- দে । শ ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- নভেম্বর ২৮, ২০২৩
ইংরেজি নববর্ষের শুরুতেই হলদিয়ায় সাংস্কৃতিক দিকচিহ্নের উদ্ভাস। ৫ থেকে ৭ জানুয়ারি জড়ো হবেন অন্তত ৪০০ লেখক, কবি আর বহুমাত্রিকতার স্থপতি ও কর্মীরা। নান্দনিক এ সমাবেশের নেপথ্যে গৌতম গবেষক লক্ষণ শেঠ
নতুন বছরের শুরুতেই হলদিয়ায়, আলাপে, গানে, কবিতায়, গদ্যপাঠে, আলোচনায় বর্ণ ছড়াবে বিশ্ব বাংলার শিল্পিত সুন্দর । সংক্ষেপে বলতে হলে বলা উচিত, বঙ্গের সবচেয়ে বড়ো, লিটারারি ফেস্ট এর আয়োজন করবে সাপ্তাহিক আপনজন পত্রিকা । সমস্ত আয়োজনের নেপথ্যে আইকেয়ার এর চেয়ারম্যান লক্ষণ শেঠ রাজনীতি আর সমাজনীতির প্রশ্নহীন পৃষ্ঠপোষক। লক্ষণ বাবু সর্বক্ষণের রাজনৈতিক সংগঠক। ঘোষিতভাবেই নিরীশ্বরবাদী মহাপুরুষ বুদ্ধ-এর অনুগামী।
নন্দীগ্রামের শিল্প আন্দোলন, আন্দোলনের প্রতি তাঁর একাগ্র আস্থা এবং দলীয় বিভ্রান্তি তৈরির একক দায় চাপিয়ে তাঁকে বহিষ্কার করেছিল সিপিএম। দলের সঙ্ঘবদ্ধ আর আরোপিত ভাবনাচিন্তার বাইরে ব্যক্তিস্বাধীনতায় প্রবল আস্থা, তথাকথিত, ছক বাঁধা শ্রেণী সংগ্রাম এর নির্দেশিত নিয়মকে তর্কাতীত নয় ভাবতেন বলে তাঁকে সিপিএমএর শীর্ষস্তরের নিন্দার সম্মুখীন হতে হয় বারবার। তবু পা টলেনি। ঘোষিত কর্মসূচি থেকে সরে দাড়াননি । দল থেকে তার বহিষ্কারের পর প্রাক্তন সিপিএম নেতার সঙ্কল্প আরো সুলক্ষণীয় হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত ভাবাবেগ, সামাজিক অভিপ্রায় আর গঠনমূলক বহুমুখী শিক্ষার ক্যাম্পাস গড়তে সাজিয়ে তোলেন তাঁর তেজ, তাঁর তৈজষপত্র। এইভাবে, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আইকেয়ারের ছত্রতলে গড়ে ওঠে বহুমুখী বিদ্যার পঠন পাঠনের কুড়িটি প্রতিষ্ঠান । শুরু হয়েছিল সংক্ষিপ্ত আয়তনে, এখন তার মানচিত্র ১২৩ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত, শিক্ষার্থী ১২ হাজার, বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত ভারতের অন্যতম সেরা শিক্ষা নিকেতন । লক্ষণবাবু বলেননি । বলেছেন তাঁর সামাজিকতার সহজসঙ্গীরা— আমাদের টিম সুগঠিত। আমাদের পারস্পরিক প্রেমের প্রেরণার উৎস অবশ্যই লক্ষণ দা । আমাদের দশ হাত জড়ো হয়েছে সামাজিক প্রয়োজনে। ব্যক্তিতন্ত্র নয়, গান্ধীতন্ত্র, বুদ্ধতন্ত্রকে বিশেষ আমল দিই । তাঁদের দৃষ্টি, তাঁদের মূল্যবোধ প্রাণিত হয়ে গড়ে উঠেছে সবার শিক্ষা আর সংস্কৃতির কর্মসূচি । শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতি ও শিল্পায়নের নিবিড় বন্ধন তৈরি করেছিলেন লক্ষণশেঠ । হলদিয়া উৎসবের সূচনা করে । সর্বভারতীয় আর আন্তর্জাতিক খ্যাতির কলাকুশলী, উদ্যোগপতি, কবি, গণগানের কন্ঠ জড়ো হত উৎসবের মাঠে, তাঁর আমন্ত্রণে । লক্ষণ শেঠের আহবাণে ডান বাম চিহ্ন প্রশ্রয় পায়নি। কখনো। জনতা উপচে পড়ত প্রতিদিনের সান্ধ্য অনুষ্ঠানে। লক্ষণের চিন্তার স্বাধীনতা, তাঁর কর্মপ্রীতি, দলীয় নির্দেশভেদী তাঁর উত্তরণে পরশ্রীকাতরের ছোবল ফণা তুলেও তাঁকে রুখতে পারেনি । কংগ্রেসি ভাবাদর্শ এখন তাঁর সহযোগী । এখানেও তিনি প্রশ্নহীন শিল্পশর্তে, সামাজিক সত্যের উপাসক এবং পৃষ্ঠপোষক । হলদিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি উৎসব মূলত তাঁরই ভাবনা প্রসূত । বলা দরকার এটিও তাঁর আরেক প্রেম, যে প্রেম বৈদেহী, যে প্রেম অসংখ্য মানুষের, অসংখ্য ভাবনা স্রোতের নির্ভার নদী । প্ৰশ্ন উঠতে পারে, এককালের শ্রমিক নেতা, মার্কসবাদে দীক্ষিত জনদরদী কী করে, কোন গতিপথ ছুঁয়ে এরকম বৃহৎপ্রেমের অনুরাগী, আত্মত্যাগী অথচ কর্মমুখর সন্যাসী হয়ে উঠলেন ? গৌতম বুদ্ধ অথবা মহাত্মগান্ধী এক্ষেত্রে তাঁর ভেতরে ও বাইরে কি নির্মাণ করেছেন মনোহর যোগসূত্র ?
