Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ২১, ২০২৫

ভিনরাজ্যে বাঙালি হেনস্তা রুখতে বিধানসভায় প্রস্তাব আনুক রাজ্য, বার্তা বামেদের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ভিনরাজ্যে বাঙালি হেনস্তা রুখতে বিধানসভায় প্রস্তাব আনুক রাজ্য, বার্তা বামেদের

ভিনিরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের হেনস্তা এবং সার্বিকভাবে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির উপর ‘আঘাত’-এর অভিযোগ এই মুহূর্তে বঙ্গরাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত, উজ্জ্বল চর্চা। একুশে জুলাইয়ের শহিদ দিবস মঞ্চ থেকে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি বাঙালি অস্মিতা বাঁচানোর লড়াইয়ে ‘ভাষা আন্দোলন’-এর ডাক দিয়েছেন। নিশানায় বিঁধেছেন বর্তমানে বিজেপি আর অতীতে সিপিএমের গণতন্ত্র নষ্ট করার ‘প্রচেষ্টা’র বিরুদ্ধে। ২১ জুলাইয়ের সমাবেশে মুখ্যমন্ত্রী যখন ভাষা আন্দোলনের কথা বলেন, তখনই প্রশ্ন ওঠে—এই ভাষার মর্যাদা কীভাবে রক্ষা হচ্ছে রাজ্যের বাস্তব নীতিনির্ধারণে?

বিগত কয়েক বছরে লক্ষ লক্ষ বাঙালি তরুণ-তরুণী পাড়ি দিয়েছেন রাজ্যের বাইরে। কেউ গুজরাট, কেউ কেরল, কেউ হরিয়ানা কিংবা অসম। উদ্দেশ্য একটাই—জীবিকা। কিন্তু সেই পথ শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ভাবেও এক রকম নির্বাসনের নামান্তর। নিজেদের রাজ্যে কাজের সুযোগ না থাকায়, অন্য রাজ্যে যাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই মুখোমুখি হচ্ছেন বঞ্চনা, বৈষম্য এমনকি নিপীড়নের। অথচ তাঁদের জন্য নেই কোনো আলাদা প্রশাসনিক পরিকাঠামো। যদিও ধর্মতলা থেকে মুখ্যমন্ত্রী ভিনরাজ্যে থাকা বাঙালি নাগরিকদের রাজ্যে ফিরে আসবার আহ্বান জানিয়েছেন, তবু প্রশ্ন থাকছে, দিল্লি, গুজরাট, রাজস্থান, ওড়িষা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র কিংবা কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালায় কেন বাংলার লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে, পরিজন-সজন ছেড়ে পড়ে আছেন? বাংলায় ফিরলে তাঁদের কর্মসংস্থান কি আগের মতোই হবে? শ্রমিক আইন মেনে তাঁদের মজুরি দেওয়া হবে? না কি তাঁরা পেটের টানে, একটু ভালো থাকার টানে ফের হারিয়ে যাবেন ভিন রাজ্যের জনসমুদ্রে!

আজ তৃণমূল কংগ্রেস যখন সারম্বরে ধর্মতলা চত্বরে শহিদ দিবস পালন করছে, তখন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন-মরনের প্রশ্নটি আরো একবার মনে করিয়ে দিয়েছেন রাজ্যসরকারকে। বক্তব্য তুলে ধরেছেন একটি বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রেক্ষিতে। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, সংবিধান নাগরিককে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে কাজ করার অধিকার দেয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেখানে অধিকার খর্ব হচ্ছে বারংবার—বিশেষত বাংলাভাষী গরিব খেটে খাওয়া মানুষের। অসমে কোচবিহারের বাসিন্দার হাতে সরকারি নোটিশ তুলে দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক নয়, সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণের দিকেও ইঙ্গিত করে বলে, মনে করছে বামফ্রন্ট।

