Advertisement
  • দে । শ
  • অক্টোবর ১, ২০২৬

পুষ্টির ঘাটতি, নেই হাসপাতাল ! বালাঘাটে একের পর এক শিশুমৃত্যু, স্বাস্থ্যপরিষেবা নিয়ে প্রশ্নের মুখে মধ্যপ্রদেশ সরকার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পুষ্টির ঘাটতি, নেই হাসপাতাল ! বালাঘাটে একের পর এক শিশুমৃত্যু, স্বাস্থ্যপরিষেবা নিয়ে প্রশ্নের মুখে মধ্যপ্রদেশ সরকার

জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সরু রাস্তা। কোথাও রাস্তা শেষ হয়ে গিয়েছে পাহাড়ের ঢালে। কোথাও আবার কাঁচা পথটুকুও নেই। চার পাশ ঘন সবুজ। পাহাড়ের কোলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোটো ছোটো জনজাতি বসতি। সেখানেই একের পর এক শিশুর জ্বর, শরীরে র‌্যাশ, শ্বাসকষ্ট। তার পর মৃত্যু। কারও বাড়িতে, কারও হাসপাতালে যাওয়ার পথেই। মধ্যপ্রদেশের বালাঘাটে গত কয়েক মাসে অন্তত ৩০ জনের বেশি শিশু মৃত্যুর ঘটনা শুধু রোগের প্রকোপ নয়, সামনে এসেছে আরও বড়ো প্রশ্ন — স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও, ট্রিলিয়ন ইকোনমির দেশেও ওইসব প্রান্তিক অঞ্চলে নূন্যতম সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা নেই কেন?

মধ্যপ্রদেশ স্বাস্থ্য দফতরের নথিতে হাম, ম্যালেরিয়া, কখনো বা দুই রোগের সহ-সংক্রমণ, আবার কখনো অপুষ্টি, রক্তাল্পতা, শ্বাসকষ্ট, জলশূন্যতা কিংবা শকের কথা বলা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকও এখনো এতজন শিশুদের মৃত্যুর কোনো নির্দিষ্ট কারণ পেশ করতে পারেনি। এখানেই প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে — রোগ হয়তো আচমকা এসেছে, কিন্তু বিপর্যয় মোকাবিলার উপযুক্ত পরিকাঠামো কোথায়? বালাঘাটের বিরসা ব্লকের জঙ্গলঘেরা বাইগা অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বহু দূরে। কোথাও ২০ কিলোমিটার, কোথাও ২৫, কোথাও আবার ১০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে জেলা হাসপাতালে পৌঁছতে হয়। গণপরিবহণ নেই বললেই চলে। বর্ষা, পাহাড়ি রাস্তা আর জঙ্গলের দুর্গমতা আরও বাড়িয়ে দেয় যাতায়াতের সমস্যা। তার সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘ দিনের অপুষ্টি, কম টিকাকরণ, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ এবং সরকারি নজরদারির ঘাটতি। ফলে বালাঘাটের এই মৃত্যুমিছিলকে শুধু ‘হাম’ কিংবা ‘ম্যালেরিয়া’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। বরং একাধিক দুর্বলতার জায়গা যেন একসঙ্গে এসে পড়েছে একই বিন্দুতে।

মাতলা গ্রামের পাহাড়ের মাথায় বড়ো বড়ো পাথরের স্তূপ। সেটিই তিন বছরের ববিতা মারকামের কবর। চার পাশে জঙ্গল। কোনো সমাধিফলক নেই। কোনো নাম লেখা নেই। কেবল কয়েক পা দূরে পড়ে রয়েছে শিশুটির ব্যবহৃত ছোট্ট স্টিলের থালা। ববিতা মারা গিয়েছিল ১৮ মে। চার দিনের জ্বর, সারা শরীর ভরে উঠেছিল র‌্যাশে। বাড়িতেই মৃত্যু হয় তাঁর। মৃত্যুর খবর স্বাস্থ্য দফতরের কাছে পৌঁছয়ওনি। দু-মাস পরে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি, স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের কাছে পর পর কয়েকটি শিশুর মৃত্যুর খবর পৌঁছয়। সেখান থেকে খবর যায় জেলা প্রশাসনের কাছে। তার পর শুরু হয় সরকারি তৎপরতা। ববিতার শোকস্তব্ধ মা কৌশিলা মারকামের আর্তনাদ, ‘ডাক্তারকে বাড়িতে ডাকা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, মাতা হয়েছে। একটা মলম দিয়ে বলেছিলেন চার-পাঁচ দিনের মধ্যে ভাল হয়ে যাবে। কিন্তু শরীরের র‌্যাশ কমেনি। তার পর আমার ছোট্ট মেয়েটা মারা গেল।’ আজও সরকারি মৃত্যুর তালিকায় ববিতার নাম নেই। পরিবারও পায়নি ঘোষিত ক্ষতিপূরণ। এই একটি ঘটনা দিয়েই বোঝা যায়, সরকারি পরিসংখ্যান আর মাটির বাস্তবতার মধ্যে ফারাক কতটা।

