজমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওতে কখনো জনতার স্লোগান, কখনো গুলির শব্দ, ধরপাকড়; এ পর্যন্তই। বিদেশি সাংবাদিকদের কাজেও কড়া বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে তথ্যের বড়ো অংশই আসছে মানবাধিকার সংগঠন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে। বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরান যে ভয়াবহ আন্দোলনের সাক্ষী ছিল, তার পর এটিই সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন। যদিও তখনকার মতো বর্তমানের আন্দোলন এখনো অতটা ব্যাপক বা তীব্র হয়ে ওঠেনি। তবু দীর্ঘস্থায়িত্ব ও ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতির কারণে পরিস্থিতি যে বিপজ্জনক দিকে এগোচ্ছে, তা মানছেন ইরান প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। প্রশ্ন উঠছে, অগ্নিগর্ভ ইরান কি আরো বিধ্বংসী ঝড়ের কবলে পড়তে চলেছে?
❤ Support Us