বাংলা ভাষা বাঁচানোর প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী যখন ভাষা আন্দোলনের বার্তা দেন, তখন সেলিমের মতো বিরোধীরা প্রশ্ন তোলেন—এ রাজ্যের স্কুল-কলেজে বাংলা ভাষার পাঠক্রম কি সত্যিই যথাযথ সম্মান পাচ্ছে? বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা চাকরির পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে কেন? বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, আর সেই শিক্ষায় চাকরি বা জীবিকা মিলছে কতটা? যদি বাংলা ভাষা শুধুই আবেগের জায়গায় সীমাবদ্ধ হয়, তবে তা সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ে পরাস্ত হবে—এ আশঙ্কা বাড়ছে। রাজ্যের বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতিকেও আক্রমণের কৌশলে এনেছেন সিপিএম নেতা। তুলে ধরেছেন শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা, রাজ্যের চাকরিহীনতা ও শিক্ষার অধঃপতনের প্রসঙ্গ। তাঁর মতে, মুখ্যমন্ত্রী আজ ‘ভাষা আন্দোলন’-এর কথা বলছেন, কিন্তু বাংলা ভাষাকে শিক্ষা ও কর্মের মাধ্যম করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। বাংলায় পড়াশোনা করে চাকরি পাওয়া যায় না, যার ফলে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে রাজ্য ছাড়ছেন। এর দায় তৃণমূল সরকারের ব্যর্থ অর্থনৈতিক নীতির ওপরেই বর্তায়। সেলিমের কথায়, একটি ভাষা ও তার সংস্কৃতি তখনই টিকে থাকে, যখন তা জীবিকার সঙ্গে যুক্ত থাকে। যখন মাতৃভাষায় ভাষায় শিক্ষালাভ করেও মানুষ কাজ পান, সম্মান পান, আত্মবিশ্বাস পান। এই মুহূর্তে বাংলার শিক্ষিত, শ্রমজীবী, সৃজনশীল মানুষদের একটা বড় অংশ মনে করছেন—তাঁদের মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়ন হচ্ছে না নিজ রাজ্যে। ফলে বাধ্য হয়ে ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় সব কিছু ফেলে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, এ যাত্রা শুধু অর্থনৈতিক নয়, একটি ভাষা-পরিচয়ের ক্ষরণও। এই ক্ষরণের মধ্যেই ২১ জুলাই আসে, চলে যায়। সমাবেশ হয়, বক্তৃতা হয়, প্রতিশ্রুতিও শোনা যায়। কিন্তু যে কণ্ঠগুলি আজ বাংলা ভাষায় কথা বলতে গিয়েও কাজ হারাচ্ছে, যে পরিবারগুলি সন্তানকে বাংলা স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছে ভবিষ্যতের ভেবে—তাঁদের প্রশ্নের জবাব মেলে না কোনও বক্তৃতায়।

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হলে শুধু মঞ্চে নয়, বাস্তবে তাকে কাজে লাগাতে হবে। তাকে শিক্ষা, শিল্প, প্রশাসন ও অর্থনীতির কেন্দ্রস্থলে রাখতে হবে। ভাষা আন্দোলন শুধু আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, এক গভীর নীতিগত দায়। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কি পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তা বা বাঙলাভাষী নাগরিকদের উপর অত্যাচারের ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীদের চিঠি লিখেছেন? সংসদ বা বিধানসভায় কি কোনো বিশেষ প্রস্তাব আনা হয়েছে? লোকসভায় সোচ্চারে এসব কথা বলেছেন তৃণমূল সাংসদরা? তাঁর মতে, বাস্তব চিত্র হলো, এই রাজ্যের নাগরিকদের যেভাবে অসম বা গুজরাটে হেনস্থা করা হচ্ছে, তা সংবিধান পরিপন্থী হলেও রাজ্য সরকার কার্যত নীরব।

আজকের সভামঞ্চ থেকে, মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে সিপিএম শাসনের অতীত—ছাপ্পা ভোট, রিগিং, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ। তাঁর ভাষায়, তৃণমূল সেই অন্ধকার থেকে রাজ্যকে মুক্ত করেছে এবং শহীদ দিবস সেই লড়াইয়ের প্রতীক। তবে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্যে এখন ভোটাধিকার সংকুচিত হয়েছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চায়েত কিংবা কো-অপারেটিভ—সব নির্বাচনে এখন সন্ত্রাস, রিগিং এবং দলীয় আধিপত্য স্পষ্ট। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, গণতন্ত্র যদি সত্যিই অস্তিত্বহীন থাকত বাম আমলে, তাহলে মমতা নিজে কী করে বারবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন, কীভাবে সুব্রত মুখার্জি মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন? মহম্মদ সেলিম তৃণমূলের সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, যেখানে মমতা বলছেন সিপিএম কোটি কোটি টাকা খরচ করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, বাস্তব চিত্রটি একেবারে উল্টো। সেলিম বলেন, বিজেপির পরেই তৃণমূল সবচেয়ে বেশি খরচ করে এই মাধ্যমে। অথচ সিপিএমের প্রচার চলে কর্মী-সমর্থকদের স্বেচ্ছাশ্রমে, কখনো কখনো যাঁরা সরাসরি দলের সদস্য নন, কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, তাঁরাও স্বচ্ছায় এ কাজ করেন এবং তাঁদের বেশিরভাগ তরুণ প্রজন্মের শিক্ষিত যুবক-যুবতি।

তৃণমূলের ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সেলিম। তাঁর মতে, রাজনীতিতে সংকটে পড়লেই তৃণমূল ধর্মীয় আবহ তৈরি করে জনমত টানার চেষ্টা করে। জগন্নাথ মন্দিরের আদলে দুর্গাঙ্গনের ঘোষণা তারই এক নিদর্শন। তিনি ইঙ্গিত করেছেন, এভাবে ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসলে মমতা বিজেপির পথই অনুসরণ করছেন। অন্যদিকে, তৃণমূলের দাবি—এই সমাবেশ শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। ১৯৯৩ সালে যে ১৩ জন তরুণ ভোটার আইডি বাধ্যতামূলক করার দাবিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের স্মরণেই এই দিন পালন করা হয়। এই সমাবেশ তৃণমূলের মতে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক স্মারক দিন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!