Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ৭, ২০২৫

‘বৈষম্যের অভিযোগ ভিত্তিহীন, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাকে ১২৯০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে’, মুখ্যমন্ত্রীর বঞ্চনার তত্ত্ব খারিজ কেন্দ্রের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘বৈষম্যের অভিযোগ ভিত্তিহীন, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাকে ১২৯০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে’, মুখ্যমন্ত্রীর বঞ্চনার তত্ত্ব খারিজ কেন্দ্রের

উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি ঘিরে ফের চড়েছে রাজ্য- কেন্দ্রের রাজনৈতিক পারদ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্র রাজ্যকে বন্যা ত্রাণ তহবিল এবং নদী পরিষ্কারের কাজে ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত করছে। ইন্দো-ভুটান নদী কমিশন গঠনের তাঁর প্রস্তাবকেও উপেক্ষা করেছে কেন্দ্র। কিন্তু সোমবারই তাঁর অভিযোগের পাল্টা জবাব দিল মোদি সরকার। কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের দাবি, পশ্চিমবঙ্গকে ইতিমধ্যেই ১,২৯০ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে বন্যা মোকাবিলা ও সীমান্ত এলাকা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায়।

রবিবার রাতভর বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয় উত্তরবঙ্গ। পাহাড় থেকে সমতল, সর্বত্র জলবন্দি অবস্থা। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩২ জন। কয়েক জন এখনো নিখোঁজ। সোমবার দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে কেন্দ্রকে একহাত নেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, ‘ইন্দো-ভুটান নদী কমিশন গঠনের আমার পরামর্শ মানেনি কেন্দ্র। সে কারণেই উত্তরবঙ্গ বারবার বন্যায় বিধ্বস্ত হচ্ছে। কেন্দ্র যদি দ্রুত পদক্ষেপ না করে, ভয়াবহ পরিণতি ঘটবে।’ তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জলশক্তি মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানায়, ‘উত্তরবঙ্গকে প্রভাবিত করা নদীগুলির ভাঙন, পলি জমা ও আকস্মিক বন্যা রোধে ভারত ও ভুটানের মধ্যে ইতিমধ্যেই যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছে— জয়েন্ট গ্রুপ অফ এক্সপার্টস, জয়েন্ট টেকনিক্যাল টিম ও জয়েন্ট এক্সপার্টস টিম। এই কমিটিগুলিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারী আধিকারিকরাও সদস্য।’

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ভুটানের পারোতে সম্প্রতি হওয়া ১১তম জেজিই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশকারী আটটি নদী— হাসিমারা ঝোড়া, জোগিখোলা, রোকিয়া, ধওলা ঝোড়া, গাবুর বসরা, গাবুর জ্যোতি, পানা ও রায়ডাক—এর উপর যৌথ গবেষণা হবে। এ বছরের শেষের দিকেই পরবর্তী বৈঠকে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা রাজ্য সরকারের। জলশক্তি মন্ত্রকের দাবি, ‘রাজ্যের কোনো বন্যা ত্রাণ প্রস্তাবই বর্তমানে কেন্দ্রের কাছে ঝুলে নেই।’ অন্যদিকে, মমতার অভিযোগ, গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান বন্ধ করে দিয়েছে কেন্দ্র। এরও জবাব দিয়েছে জলশক্তি মন্ত্রক। তাদের বক্তব্য, ‘নমামি গঙ্গে ও গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান’–এর আওতায় পশ্চিমবঙ্গে মোট ৫,৬৪৮ কোটি টাকার ৬২টি প্রকল্প চলছে। এর মধ্যে ৩১টি পলি নিষ্কাশন এবং ৩০টি ঘাট ও শ্মশান সংস্কারের কাজ। এমনকি কলকাতার টালি নালা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প–ও সম্প্রতি অনুমোদন পেয়েছে কেন্দ্রের কাছ থেকে।

