- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ৩, ২০২৫
কলকাতায় প্রথম নাস্তিক সম্মেলন: কুসংস্কারমুক্ত ভারত গঠনের অঙ্গীকার
ঈশ্বর আছেন না কি নেই ! এ প্রশ্ন, এ ভাবনার বহুমাত্রিক আলোচনা আর সমালোচনা, সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শতাব্দীর পড় শতাব্দী ধরে চলে আসছে। আর এতে অমোঘভাবে জুড়ে আছে ধর্ম আর বিজ্ঞান, দর্শন। জুড়ে আছে যুক্তি, তর্ক আর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথন। ‘অবিশ্বাসের ভাইরাস’ বইয়ে যুক্তিবাদী অভিজিৎ রায় লিখেছিলেন, আসলে নাস্তিকতা এবং অবিশ্বাস ক্ষেত্রেও ভীষণ সচেতন থাকতে হয় মুক্তমনাদের। কারণ, যে কোনো মুহূর্তে অবিশ্বাসই ‘বিশ্বাস’ হয়ে হয়ে উঠছে পারে, প্রচলিত ধ্যাণ-ধারণার বাইরে গড়ে উঠতে পারে আরো সংকীর্ণ এক দর্শন। এক্ষেত্রে একমাত্র পথ যুক্তি, তর্ক, বিজ্ঞান আর সমালোচনা। ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় ভাব আর বিশ্বাসের নগর বিস্তৃত, মর্মে মর্মে। নানাবিধ বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মিলনক্ষেত্র এই মহাভূম।
নাস্তিকতা, আস্তিকতা কিংবা অজ্ঞেয়বাদের চর্চা, আজ এই একুশ শতকেও গণের আলোচনা থেকে বহু দূরে। বরং ইদানীং-এর পাতালগামী সময়ে সমাজে জাঁকিয়ে বসেছে ধর্মীয় মৌলবাদ, ভিন্ বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসীদের উপর আক্রমণের বহর। আলোচনা-সমালোচনা তো দূরস্থ। নিঃসন্দেহে এ ঘটেছে রাজনৈতিক কারণে। কবীর-মীরা-লালন-চৈতন্যের দেশে এই মুহূর্তে ধর্মীয় উদগ্রতা আর হিংসা নখ-দাঁত বেড় করে আক্রমণ শানাচ্ছে। সমাজ ফিরে যাচ্ছে অন্ধকারের সরু গলিতে। এমন সময়ে, শহরের উত্তরাঞ্চলের রামমোহন লাইব্রেরী হলে আগামী ৫ নভেম্বর, বুধবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কলকাতার প্রথম জেলা নাস্তিক সম্মেলন। এটি কেবল একটি সামাজিক বা সাংগঠনিক আয়োজন নয়; এটি একটি দার্শনিক যাত্রা, যেখানে যুক্তি, প্রশ্ন এবং বিশ্বাসের পরিসরকে একত্রে পরীক্ষা করা হবে। নাস্তিক মঞ্চ, যারা এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে, তাদের বক্তব্য স্পষ্ট, চলমান ধর্মীয় আগ্রাসন রুখে কুসংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী সমাজ গঠন করতে হবে।
নাস্তিকতা, মূলত একটি বস্তুবাদী দার্শনিক ধারার অংশ, যার মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বর, আল্লাহ বা গডের অস্তিত্বের দাবিকে পরীক্ষা করে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে এ ধরনের দাবিকে অস্বীকার করে। প্রকৃতপক্ষে, নাস্তিকতার কেন্দ্রীয় চিন্তাভাবনা কখনোই ‘ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা’—এমন চরম এক বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে নয়। বরং এটি জীবনের বাস্তব দিক, পারিবারিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, সমাজ এবং আমাদের প্রিয় প্রকৃতির ওপর জোর দেয়। এ দর্শন বলে, মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, এ জাগতিক বস্তুই আমাদের বেঁচে থাকার রসদ। সেই সঙ্গে প্রশ্ন তোলে, আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করব যে আমাদের এই সমস্তকে সৃষ্টি করেছেন কোনো অতিপ্রাকৃতিক স্রষ্টা? যুক্তি ও প্রমাণের আলোয় এই বিশ্বাসকে দাঁড় করানো হয় কাঠগড়ায়।