বালাঘাটের মুখ্য স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা আধিকারিক ডা. শত্রুঘ্ন সিংহ দাহিয়ার দেওয়া সরকারি হিসাবে, এ প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা ৩২। অন্য দিকে স্থানীয় কংগ্রেস বিধায়ক সঞ্জয় উইকের দাবি, মৃতের সংখ্যা ৪৩। সংখ্যার এ ফারাকের কারণও স্পষ্ট নয়। কাতবে স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, বাড়িতে কারোর মৃত্যু হলে অনেক ক্ষেত্রেই তা স্বাস্থ্য দফতরের নজরে আসে না। মৃত শিশুর চিকিৎসার নথি থাকে না। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার সুযোগ থাকে না। ফলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণও কঠিন হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তরফেও জানানো হয়েছে, বহু শিশু বাড়িতে কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছনোর আগেই মারা গিয়েছে। ফলে তাদের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসা নথি, পরীক্ষার নমুনা বা অন্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।এ পরিস্থিতিতে সব মৃত্যুকে হাম বা ম্যালেরিয়ার কারণে হয়েছে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।  তবে প্রশ্ন একটাই — এতগুলি শিশু একই সময়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ল কেন?

সূত্রের খবর, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই অঞ্চলে প্রায় ২৭ হাজার মানুষের পরীক্ষা করা হয়েছে। সরকারি হিসাবে ৯৮০ জনের ম্যালেরিয়া এবং ২২ জনের হাম ধরা পড়েছে। কিন্তু কোনো একটি রোগকে এখনো শিশু মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়নি। স্বাস্থ্য আধিকারিকদের বক্তব্য, অপুষ্টির কারণে সাধারণ সংক্রমণও শিশুদের ক্ষেত্রে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। অনেকের শরীরে একসঙ্গে একাধিক সমস্যা ছিল — ম্যালেরিয়া, হাম, রক্তাল্পতা, শ্বাসকষ্ট, জলশূন্যতা। বালাঘাট ম্যালেরিয়া-প্রবণ এলাকা। ২০২৪ সালে আক্রান্ত ৪০টি গ্রামে ৬৯৭টি ম্যালেরিয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালে ৪৯২টি। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত মাত্র এক মাসে ওই গ্রামগুলিতে ৪০৪টি ম্যালেরিয়া আক্রান্তের ঘটনা ধরা পড়েছে।  স্বাস্থ্য দফতরেরই দুই প্রবীণ আধিকারিকের বক্তব্য, গত কয়েক বছরে ম্যালেরিয়ার ঘটনা ‘ব্যাপক ভাবে কম নথিভুক্ত’ করা  হয়েছিল,  অর্থাৎ, কাগজে-কলমে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মাটির বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বালাঘাটের এ বিপর্যয় ঘিরে প্রশ্ন উঠছে মধ্যপ্রদেশের টিকাকরণ ব্যবস্থা নিয়ে। ১৯৮৫ সালেই দেশে হাম প্রতিরোধী টিকা সর্বজনীন টিকাকরণ কর্মসূচিতে ঢুকে গিয়েছে। কিন্তু বিরসা ব্লকের বহু গ্রামে গিয়ে দেখা গিয়েছে, বহু শিশুকে টিকা দেওয়া হয়নি। সাহিলের কথাই ধরা যাক।এক বছরের সাহিল গত জুনে প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হয়। সারা শরীরে র‌্যাশ। এক মাস পরে মৃত্যু। তার ১২ বছরের বোন লামলিনও একই উপসর্গে অসুস্থ হয়ে এক দিন পরে মারা যায়। সাহিলের বাবা সমরু ধুরওয়ের দাবি, তাঁর সাত সন্তানের কাউকেই কোনো টিকা দেওয়া হয়নি। অথচ, অঙ্গনওয়াড়ির নথিতে আবার অন্য ছবি। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২১ এপ্রিল সাহিলকে হাম প্রতিরোধী টিকার একটি ডোজ দেওয়া হয়েছিল। দেওয়া হয়েছিল ভিটামিন এ এবং নিউমোকক্কাল টিকাও।দুই সন্তানের মৃত্যুর পরে তাঁকে টিকা নেওয়ার কথা বলতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ সমরুর। স্থানীয় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী জানান, তিনি মে মাসে কাজে যোগ দিয়েছেন। রেজিস্টারে ওই তথ্য কী ভাবে এল, তা তিনি জানেন না। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরে নিয়মিত টিকাকরণ অভিযান হয়নি। একই গ্রামের স্কুলশিক্ষক কপিল যাদবের বক্তব্য, মাসের পর মাস তিনি স্বাস্থ্য দফতরকে স্কুলের শিশুদের টিকা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু নিয়মিত টিকাকরণ হয়নি।