শুধু বন্যা তহবিলই নয়, বিতর্কের কেন্দ্রে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন বা ডিভিসিও। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ‘দুর্গাপুজোর সময় রাজ্যকে না জানিয়েই ১.৫ লক্ষ কিউসেক হারে জল ছেড়েছে ডিভিসি। ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে বন্যার আশঙ্কা তৈরি করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের পাল্টা দিয়ে মুখ খুলেছেন কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রী সি. আর. পাতিল। তিনি জানিয়েছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীর দাবি একেবারেই ভুল। ডিভিসি মোট ৭০,০০০ কিউসেক জল ছেড়েছে— মাইথন জলাধার থেকে ৪১,৫০০ কিউসেক এবং পাঞ্চেত থেকে ২৭,৫০০ কিউসেক। মুখ্যমন্ত্রী যে পরিমাণ জলছাড়ের কথা বলেছেন, তা প্রকৃত তথ্যের অর্ধেকও নয়।’ তিনি আরো দাবি করেছেন, ডিভিসি জলাধার পরিচালনায় বৈজ্ঞানিক ও পদ্ধতিগত নিয়ম মেনে চলে। জল ছাড়ার আগে রাজ্যের সেচ দফতরের মতামতও চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু রাজ্যের তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তাঁর দাবি, ‘নিম্ন দামোদর অঞ্চলের পরিস্থিতি আপাতত স্বাভাবিক। হুগলির হরিণখোলায় জলস্তর সতর্কতা সীমার নীচে রয়েছে।’ এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারও মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘ডিভিসির জল ছাড়া নতুন কিছু নয়। কমিটিতে রাজ্যের পক্ষ থেকেও প্রতিনিধি থাকেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে কেন্দ্রের সঙ্গে শত্রুতার আবহ তৈরি করে বাঙালি আবেগে রাজনীতি করতে চাইছেন।’ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে সেচব্যবস্থা বিপর্যস্ত, এমন অভিযোগ এনেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। অন্যদিকে, রাজ্যের সেচমন্ত্রী মানস ভূঁইয়া কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগে বলেন, ‘মোদি সরকার আসলে বাংলাকে পচিয়ে মারতে চাইছে। কিন্তু বাংলার মানুষ চুপ করে থাকবে না, এর জবাব তারা ভোটেই দেবে।’ মঙ্গলবার ডিভিসির জল ছাড়াকে কেন্দ্র করে মাইথন ড্যাম-সহ একাধিক জায়গায় প্রতিবাদ কর্মসূচীতে নেমেছে তৃণমূল। তাদের দাবি রাজ্য সরকারকে না জানিয়ে প্রতিবছর এভাবে জল ছাড়া বন্ধ করতে হবে।

উল্লেখ্য, শনিবার ডিভিসি মাইথন থেকে ৩২,৫০০ কিউসেক ও পাঞ্চেত থেকে ৩৭,৫০০ কিউসেক হারে জল ছেড়েছে। ডিভিসির দাবি, জলাধারের জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় এবং তেনুঘাট থেকে অতিরিক্ত জল ছাড়া হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজ্য আগেই কম জল ছাড়ার অনুরোধ জানিয়েছিল, তবুও জল ছাড়ায় বন্যা আতঙ্ক ছড়িয়েছে নিম্ন দামোদর এলাকায়। রাজ্যের তরফে নবান্ন জানিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে বন্যাপ্রবণ জেলাগুলিতে ত্রাণসামগ্রী মজুত, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং উদ্ধার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ। মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ প্রতিটি জেলার প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। নবান্ন এবং সেচ দফতরের কন্ট্রোল রুম থেকে পরিস্থিতির উপরে নজর রাখা হচ্ছে সারাক্ষণ।

রাজ্য ও কেন্দ্রের এই তীব্র চাপানউতোরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। বিধানসভা ভোটের ঠিক আগেই উত্তরবঙ্গে একাধিক সভা করে প্রধানমন্ত্রী-সহ বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বরা বারবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছে। অপর দিকে, মুখ্যমন্ত্রীও বারবার কেন্দ্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলে এসেছেন, ‘আমাদের বঞ্চনা করা হচ্ছে।’ এ বিতর্ক নতুন কিছু নয়, তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আবহে তা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। জলের তোড়ে মানুষ মরছে, নদীভাঙনে গ্রাম বিলীন হচ্ছে, সে আবেগকে হাতিয়ার করেই রাজ্য-কেন্দ্র সংঘাতে ঘৃতাহুতি পড়ছে, এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!