Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • ডিসেম্বর ৯, ২০২৫

কোচবিহারের জনসভায় কেন্দ্র-বিএসএফ এর তীব্র সমালোচনা, বিভেদের বিরুদ্ধে দলীয় কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ মমতার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কোচবিহারের জনসভায় কেন্দ্র-বিএসএফ এর তীব্র সমালোচনা, বিভেদের বিরুদ্ধে দলীয় কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ মমতার

সীমান্তবর্তী কোচবিহারে দু-দিনের সফরে গিয়ে লাগাতার নির্বাচন কমিশন, বিএসএফ, কেন্দ্র সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে ঘিরে সরব ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার প্রশাসনিক বৈঠকে সীমান্তে বিএসএফের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার রাসমেলার মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় সে ক্ষোভ আরও জোরাল আকারে প্রকাশ পায়। তিনি তীব্র ভাষায় বলেন, বাংলার মানুষদের উপর কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি মেনে নেওয়া হবে না। উদ্বেলিত জনতার সামনে মুখ্যমন্ত্রী আহ্বান জানিয়েছেন, ‘প্রত্যেক এলাকায় জোট বাঁধুন। বিএসএফ যদি কারও ওপর  অত্যাচার করে, মেয়েদের এগিয়ে দিন। আমি দেখতে চাই, মা-বোনেদের ক্ষমতা বড়ো না বিজেপি পার্টির ক্ষমতা বড়।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশ্বাস দেন, তৃণমূল কংগ্রেস থাকার সময় বাংলায় কোনো ডিটেনশন ক্যাম্প হবে না। কাউকে তাড়াতে দেব না। আমরা বিজেপির কাছে মাথা নত করি না। বিজেপির ভোটের রাজনীতিকে তুলোধুনা করে বলেন, ‘বিজেপি ভোট কিনে, কিন্তু তিনি ভালোবাসা দিয়ে ভোট অর্জন করেন। তিনি বলেন, ‘উজলা প্রকল্প, চা বাগান খোলার নাটক, নতুন কিছু দেওয়ার নাটক—এগুলো আমরা বরদাস্ত করি না।’

বীরভূমের অন্তঃসত্ত্বা সোনালি বিবিকে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রসঙ্গ টেনে এদিন মমতা বলেন, ‘সোনালি বিবি ভারতের নাগরিক। সব কাগজপত্র থাকলেও বিএসএফ তাঁকে জোর করে পুশব্যাক করেছে। তার পরিবারের আরো ৪ জন এখনো বাংলাদেশে বন্দি রয়েছেন। তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের আচরণ হয়েছে। সোনালিদের আমরা ফিরিয়ে এনেছি। বাকি চারজনকেও ছাড়িয়ে আনব। বাংলায় কোনো এনআরসি বা ডিটেনশন ক্যাম্প হবে না।’ বিজেপি সরকারের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসঙ্গেও সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘হিন্দু বা মুসলিম, রাজবংশী বা অন্য সংখ্যালঘু, সবাই আমার কাছে সমান। ধর্মের নামে রাজনীতি করছে বিজেপি, এমন উস্কানিতে সাধারণ মানুষকে পা দেবেন না।’ এই মন্তব্যের সঙ্গে তিনি দলের নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেন যাতে কেউ বিভেদ তৈরি করতে না পারে।

পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় অর্থায়ন, ১০০ দিনের কাজ এবং নতুন শ্রম কোড নিয়েও মমতার ক্ষোভ প্রকাশ পায়। তিনি অভিযোগ করেন, একশো দিনের কাজের টাকা চার বছর ধরে কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায়নি। আবাস যোজনার কাজ বন্ধ, গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণও বন্ধ, অথচ বাংলার প্রকল্পগুলির মাধ্যমে বহু জাতীয় পুরস্কার জিতে এসেছে। কেন্দ্রীয় চিঠিতে দেওয়া নতুন শর্তগুলি— ত্রৈমাসিক শ্রম বাজেট দেখানো, একটি গ্রামসভায় মাত্র ১০ জন কাজ পাওয়া, জমির কাজ নিষিদ্ধ করা—এসবকে মুখ্যমন্ত্রী অসম্মানজনক বলে অভিহিত করেন। তিনি কেন্দ্রের নয়া নিয়মের কাগজ ছিঁড়ে  জানান, এটি কেন্দ্রের কোনো আদেশ নয়, শুধুই একটি কাগজ, যা তাদের কাছে কোনো মূল্য রাখে না। তিনি সোচ্চারে বলেন, ‘বাংলার সরকার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ১০০ দিনের কাজ চালাবে, ভিক্ষা চাইবে না।’

‘এসআইআর’ প্রসঙ্গেও মমতার কণ্ঠে তীব্রতা। তিনি অভিযোগ করেন, ‘এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যারা মারা যায়নি, তাদের মৃত দেখানো হচ্ছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে অন্য বাড়িতে গেলে নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে।’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এটি নোটবন্দির মতো নতুন ধরনের ভোটবন্দি প্রচেষ্টা। ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যের ১ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তিনি সাধারণ মানুষকে সাহসী থাকার আহ্বান জানান, হেয়ারিংয়ে অংশ নিতে কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে যেতে বলেন। জানান, সরকারিভাবে ‘May I Help You’ ক্যাম্পের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামে সহায়তা প্রদান করা হবে।

সামনেই বিধানসভা নির্বাচন, বাংলায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আবহ তৈরি করতে চাইছে বিজেপি, এ অভিযোগ তুলে দলীয় ঐক্য এবং তৃণমূল নেতৃত্বের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেন তৃণমূল সুপ্রিমো। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সময় সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে হয়।’ দলীয় নেতৃত্বকে তিনি সতর্ক করেন, বিএলএরা যেমন কাজ করছে করবে, দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কোচবিহারের সভা শেষে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনা শেষ করে পরের দিন আবারও দলীয় ঐক্যের বার্তা দিলেন। শীতলকুচি গুলিকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে মমতা সিবিআইকে তীব্র আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, ‘যারা গুলি চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো বিজেপির হাতের পুতুল হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে।

পরিশেষে, কোচবিহারের রাসমেলার মাঠের জনসভায় উপস্থিত মানুষদের উদ্দেশ্য করে মমতা আবারও বলেন, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন বাংলায় কোনো এনআরসি, ডিটেনশন ক্যাম্প হবে না। আমরা যতদিন ক্ষমতায় আছি দাঙ্গা বাঁধাতে দেব না কাউকে। বাংলা রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-চৈতন্য-পঞ্চানন বর্মার মাটি এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোনো যায়গা নেই।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রীর এই সফর সীমান্তবাসী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, কেন্দ্রের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিরোধ, দলের ঐক্য এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার বার্তা দিল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!