- দে । শ
- মে ৭, ২০২৬
রাজনৈতিক পালাবদলে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন ! পশ্চিমবঙ্গ-তামিলনাড়ুতে ‘পিএম-শ্রী’ বাস্তবায়নে সক্রিয় কেন্দ্র, মুখ্যসচিবদের চিঠি পাঠাচ্ছে শিক্ষামন্ত্রক
বদলে যাওয়া রাজনৈতিক আবহে ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি’ ঘিরে দীর্ঘদিনের টানাপড়েনের সমাপ্তির ইঙ্গিত। পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে ‘পিএম শ্রী’ প্রকল্প চালু করতে ফের সক্রিয় কেন্দ্র। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসার পরই দুই রাজ্যের মুখ্যসচিবদের উদ্দেশে চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক। লক্ষ্য একটাই, যত দ্রুত সম্ভব সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ সই করিয়ে ‘প্রধানমন্ত্রী স্কুলস ফর রাইজিং ইন্ডিয়া’ (পিএম শ্রী) প্রকল্পকে রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলিতে কার্যকর করা।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার বা শুক্রবারের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর প্রশাসনিক শীর্ষ কর্তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে চিঠি পৌঁছে যাবে। কেন্দ্রের এক শীর্ষ আধিকারিকের জানিয়েছেন, ‘এখন আমরা আশাবাদী। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পরে রাজ্যগুলি ‘পিএম শ্রী’ প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে বলেই মনে হচ্ছে। সে কারণেই দ্রুত মুখ্যসচিবদের কাছে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।’
দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০ এবং তার অন্তর্ভুক্ত একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্র ও বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির মধ্যে মতবিরোধ চলছিল। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার এবং তামিলনাড়ুতে ডিএমকে সরকার প্রকাশ্যেই জাতীয় শিক্ষা নীতির নানা দিকের বিরোধিতা করেছে। বিশেষ করে ভাষানীতি, শিক্ষার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ এবং রাজ্যের অধিকার খর্ব হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আপত্তি তুলেছিল তারা। সে কারণেই পিএম শ্রী প্রকল্পে যোগ দিতে প্রয়োজনীয় এমওইউ-তে সই করেনি দুই রাজ্য। কিন্তু সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘিরে রাজনৈতিক আবহে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে, তাতেই নতুন করে আশার আলো দেখছে কেন্দ্র। শিক্ষামন্ত্রকের একাংশের মতে, পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি এখন ‘অনেকটাই অনুকূল’। যদিও তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে এখনো খানিক অনিশ্চয়তা রয়ে গিয়েছে। কারণ সেখানে সি. জোসেফ বিজয়ের নেতৃত্বাধীন তামিলগা ভেত্ত্রি কাঝগম (টিভিকে)-র উত্থান নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। ফলে শিক্ষা নীতি নিয়ে রাজ্যের অবস্থান ঠিক কোন দিকে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গত অর্থবর্ষে ‘পিএম শ্রী’ প্রকল্পকে ঘিরে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত আরও প্রকট হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ‘সমগ্র শিক্ষা অভিযান’-এর অধীনে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল, দিল্লি ও পঞ্জাবের মতো কয়েকটি রাজ্যের অর্থবরাদ্দ আটকে দেয় বা স্থগিত রাখে। কেন্দ্রের বক্তব্য ছিল, ‘পিএম শ্রী’ প্রকল্পে যোগ না দিলে এবং এমওইউ সই না করলে সংশ্লিষ্ট অর্থ ছাড়া সম্ভব নয়। অন্য দিকে বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ছিল, কেন্দ্র শিক্ষা খাতে অনুদানকে কার্যত রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের দাবি, জাতীয় শিক্ষা নীতি মেনে নেওয়ার জন্য রাজ্যগুলিকে পরোক্ষে বাধ্য করতেই অর্থ আটকে রাখা হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী এ প্রকল্পের লক্ষ্য দেশজুড়ে ১৪ হাজার ৫০০-রও বেশি স্কুলকে ‘মডেল স্কুল’-এ পরিণত করা। আধুনিক পরিকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, অভিজ্ঞতাভিত্তিক পাঠদান, দক্ষতামূলক শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশ— সব কিছু মিলিয়েই নতুন ধরনের শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে প্রকল্পে। শুধু পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা নয়, বরং শিশুদের সৃজনশীলতা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক দক্ষতা এবং ব্যক্তিগত বিকাশের উপরেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রকের এক আধিকারিক জানান, খুব শীঘ্রই স্কুল স্তরে একটি পৃথক মানসিক স্বাস্থ্যনীতিও প্রকাশ্যে আনা হবে। সম্ভবত জুনের প্রথম সপ্তাহেই সেই নীতিপত্র জনসমক্ষে আনা হতে পারে। আধিকারিকের জানান, ‘একটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর শুধু স্কুলের প্রভাব থাকে না, বাড়ির পরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ও সামগ্রিক বিকাশ নিয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন এবং সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।’
নতুন নীতিতে স্কুলে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদার করা, পড়ুয়াদের মানসিক চাপ দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে বলেই জানা গিয়েছে। শিক্ষামহলের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পড়ুয়াদের মধ্যে উদ্বেগ, মানসিক অবসাদ এবং প্রতিযোগিতাজনিত চাপ বাড়তে থাকায় কেন্দ্রের এই উদ্যোগ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তবে রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, শিক্ষা কি আবারও কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের নতুন মঞ্চ হতে চলেছে? নাকি রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের সঙ্গে সঙ্গে এবার বরফ গলবে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা?
❤ Support Us