বালাঘাটে সামগ্রিক ভাবে দুই ডোজ হাম টিকার আওতায় এসেছে ৮১.৩ শতাংশ শিশু। জাতীয় হার ৯২.২ শতাংশ। বিরসা ব্লকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সমীক্ষায় ১৭৭ শিশুর মধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছে ৮০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ মাত্র ৭০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ তো সরকারি নথির তথ্য, মাঠপর্যায়ের ছবিও আরও ভয়াবজ হতে পারে। প্রাদুর্ভাব সামনে আসার পর প্রশাসন ‘ক্যাচ-আপ’ টিকাকরণ শুরু করেছে। ২৮ আগস্ট পর্যন্ত ১০,৪৮১টি ডোজ দেওয়া হয়েছে।প্রশ্ন  উঠেছে, এই তৎপরতা যদি আগে শুরু হতো, তা হলে কি পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত না?র উত্তর অবশ্য মেলেনি। রোগের পাশাপাশি যে বিষয়টি বার বার উঠে আসছে, তা হলো অপুষ্টি। ‘ষষ্ঠ জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা’-র তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ মধ্যপ্রদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি ৩৩.২ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতি, ২৪.৯ শতাংশ কম ওজনের এবং ৪২ শতাংশ শিশু ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। জাতীয় হার যথাক্রমে ২৯.৩, ১৯ এবং ৩১.৮ শতাংশ। বালাঘাটে প্রতি তিন শিশুর এক জনের ওজন কম। বিরসা ব্লকে জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে ১৬,৭৮৪ শিশুর পরীক্ষা করে ২১৩ জনকে গুরুতর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত পাওয়া গিয়েছে। বাইহরে ১০,৪১৮ শিশুর মধ্যে এই সংখ্যা ৯৮৬। বোন্ডারির তিন বছরের প্রিয়াঙ্কা ধুরওয় হাসপাতালে ভর্তি করার দু-দিনের মধ্যেমারা যায়। সরকারি নথিতে মৃত্যুর কারণ — গুরুতর অপুষ্টি, তীব্র শ্বাসকষ্ট, গুরুতর রক্তাল্পতা, শক এবং শ্বাসযন্ত্রের বিকলতা।  মৃত্যুর সময় তার ওজন ছিল মাত্র চার কিলোগ্রাম। একই বয়সের শিশুর স্বাভাবিক ওজন যেখানে ১১ থেকে ১৫ কিলোগ্রামের মধ্যে থাকার কথা। অথচ অঙ্গনওয়াড়ির রেজিস্টারে প্রিয়াঙ্কা অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু হিসাবে চিহ্নিতই ছিল না।

অপুষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রেশন বন্ধ হওয়ার অভিযোগও। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের বক্তব্য, মার্চের পর থেকে তিন বছর বা তার কম বয়সি শিশুদের জন্য বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার রেশন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। চাল, ডাল, সয়াবিনের মতো খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হত যে কর্মসূচিতে, সেটি বন্ধ হওয়ার ফলে বহু দরিদ্র পরিবারের শিশুর খাদ্যতালিকায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে। সরবরাহকারী সংস্থাগুলিকে রাজ্য সরকার টাকা দিতে না পারায় এ ব্যবস্থা বন্ধ হয়েছে বলে অভিযোগ। কোন্ডেকাসার অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী মমতা যাদব জানান, ‘শেষ সরবরাহ এসেছিল মার্চে। সেই মজুত এপ্রিল পর্যন্ত চলেছিল।’ প্রিয়াঙ্কার বাবা সুখচাঁদ জানান, রেশন বন্ধ হওয়ার পর তাঁর মেয়ে খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অর্থাৎ সংক্রমণের আগেই অনেক শিশুর শরীর ছিল দুর্বল। তার উপর হাম কিংবা ম্যালেরিয়ার মতো রোগ আঘাত হানলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে পড়েছে।

তবে এসবের মাঝে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন উঠছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। মাতলা, বোন্ডারি, কোন্ডেকাসা, মাচ্চুরদা — এসব গ্রাম থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বহু দূরে। কোথাও ২০-২৫ কিলোমিটার। জেলা হাসপাতাল আরও দূরে। বোন্ডারির চৈনসিংহ মারকামের পাঁচ বছরের ছেলে সচিনকে প্রথমে বালাঘাট জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। পরে গোন্দিয়ার বেসরকারি হাসপাতালে। ফেরার পথেই মৃত্যু।  ছেলের চিকিৎসায় এক লক্ষ টাকার বেশি খরচ করেছিলেন চৈনসিংহ বলে জানা যাচ্ছে। কৃষিকাজ করে তাঁর যে আয় হয়, এ খরচ তার প্রায় দুটি মরসুমের সমান। শিশু মৃত্যুর প্রায় তিন মাস পরে, ৭ আগস্ট কোন্ডেকাসার একটি প্রাথমিক স্কুলে অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছিল।  প্রথম দিকে সেখানে প্রতিদিন ১০০-১২০ জন রোগী আসতেন। এখন সংখ্যাটা কমে প্রায় ১৫। স্বাস্থ্যকর্মীদের বক্তব্য, রোগীর সংখ্যা কমেছে ঠিকই, কিন্তু পরিকাঠামোগত সমস্যা কাটেনি। কর্মীর অভাব রয়েছে। আশা কর্মী, এএনএম, কমিউনিটি হেলথ অফিসার—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। বিরসার মতো জায়গা থেকে কর্মীদের তুলে এনে দুর্গম গ্রামে পাঠানো হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশ্ন, ‘আমরা এখানে এলে আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাগুলোর কী হবে?’

মধ্যপ্রদেশ সরকারের যুক্তি, দীর্ঘদিন এই এলাকাগুলোয় মাওবাদী প্রভাবা তীব্র থাকায় প্রশাসন ভিতরে ঢুকতে পারেনি। স্বাস্থ্য পরিষেবা, রাস্তা এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক পরিকাঠামো তাই গড়ে ওঠেনি। মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব ২৯ আগস্ট এলাকা পরিদর্শন করে ২২৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। তাঁর দাবি, ২৫ বছরে এই প্রথম কোনো মুখ্যমন্ত্রী ওই এলাকায় যেতে পেরেছেন। তাঁর মতে, প্রশাসনের পৌঁছতে না পারার কারণে দীর্ঘদিন বহু সমস্যা ছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএমএইচও-র বক্তব্যেও একই সুর। তাঁর মতে, নকশাল প্রভাব স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যাহত করেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপুষ্টি আর শ্রমিকদের অন্য রাজ্যে অভিবাসন। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন অন্য। আদোরি পঞ্চায়েত প্রধান পরশুরাম ধুরওয়ে বলেন, ‘এ এলাকায় মাওবাদী সমস্যা ছিল, তা ঠিক। কিন্তু সরকার যখন যা চেয়েছে, তখন সে পরিকাঠামো ঠিক তৈরি করতে পেরেছে।’ তাঁর বক্তব্য, গত বছর রাতারাতি ওই এলাকায় সিআরপিএফ ক্যাম্প তৈরি হয়েছে। অথচ এত এত শিশু মারা যাওয়ার পরেও হাসপাতাল তৈরি হয় নি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নেই। একটি স্কুলেই প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক — দুই স্তরের পড়াশোনা চলে। সরকার যদি সিআরপিএফ ক্যাম্প তৈরি করতে পারে, তা হলে স্কুল-হাসপাতাল তৈরি করতে পারবে না কেন? প্রশ্ন তাঁর।

