- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- ডিসেম্বর ১৯, ২০২৫
অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ, ‘চিকেনস নেক’ ঘিরে কড়া নজরদারি ভারতের। সীমান্তে তৎপর বিএসএফ–সেনা
বাংলাদেশে ফের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু ঘিরে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে হিংসাত্মক বিক্ষোভ। ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, সাংবাদিক হত্যা, লুটপাট, ধানমন্ডি ৩২-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর চলেছে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলতেই বারবার জাতির উদ্দেশ্যে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। টহল দিচ্ছে নিরপত্তা বাহিনী। তবু পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ঢাকা সহ দেশের একাধিক শহরে সহিংসতার খবর আসছে। সীমান্ত এলাকাগুলোতে অশান্তির আশঙ্কায় তৎপর হয়েছে ভারত। অশান্তির আঁচ যাতে কোনও ভাবেই ভারতের ভূখণ্ডে না লাগে, সে জন্য ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করল দিল্লি।
বৃহস্পতিবার রাত থেকেই সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে কড়া নজরদারি শুরু করেছে বিএসএফ। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তায়। থার্মাল ক্যামেরা, নাইট ভিশন ডিভাইস, সিসিটিভি এবং ড্রোনের মাধ্যমে দিন-রাত নজরদারি চলছে। সীমান্ত সংলগ্ন জনপদগুলিকে কার্যত নিরাপত্তার বলয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ— এই ৬ জেলা মিলিয়ে প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯৫ কিলোমিটার এলাকায় নদী ও জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখনও কাঁটাতারের বেড়া বসানো যায়নি। কোথাও নদীর ধারে বেড়া থাকলেও তা যে পুরোপুরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, তা মেনেই টহল বাড়ানো হয়েছে ওই সব এলাকায়।
সীমান্তের দৈর্ঘ্যের নিরিখে সবচেয়ে এগিয়ে কোচবিহার—প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার। দক্ষিণ দিনাজপুরে রয়েছে ২৫০ কিলোমিটার এবং উত্তর দিনাজপুরে ২২৭ কিলোমিটার সীমান্ত। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়েই অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে বলে বিএসএফ সূত্রের দাবি। ২২ কিলোমিটার চওড়া শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা আরো মজবুত করতে বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা অসমের ধুবড়ি সংলগ্ন বামুনি, বিহারের কিশনগঞ্জ এবং উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া এলাকায় থাকা ৩টি সামরিক ঘাঁটিকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। ভৌগোলিক ভাবে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও চিনের মাঝে অবস্থিত হওয়ায় এই করিডোর দীর্ঘ দিন ধরেই কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে চিহ্নিত।
বিএসএফ-এর পাশাপাশি, ওই অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ভারতীয় সেনার ত্রিশক্তি কর্পসের তৎপরতাও বৃহস্পতিবার রাত থেকেই চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। হাসিমারা বায়ুসেনা ঘাঁটিতে আগে থেকেই মোতায়েন রয়েছে রাফাল যুদ্ধবিমান, বিভিন্ন মিগ ভ্যারিয়েন্ট এবং ব্রাহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র। সীমান্তের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ত্রিপুরার দক্ষিণ জেলার বেলোনিয়া সীমান্ত ফাঁড়ি পরিদর্শন করেছেন ভারতীয় সেনার ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি-ইন-চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর সি তিওয়ারি। সেনা সূত্রের বক্তব্য, এ সফর নিছক রুটিন নয়, বরং যেকোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে বাহিনীর ‘অপারেশনাল রেডিনেস’ যাচাই করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। পরিদর্শনের সময় সীমান্তে নজরদারি ব্যবস্থা, টহলদারি, গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়সীমা খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি সীমান্তে মোতায়েন জওয়ানদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মনোবল, কাজের চাপ এবং লজিস্টিক সহায়তার বিষয়েও খোঁজ নেন সেনা কমান্ডার।
অন্য দিকে, বাংলাদেশের অশান্তির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্রগুলিতেও। শুক্রবার বেনাপোল বন্দরে বিক্ষোভের খবর মিলেছে। অভিযোগ, ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামে একদল বিক্ষোভকারী। এর জেরে পেট্রাপোল বন্দরে বিএসএফের তৎপরতা বেড়েছে। বন্দরের গেটে অতিরিক্ত জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে। দু-দেশের বাণিজ্য এখনো স্বাভাবিক রয়েছে, তবু নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে আগের তুলনায় অনেক বেশি কড়া, তা স্বীকার করছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত বাণিজ্য আরো বড়ো ধাক্কা খেতে পারে।
❤ Support Us





