- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ৩, ২০২৫
আদলতের নির্দেশ মতোই ৩ মাসের মধ্যে হবে নতুন নিয়োগ, ৭ এপ্রিল চাকরিহারাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন মুখ্যমন্ত্রী
এসএসসি নিয়োগ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ২৬০০০ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী চাকরি হারিয়েছেন। এ নিয়ে নবান্নে জরুরি বৈঠক ডেকেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়ে দিলেন আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট নন। কোর্টের রায় পড়ে শুনিয়ে জানালেন, চাকরি বাতিল হলেও যারা অযোগ্য নন, তাদের টাকা ফেরত দিতে হবে না, দ্রুত নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়াও শুরু হবে। তিনি রাজ্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য বিজেপি আর সিপিএমকে দায়ী করেছেন। বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ প্যানেলের চাকরি বাতিল করে দিয়েছেন। চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ২৬০০০ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী। শীর্ষ আদালতের রায় ঘোষণার পর উত্তাল রাজ্যরাজনীতি থেকে শিক্ষামহল। আশঙ্কা আর উদ্বেগে পথে নেমেছেন অসহায় চাকরীপ্রার্থীরা। চাকরির দাবিতে পথে ২০২২-এর টেট উত্তীর্ণরা। বিকাশ ভবন অভিযান ঘিরে ধুন্ধুমার। করুণাময়ীতে মিছিল আটকালে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। চাকরিপ্রার্থীদের চ্যাংদোলা করে সরায় পুলিশ। ধর্মতলায় বসে থাকা চাকরিহারাদের বক্তব্য, ‘কিছু বলার নেই। তবে এই দায় সরকারকে নিতে হবে।’ সুপ্রিম কোর্টে প্যানেল বাতিলের রায় শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ২০১৬-এর চাকরিজীবীরা। এ নিয়ে নবান্নে জরুরি বৈঠক ডেকেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমত অবস্থায় নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলন করে মুখ্যমন্ত্রী নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানিয়ে দিলেন আদালতের রায় তিনি সম্মান করলেও, এটি ন্যায্য বলে মনে করেন না। কোর্টের রায় পড়ে শুনিয়ে জানালেন, কোর্টের রায় মেনে দ্রুত নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়াও শুরু হবে। তিনি রাজ্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য বিজেপি আর সিপিএমকে দায়ী করেছেন। বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
এদিন সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছে। আদালতের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে, যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন না হওয়ার কারণে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে, রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দুপুরে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু এবং মুখ্যসচিব মনোজ পন্থের উপস্থিতিতে এই বিষয়ে একটি বৈঠক করেছেন । রাজ্য সরকার দ্রুততম সময়ে সমস্যার সমাধান করার জন্য কাজ করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানিয়ে দেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে আগামী ৩ মাসের মাসের মধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিবাচকভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চাই।’ তিনি আরো জানান, ইতোমধ্যেই শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে এই প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা যায়। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী আর এসএসসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই প্রক্রিয়ায় নিজেদের মতো করেই ব্যবস্থা নেবেন, তবে আমাদের লক্ষ্য এটিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাস্তবায়িত করা।’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য বিজেপি এবং সিপিএমকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিজেপির লক্ষ্য হল বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা, এবারে তাঁরা তা একেবারে প্রকাশ্যে করছে।’ তাঁর মতে, বিজেপি, সিপিএম রাজনৈতিক ফায়দফা তোলার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এতগুলো ছেলেমেয়ের চাকরি ‘খেয়েছে’। এই পরিবারগুলি অচল হয়ে গেলে বিজেপি-সিপিএমও সচল থাকবে না। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাজ্য সরকারকে দুর্বল করতে চাইছে। বাংলার বিরুদ্ধে আঘাত হানতে চাইছে, শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিতে চাইছে। মমতা আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘যেহেতু ২৬,০০০ চাকরি বাতিল হয়েছে, তাহলে স্কুলে পড়াতে কে?’ তিনি এই চাকরি বাতিলের ফলে নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষকদের সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার উপর বিরাট চাপ পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এদের মধ্যে ১১,৬১০ জন নবম-দশম শ্রেণি এবং ৫,৫৯৬ জন একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াতেন। এখন যদি তাঁরা চাকরি হারান, তাহলে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এটি এক বড় আঘাত হবে।’
এছাড়াও, তিনি বিজেপির নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, বিশেষ করে সুকান্ত মজুমদারের বিরুদ্ধে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি, ২০১৬ সালের নিয়োগ প্যানেলের বাতিল হওয়া নিয়ে মমতাকে ব্যানার্জিকে সরাসরি দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন। মমতা বলেন, ‘বিজেপি প্রথমেই বিষয়টি আদালতে নিয়ে গিয়ে রাজ্য সরকারকে বিচারের সুযোগই দেয়নি।’ এটি তাঁর কাছে এটি অন্যায্য মনে হয়েছে, কারণ সরকারকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য যথাযথ সময় ও সুযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগের তীর ছোঁড়ার পাশাপশি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরি হারানো শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আমরা চাই না কোনও দুর্ঘটনা ঘটুক। যদি তা ঘটে এর দায়ও বিজেপি ও সিপিএমে’ তিনি শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘যখন বিপদ আসে, তখন কেউ না কেউ আপনাদের পাশে দাঁড়িয়ে রক্ষা করে।’ তিনি জানান, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে বঞ্চিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পাশে দাঁড়িয়েছে , তাঁদের মানসিকভাবে সহায়তা করার জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছে ।’
মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা জানি, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। আদালতের রায় আমাদের বিরুদ্ধে গেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা হতাশ হব না।’ তিনি আশ্বাস দেন যে, যে শিক্ষকরা বৈধভাবে চাকরি পেয়েছেন, তাদের প্রতি মানবিক আচরণ বজায় রাখবে রাজ্য সরকার। আমরা কি এটুকু মানবিকতা আশা করতে পারি না ? প্রশ্ন করে মমতা বলেছেন, ‘এক জন দোষীর জন্য সবাইকে কী ভাবে এক জায়গায় যুক্ত করা হল ? কীভাবে এতগুলো মানুষের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করা যায় ? সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় হাই কোর্টের রায়ের উপর স্থগিতাদেশ দিয়ে রেখেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের আর একজন প্রধান বিচারপতির থেকে কি আমরা এটুকু মানবিকতা আশা করতে পারি না ? একটা আত্মরক্ষার সুযোগ দেওয়া কি যেত না ? যতদিন না সমস্যা সমাধান হচ্ছে, আমরা বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়িয়ে আছি, থাকব।’ এপ্রসঙ্গে সম্প্রতি দিল্লির বিচারকের আবাস থেকে প্রাপ্ত বিপুল নগদ উদ্ধারের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তিনি বলেছেন, সেক্ষেত্রে যদি বিচারকের বদলিতেই দোষের শাস্তি হয়, তবে শিক্ষকদের প্রতি কেন অনমনীয় কোর্ট ?
তিনি আরো বলেছেন, ‘যারা বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁরা একটা ডিপ্রাইভড টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করেছেন জাস্টিস পাওয়ার জন্য। শিক্ষামন্ত্রীকে তাঁরা অনুরোধ করেছেন, সকলে মিলে একটা সভা করতে চান। আমি যদি সেখানে থাকি। মুখ্যসচিব, আইনজীবীরাও থাকবেন। আমি তাঁদের কথায় সাড়া দিয়ে ৭ তারিখ ইন্ডোর স্টেডিয়ামে যাব। দুপুর ১২টা ১৫ নাগাদ যাব। শুনতে কোনও আপত্তি নেই। বলব, ধৈর্য হারাবেন না। মানসিক চাপ নেবেন না। কোর্ট বলেছে, সকলকে আবেদন করতে, আবেদন করুন। প্রসেস যখন হবে আমরা তাড়াতাড়ি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’
❤ Support Us