পশ্চিমবঙ্গে নাস্তিকতার সাংগঠনিক চর্চার শুরু হয়েছিল নবদ্বীপে একটি কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মাধ্যমে। সেইদিন একটি বিশাল মিছিল নবদ্বীপ শহর পরিক্রমা করে এবং বহু মানুষ নাস্তিক সম্মেলনে যোগদান করেন। সংবাদপত্র, অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। পরবর্তী সময়ে নদীয়ার কৃষ্ণনগর ও উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে এ ধরনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই ধারাবাহিকতাকে ধরে এবার কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরীতে প্রথম জেলা সম্মেলন বসছে। সকাল ১০টা থেকে শুরু হবে মূল কর্মসূচি, তবে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম সকাল ৯টা থেকে। এই সম্মেলনে নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদীদের পাশাপাশি ধর্মবিশ্বাসী কিন্তু সংশয়বাদী মানুষরাও অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
কলকাতা শহরে এই ধরনের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আচার-অনুষ্ঠান প্রায় সবসময় শহরকে আচ্ছন্ন করে রাখে। রাজনীতির মোড়কে ধর্মের ব্যবহার বা ধর্মীয় আবরণে রাজনৈতিক প্রভাব দেখানো হয়ে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে নাস্তিক মঞ্চের এই সম্মেলন উল্টোমেরুর চিন্তাভাবনা হিসেবে সমাজে যুক্তি ও বিবেকের মঞ্চ গড়ে তুলতে চাচ্ছে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী এবং বক্তাদের মধ্যে একজন হতে পারেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝিলের জলে ডুবে মৃত ছাত্রীর মা মীনাক্ষী মণ্ডল, তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে জানিয়েছেন, ‘ঈশ্বর যদি থাকতেন, তাহলে আজ আমার এই পরিণতি হত না। আমার এখন মনে হয়, ঈশ্বর নেই। আমরা আমাদের মতো করে তাঁকে সৃষ্টি করেছি।’ এমন দৃষ্টান্ত এই মঞ্চকে শুধু তাত্ত্বিক আঙ্গিকেই সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং মানবিক বাস্তবতা এবং ব্যক্তিগত সংশয়কে প্রকাশ করার সুযোগ দেয় বলে মনে করছেন আয়োজকরা।
শিক্ষক এবং সমাজকর্মী কনিষ্ক চৌধুরীর বক্তব্যে উঠে আসে একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন, ভারতের ইতিহাস কি সত্যিই ধর্মভিত্তিকভাবে অগ্রসর হয়েছে, নাকি অনেক ক্ষেত্রে এটি ছিল যুক্তি এবং বস্তুবাদী চিন্তাধারারই ফল? বর্তমান সময়ে দেশে ধর্মীয় উন্মাদনা, ঘৃণার বাতাবরণ এবং বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে, সে প্রেক্ষাপটে নাস্তিক মঞ্চের উদ্যোগ এক অর্থে সমাজে যুক্তি, বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধ সচেতন করার প্রচেষ্টা। সম্মেলনের সূচনায় বক্তৃতা দেবেন কনিষ্ক চৌধুরি। নিজের বক্তব্যে সরকারের ধর্মনিরপেক্ষতার ভূমিকা নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন রাখবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। নাস্তিক মঞ্চের নেতারা দাবি করছেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে শুধুমাত্র সব ধর্মকে সমানভাবে দেখা নয়; সরকারের কার্যকলাপও ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে, কোনো ধর্মকে প্রাধান্য বা অবহেলা করা যাবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ন্যায্য সমতা নেই বলেই এই সম্মেলনের আয়োজন জরুরি হয়ে উঠেছে। কলকাতার নাস্তিক সম্মেলন কেবল একটি সামাজিক ঘটনা নয়; এটি একটি দার্শনিক, মানবিক এবং রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। এটি প্রশ্ন, সংশয় এবং যুক্তি-চিন্তার জয়। বিশ্বাসকে পরীক্ষা করার সাহস, প্রমাণের আলোয় নিজের অবস্থান নির্ধারণ করার স্বাধীনতা এবং কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্য, এই তিনটি উপাদানই সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য।
❤ Support Us