এ প্রশ্নে আরও একটি মাত্রা যোগ করেছেন চিকিৎসা নৃবিজ্ঞান গবেষক জয় রামটেকে। তাঁর বক্তব্য, জনজাতি মানুষেরা শুধু স্থানীয় ধর্মবিশ্বাসী চিকিৎসকদের উপর নির্ভর করেন, এমন বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে শোনা যায়, কিন্তু তা পুরোপুরি সত্য নয়। অনেক পরিবারই গুনিন বা পান্ডার কাছে যাওয়ার পাশাপাশি ডাক্তার বা হাসপাতালেও যায়। অর্থাৎ ঐতিহ্যগত চিকিৎসা এবং আধুনিক চিকিৎসা — দুই ব্যবস্থার মধ্যেই তারা প্রয়োজন অনুযায়ী যাতায়াত করে। রামটেকের বলেন, এটা হলো ‘মেডিক্যাল প্লুরালিজম’। তাঁর মতে, এক্ষেত্রে সমস্যা আস্থারও। স্বাস্থ্যকর্মীরা মনে করেন এঁরা আধুনিক চিকিৎসায় আস্থা রাখেন না। আবার স্থানীয়দের ধারণা, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তাঁদের কাছে আসে না। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের জায়গাটি না বদলালে শুধু টিকা কিংবা ওষুধ দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব কি না, সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, মধ্যপ্রদেশের এ অঞ্চলের জনজাতিদের অপুষ্টির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে তাঁদের ঐতিহ্যগত খাদ্যব্যবস্থাও। জঙ্গলের কন্দ, ওল, ছত্রাক, বিভিন্ন বনজ খাদ্য সংগ্রহ করে দীর্ঘ দিন ধরে তাঁরা খাদ্যের সংস্থান করেছেন। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে বনাধিকার আইন থাকা সত্ত্বেও বহু জনজাতি পরিবার বনজ সম্পদ ব্যবহারের অধিকার পুরোপুরি পাচ্ছে না। জেলা পরিষদ সদস্য মানসারাম মেরাভির অভিযোগ, ‘অনেককেই বন থেকে খাদ্য সংগ্রহ করতে দেওয়া হয় না। জঙ্গলে চলাফেরাও এখন নিয়ন্ত্রিত।’ অর্থাৎ এক দিকে বাজারনির্ভর খাদ্যের সামর্থ্য নেই, অন্যদিকে ঐতিহ্যগত বনজ খাদ্যের উপর নির্ভরতার সুযোগও সীমিত। মাঝখানে কালান্তকের মতো দাঁড়িয়ে অপুষ্টি।

তবে, একের পর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পর, হস্তক্ষেপ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ১২ আগস্ট বালাঘাটে জাতীয় যৌথ রোগ-প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা দল পাঠানো হয়। আইসিএমআর-এর দলও মাঠে যায়। প্রায় ৩২ হাজার মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে। ৪৩১ জন শিশুকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩৭৯ জনের চিকিৎসা হয়ে গিয়েছে। ৫২ জন এখনো চিকিৎসাধীন বা পর্যবেক্ষণে। ১ থেকে ১০ বছর বয়সি ১৪,৬০০-এর বেশি শিশুকে অতিরিক্ত ‘এমআর’ টিকা দেওয়া হয়েছে। আগের টিকাকরণের ইতিহাস বিবেচনায় না নিয়েই এই ডোজ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ৭,৭১১ জন শিশুর গুরুতর তীব্র অপুষ্টি ধরা পড়েছে। ৫১৮ জনকে পুষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করার প্রয়োজন হয়েছে। ১৩,৪০০-এর বেশি শিশুর ডায়রিয়া এবং ২৭৪ জনের গুরুতর নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে। এ পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে, সমস্যা কোনো একটি রোগ বা প্রাদুর্ভাবে সীমাবদ্ধ নেই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!