Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • মে ৫, ২০২৬

‘বদলা নয়, বদল। ভয় নয়, উন্নত ভবিষ্যৎ’ : বঙ্গজয়ের পর চাকরি-নিরাপত্তা-স্বাস্থ্যে জোর দিয়ে বার্তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘বদলা নয়, বদল। ভয় নয়, উন্নত ভবিষ্যৎ’ : বঙ্গজয়ের পর চাকরি-নিরাপত্তা-স্বাস্থ্যে জোর দিয়ে বার্তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অদ্ভূতপুর্ব পরিবর্তন। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনের অবসান, অন্যদিকে একক সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে বিজেপির অভ্যুত্থান; এ কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে ঐতিহাসিক ঘটনা। সোমবার ভোটগণনার শুরু থেকেই যে প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছিল, দুপুর গড়াতেই তা কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায়। ২০০-রও বেশি আসনে এগিয়ে থেকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে হাঁটে গেরুয়া শিবির। রাজ্যের নানা প্রান্তে ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। নয়াদিল্লির দলীয় সদর দফতরেও সন্ধ্যা নামার আগেই জমে ওঠে বিজয়ের আবহ।

সে আবহেই দলীয় সদর দফতরে পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর উপস্থিতিতেই ছিল এক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। সাদা পাঞ্জাবি, ধাক্কাপাড়ের কোরা ধুতি, গলায় গেরুয়া উত্তরীয়— পোশাকে স্পষ্ট বাঙালিয়ানা। মুখে চওড়া হাসি। পশ্চিমবঙ্গের জয়ের পরে বাংলার মানুষের উদ্দেশে প্রথম ভাষণে তিনি রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি প্রতীকী স্তরেও পৌঁছে দিতে চাইলেন একটি ইঙ্গিত— বাংলার নতুন ক্ষমতার অধ্যায়কে তিনি আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার বক্তৃতায় পশ্চিমবঙ্গই ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠে, কেন্দ্রের ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্নপূরণে ‘বিকশিত পশ্চিমবঙ্গ’-কে অপরিহার্য বলে মনে করছে বিজেপি। তিনি বলেন, ভারতের উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে পশ্চিমবঙ্গও। পশ্চিমবঙ্গের রায়কে তিনি কেবল নির্বাচনী ফল হিসেবে দেখেননি; বরং বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক নতুন বাঁক বলে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘আজ থেকে বাংলার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় লেখা শুরু হল’ বলেন তিনি। তাঁর দাবি, এই জনাদেশ উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা, নতুন আস্থা এবং নতুন আকাঙ্ক্ষার পথে রাজ্যের যাত্রার সূচনা।

এদিন বাংলায় আসন্ন বিজেপি সরকারের আশু কাজের রূপরেখাও স্পষ্ট করে দেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি জানান, নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই আয়ুষ্মান ভারত-প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনায় অনুমোদন দেওয়া হবে। দীর্ঘ দিন কেন্দ্র-রাজ্য টানাপড়েনের জেরে পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর হয়নি কেন্দ্রের এই স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প। নির্বাচনী প্রচারে এই প্রশ্নে বার বার তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করেছেন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ-সহ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সোমবারের বক্তৃতায় সে বিষয়টিকেই সামনে এনে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, আগামী দিনে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো প্রকল্প থেকে পশ্চিমবঙ্গকে আর দূরে রাখা হবে না। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু হলে প্রতি পরিবার বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসা সুবিধা পাবে। সত্তরোর্ধ্ব নাগরিকেরা স্বয়ংক্রিয় ভাবে এ প্রকল্পের আওতায় আসবেন। দেশের ৩৫টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ইতিমধ্যেই এই প্রকল্প চালু রয়েছে। এত দিন পশ্চিমবঙ্গ নিজস্ব স্বাস্থ্য প্রকল্পের কথা বলে কেন্দ্রীয় প্রকল্পে যোগ দেয়নি। তৃণমূলের সেই রাজনৈতিক অবস্থানের অবসানেরই ইঙ্গিত মিলল সোমবারের ঘোষণায়।

ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ বাংলার ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন যাত্রা শুরু হচ্ছে— যেখানে বিকাশ, অটল বিশ্বাস এবং নতুন আশা হাতে হাত রেখে এগোবে।’ একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের উন্নত ভবিষ্যতের জন্য বিজেপি দিনরাত এক করে দেবে। তাঁর বক্তৃতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কর্মসংস্থান ও নারী নিরাপত্তার প্রশ্ন। নির্বাচনী প্রচারে বার বার এই দুই বিষয়কে সামনে এনেছিল বিজেপি। জয়ের পরে সেই অবস্থানই পুনরায় স্পষ্ট করলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, বাংলায় যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দরজা খুলবে, মহিলারা নিরাপদ পরিবেশ পাবেন। কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কাজের সুযোগ বাড়লে অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ার প্রবণতিও কমবে। তিনি বলেন, ‘বাংলার যুবকেরা রাজ্যেই চাকরি পাবেন। অন্যত্র চলে যাওয়া বন্ধ হবে।’

অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গেও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রশ্ন বিজেপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু ছিল। সোমবারের ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দেন, আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। তবে বক্তৃতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল রাজনৈতিক হিংসা প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য। অতীতের বহু নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে সংঘর্ষ, অশান্তি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সেই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বারের ভোটপর্ব অন্য এক বার্তা দিয়েছে। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে এবং নির্বাচনী হিংসায় এক জনেরও মৃত্যু হয়নি— এমন ঘটনা এই প্রথম। তিনি জানান, ‘পশ্চিমবঙ্গে ভোটের সময়ে আগে হিংসা, ভয় এবং নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যেত। কিন্তু এ বার গোটা দেশ অন্য ধরনের খবর পেয়েছে। গণতন্ত্রের এই উৎসবে বন্দুকের আওয়াজ নয়, জনতা জনার্দনের কণ্ঠ শোনা গিয়েছে’— বলেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি একটি সুস্পষ্ট বার্তাও দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর আহ্বান, ‘বদলা নয়, বদল।’ তিনি বলেন, ‘কে কাকে ভোট দিলেন, তা নিয়ে আর নয়। আসুন, আমরা সবাই বাংলার জন্য কাজ করি।’ পশ্চিমবঙ্গের সব রাজনৈতিক দলকে ‘নির্বাচনী হিংসার অভ্যাস’ বদলে ফেলার পরামর্শও দেন তিনি। তাঁর মতে, এই নির্বাচনে ভয় নয়, গণতন্ত্রের জয় হয়েছে; এখন বাংলার রাজনীতিতে ভয় নয়, ভবিষ্যতের কথাই প্রধান হওয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রী ভোটদানের হারকেও বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন। প্রায় ৯৩ শতাংশ ভোটদানকে তিনি ‘ঐতিহাসিক’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর বক্তব্য, এই বিপুল অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে শুধু গণতন্ত্র নয়, সংবিধান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর মানুষের আস্থা আরও গভীর হয়েছে। নারী ভোটারদের ভূমিকাকেও তিনি বিশেষ ভাবে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এই নির্বাচনের অন্যতম উজ্জ্বল দিক ছিল মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ভাষণে বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারও ফিরে ফিরে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন এক পরিবেশ গড়ে তোলা হবে যেখানে ভয় থাকবে না, এবং বাংলার বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক পরম্পরা আরও বিকশিত হতে পারবে। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে। তাঁর কথায়, বাংলায় এই জয় শ্যামাপ্রসাদের আত্মাকেও শান্তি দেবে।

রাজনৈতিক প্রতীকের ব্যবহারেও ছিল বিশেষ তাৎপর্য। বিহার নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরে গত বছরের ১৪ নভেম্বর করা নিজের একটি মন্তব্য স্মরণ করিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তখন তিনি বলেছিলেন গঙ্গার যাত্রা বিহার পেরিয়ে গঙ্গাসাগরের দিকে। সোমবার পশ্চিমবঙ্গের ফল ঘোষণার পরে সেই সূত্র টেনেই তাঁর মন্তব্য, ‘গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর সর্বত্র পদ্ম ফুটছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি মা গঙ্গার আশীর্বাদ আমাদের উপর রয়েছে। বিহারের নির্বাচনের ফলের দিনই আমি বলেছিলাম, গঙ্গাজির গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত পথে পদ্ম ফুটবে। আজ বাংলার ফলের পরে সেই কথাই সত্যি হয়েছে।’

উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গ— গঙ্গা অববাহিকার এই চার রাজ্যে এখন বিজেপি বা এনডিএ সরকার রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, বাংলার জয়কে শুধু একটি রাজ্যের ফল নয়, বৃহত্তর জাতীয় রাজনৈতিক বিস্তারের পর্ব হিসেবেও তুলে ধরতে চাইছে বিজেপি। নিজেকে ‘কর্মীদের মধ্যে একজন কর্মী’ বলে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী দলের তৃণমূল স্তরের সংগঠনকে বিশেষ কৃতিত্ব দেন। তাঁর মতে, দীর্ঘ দিনের সাংগঠনিক পরিশ্রম, ধারাবাহিক রাজনৈতিক লড়াই এবং তৃণমূল স্তরের কর্মীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলেই এই ফলাফল সম্ভব হয়েছে। এই জয়কে তিনি ইতিহাস পুনর্লিখনের মুহূর্ত বলেও বর্ণনা করেন। তবে সোমবারের বিজয়মঞ্চে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি প্রত্যাশার ভারও স্পষ্ট। কর্মসংস্থান, নারী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক হিংসার অবসান, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন— এ সব প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ কেমন হবে, এখন তার দিকেই নজর থাকবে রাজ্যের।

নির্বাচনী ফলাফল ইতিহাস তৈরি করেছে। কিন্তু সে ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায় কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে আগামী দিনের প্রশাসন, রাজনৈতিক আচরণ এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। বাংলার রাজনীতিতে সমীকরণ বদলে গিয়েছে,  আর সেই পালাবদলের সন্ধ্যায় নরেন্দ্র মোদির কণ্ঠে ধ্বনিত হলো নতুন রাজনৈতিক উচ্চারণ: বদলা নয়, বদল; ভয় নয়, ভবিষ্যৎ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!