বিশ্ববঙ্গ সাহিত্য সংস্কৃতি উৎসব নিছক কোনো সমাবেশ নয় । সূচি তার বহুমাত্রিক এবং বহুত্ববাদী জড়ো হবেন পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা আর অন্যান্য রাজ্যের এবং বাংলাদেশের অন্তত ৪০০ লেখক, কবি, চিত্রকর, লিটলম্যাগ সম্পাদক আর গবেষকরা।সাপ্তাহিক আপনজন পত্রিকা বিশেষ পুরষ্কার দিয়ে সম্মানিত করবে অখন্ড মেদিনীপুরের একজন করে কবি, সাহিত্যিক, লিটলম্যাগ আর সংবাদপত্রের সম্পাদককে । প্রান্তিকের উদ্দেশে এ এক দৃষ্টান্তযোগ্য স্বীকৃতি
গান্ধীজিকে নিয়ে ডক্টরেট করেছেন ইতিহাসের নিয়মিত পড়ুয়া । ডিলিট ডিগ্রি তাঁর গৌতমবুদ্ধের সাম্যচেতনা নিয়ে ( গৌতম অ্যান এক্সপোনেন্ট অব্ ইগেলিটেরিয়ান সোসাইটি ) । দুই মহামানবের চিন্তা কি উদ্বুদ্ধ করেছে তাঁর ভাবনারাশিকে ? আমাদের ধারণা, গান্ধীজির মডেল অব্ ডেমক্রেসি আর গৌতমবুদ্ধের শ্রেণীহীন, বর্ণবৈষম্যহীন সমাজচিন্তা তাঁর বৌদ্ধিক বিচরণকে ক্রমাগত উর্ধ্বারোহী করে তুলেছে । ছড়িয়ে দিচ্ছে আত্মদর্শন আর সমাজদর্শনে । তার সাহিত্য আর সংস্কৃতি প্রেমেরও অশেষ খোরাক জোগাচ্ছে ।
এরকম আদর্শবোধে প্রাণিত হয়েই সমাজের সব অংশের স্পন্দিত, কাঙ্খিত নান্দনিকতার প্রয়োজনীয় আয়োজনকে অপরিহার্য করে তুলতে চান লিটারারি ফেস্টের বর্ণোজ্জ্বল সমাবেশে। বটবৃক্ষ যেমন নিজের দেহকে, তার পুরাতন কলেবরকে ঢেকে রাখে দীর্ঘ লতিকা আর ঘণ পল্লব দিয়ে, নদনদী যেভাবে তার অস্তিত্বের গম্ভীরকে ছড়িয়ে দেয়ে অসংখ্য শাখা প্রশাখায়; সমুদ্র যেরকম তার তরঙ্গের উচ্ছ্বাসকে সমাহিত করে তোলে মাঝদরিয়ায়, লক্ষণবাবুর স্বল্পভাষিতা আর আত্মভোলা আমি ঠিক সেরকম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবার ইচ্ছাকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় না দিয়ে পরম উপলব্ধি এবং সামাজিক সহিতকে বেছে নিয়েছে; বিশ্ব বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্য উৎসবও তাঁর ভেতর থেকে বাইরে, বাহির থেকে ভেতরে যাতায়াতের অন্যতম কর্মসূচি ।
আইকেয়ারের সম্পাদক আর চিত্তজয়ী স্বজন আশিস লাহিড়ী আমাদের জানিয়েছেন, আসন্ন লিটারারি ফেস্ট ( বিশ্ব বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি উৎসবকে আমরা সীমায়িত করতে চাই না ।সীমার ভেতরে দেখতে চাই মানব মনের অসীমকে । এবারের উৎসব শুরু হবে ৫ জানুয়ারি। চলবে তিনদিন। সমাপ্তি ৭ জানুয়ারি । আশিস মজার মানুষ । কবি শঙ্খ ঘোষ বলতেন, ‘প্রুফ রিডার হওয়ার শখ ছিল আমার ।’ বানান সংশোধনের জন্য সব সময় তাঁর কলম প্রস্তুত থাকত । আশিসের শৈশব সখ জানা নেই, কিন্তু সই সাবুদ করার জন্য তাঁর হাতে, তাঁর ব্যাগে কলম যেন সবসময় তৈরি থাকে । লক্ষণ শেঠের বৃহৎ বাগান সামাল দেবার দায়িত্ব আশিসের । সেই কবে নদীয়া থেকে চাকরি সূত্রে হলদিয়ায় এসেছিলেন।লক্ষণের সঙ্গ তাঁকে সমৃদ্ধ করল। অবসরের পরেও নদীয়ায় ফেরেননি। এখনো একে অন্যের উপস্থিতিতে সমুজ্জ্বল দুইজনা । আসন্ন সাহিত্য উৎসবের সব কাজ কর্মের নেপথ্যে, প্রকাশ্যে থাকতে হবে তাঁকে, সঙ্গে থাকবে লক্ষণবাবুর অভিপ্রয় এবং সহযোগীদের কর্মশীল পরামর্শ ।
বিশ্ববঙ্গ সাহিত্য সংস্কৃতি উৎসব নিছক কোনো সমাবেশ নয় । সূচি তার বহুমাত্রিক এবং বহুত্ববাদী জড়ো হবেন পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা আর অন্যান্য রাজ্যের এবং বাংলাদেশের অন্তত ৪০০ লেখক, কবি, চিত্রকর, লিটলম্যাগ সম্পাদক আর গবেষকরা। কবি জাভেদ আখতার, গীতিকার গুলজারের সঙ্গে কথা চলছে, একজন অথবা দুজনই আসতে পারেন।সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আসেন প্রতিবছর, আশা করছি তাঁর শীর্ষবিন্দু শূণ্য থাকবে না । চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষ, খোশ মেজাজের অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী, চিত্রকর শুভাপ্রসন্ন এবং সুপরিচিত, স্বল্প পরিচিত লেখক কবি চিত্রিদের ভিড়ে জেগে উঠবে শিল্প আর সুন্দরের তির্যক নবীনতর কলরব । সাপ্তাহিক আপনজন পত্রিকা বিশেষ পুরষ্কার দিয়ে সম্মানিত করবে অখন্ড মেদিনীপুরের একজন করে কবি, সাহিত্যিক, লিটলম্যাগ আর সংবাদপত্রের সম্পাদককে । প্রান্তিকের উদ্দেশে এ এক দৃষ্টান্তযোগ্য স্বীকৃতি । আমরা সবাই যদি সীমাবদ্ধতাকে তছনছ করে সব উদীয়মানের, সব প্রাজ্ঞ আর অভিজ্ঞের প্রতি হাত বাড়িয়ে বলতে পারতাম, চিত্ত যেথা ভয়শূণ্য, উচ্চ যেথা শির— সেখানে, আসুন সেখানেই গড়ে তুলি আমাদের নিত্য বসবাস — তাহলে আরো মনোহর, আরো শিল্পলালিত হয়ে উঠত বসুন্ধরা, উপদ্রবকে ঠেসে ধরে কত সহজে এগিয়ে যেত সম্মেলিত অথবা ব্যক্তিগত পদক্ষেপ ।
বিশ্বাস হারাতে শিখিনি, পেছন দিকে তাকাতেও অভ্যস্ত নই, লক্ষণবাবুর মতোই সমাজের বড়ো অংশের দৃষ্টি সম্মুখে। পেছনে, অন্ধকারেও অভিজ্ঞতার ছন্দ। যার ক্ষয় নেই, নেই শূণ্যতাবোধ। এর ওপর ভরসা রেখেই বলার সাহস হচ্ছে হলদিয়া হেলথ সায়েন্স ক্যাম্পাসের ময়দানে, অনুষ্ঠেয় লিটারারি ফেস্ট হয়তো উপমহাদেশের সেরা আর বৃহত্তম সাহিত্য সংস্কৃতির উৎসব হয়ে উঠবে অচিরে । সুলক্ষণ তার পরিষ্কার, ভিত্তি দ্বিধাহীন । ভবিষ্যত, যার নাম গন্তব্য, সেখানকার জমিতেও দীপ্তিমান চাঁদ খেলা করে জয়বিজয়ের গুণকীর্তন কন্ঠ নিয়ে । সম্ভবত এটাই নান্দনিক উল্লাসের অনিবার্য চিত্রকথা অথবা চালচিত্র ।
❤ Support Us





