- এই মুহূর্তে দে । শ
- ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬
প্রতীক উর প্রসঙ্গ, সাংবাদিক সম্মেলনে কী বললেন সেলিম ?
আলিমুদ্দিনে সিপিআইএমের রাজ্য কমিটির ২ দিনের টানা বৈঠক শেষ। সামনে বিধানসভা ভোট। দলের রণকৌশল, সংগঠন, জোট-সমীকরণ—সব কিছু নিয়েই আলোচনা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব ছাপিয়ে সাংবাদিক বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন ‘বিদ্রোহী’ প্রতীক উর রহমান। আর তাঁকে ঘিরেই আবেগে ভেসে গেলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। শুক্রবার সাংবাদিকদের সামনে সেলিমের মন্তব্য, ‘এই ধরনের কর্মীকে হারানো সন্তানের মতো কাউকে হারানোর সমান।’ কথার ভাঁজে স্পষ্ট ক্ষোভ আর বেদনা। তবে, একই সঙ্গে সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক ইঙ্গিত দিলেন, এখনই প্রতীক উর-এর কাছে সম্পর্কের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না দল।
সেলিমের দাবি, গত দেড়-দু-মাস ধরে প্রতীক উরের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে দলের অভ্যন্তরে। নিয়মমাফিক সেগুলি নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ কমিটিতে পাঠানো হয়। সেলিম জানান, অভিযোগ হাতে পাওয়ার পর তিনি নিজে বিষয়টি দেখভাল করার সিদ্ধান্ত নেন। আর তার পর থেকেই নাকি প্রাক্তন এসএফআই-এর রাজ্য সভাপতির সঙ্গে যোগাযোগের সেতু ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। সেলিমের বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমের সূত্রেই তিনি জানতে পারেন, প্রতীক উরের অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ছে। ‘আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেব। পার্টির সিদ্ধান্ত হলে জানানো হবে।’— বলেন তিনি। তবে, তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
প্রতীক উরের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে বলেও জানান সেলিম। যদিও বিষয়টি বৈঠকের মূল আলোচ্য ছিল না। তিনি জানান, ‘আমি দলের মধ্যে প্রস্তাব দিয়েছি। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের ইনভেস্ট করতে হয়।’ সিপিএমের তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলার স্বপ্নের কথাও স্মরণ করান—‘রাজ্য সম্পাদক হওয়ার সময় ভেবেছিলাম ৩০টা ঘোড়া থেকে ৩০০টা ঘোড়া বানাব।’ সেই প্রেক্ষিতেই প্রতীক উরের সরে দাঁড়ানোকে তিনি দেখছেন আঘাত হিসেবে। এ দিন একাধিক উপমা ব্যবহার করেন সেলিম। ‘মা যেমন সন্তানের মৃতদেহ আগলে রাখে, তেমন বেদনা হয়…’ আবার সতর্কবার্তাও শোনান—‘কেউ বাস-ট্রেন থেকে পড়ে গেলে হাত বাড়িয়ে দিতে হয়। কিন্তু কাউকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে যেন না ডুবে যাই, সেটা দেখতে হবে।’
প্রসঙ্গত, এসএফআইয়ের প্রাক্তন নেতা ও সিপিএম রাজ্য কমিটির সদস্য প্রতীক উর রহমান সম্প্রতি একাধিক সাক্ষাৎকারে দলের রাজ্য নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। দলের প্রাথমিক সদস্যপদ ও জেলা-রাজ্য কমিটির দায়িত্ব ছাড়তে চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন বলেও জানা গিয়েছে। সেই চিঠি প্রকাশ্যে চলে আসে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষের হাত ধরে, যা নিয়ে দলীয় অন্দরে ক্ষোভ বেড়েছে। এক সাক্ষাৎকারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে শ্রদ্ধা ও সম্মানের কথা বলেন প্রতীক উর। সেখান থেকেই জল্পনা, তাঁর রাজনৈতিক গন্তব্য কি তৃণমূল? যদিও এ পর্যন্ত সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলেননি তিনি। এই প্রেক্ষাপটে সেলিমের মন্তব্য, ‘প্রতীকের ব্র্যান্ড ভ্যালু সিপিএম থেকেই তৈরি হয়েছে।’ একই সঙ্গে তৃণমূল ও বিজেপিকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘ওদের নতুন প্রজন্ম ভাড়া করা, কেনা। আমাদের হোম গ্রোওন অর্গানিক লিডারশিপ রয়েছে।’ তাঁর অভিযোগ, দুর্নীতিতে জর্জরিত বলেই তৃণমূল সিপিএমের তরুণ মুখগুলিকে টানতে চাইছে।
প্রতীক উর-কে নিয়ে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নে খানিক রুষ্ট শোনায় সেলিমকে। বলেন, ‘আমি কারও শুনানির জন্য বসিনি। এখানে কেউ কোনো ফরিয়াদও করেনি।’ আবার বলেন, ‘কাক কান নিয়ে গিয়েছে? কানটা ধরে দেখুন আছে কিনা। উনি কোন দলে গিয়েছেন? আমি তো শুনিনি।’ লবির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘ভারতীয় সংবিধান লবি নিষিদ্ধ করেছে। আমেরিকায় আছে, আমাদের অফিসে নেই। আরএসএসের আছে।’ সিপিআইএম-এর রাজ্য কমিটির বৈঠক ছিল নির্বাচনের আগে শেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। সেলিম জানান, নির্বাচনী কৌশল কী ভাবে রাজ্যে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়েই মূল আলোচনা হয়েছে। সমদূরত্বের নীতি বজায় রেখে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিতও দেন তিনি।
দিল্লি-কেরল ‘লাইন’ বিতর্ক প্রসঙ্গে বলেন, ‘গত কয়েকটি নির্বাচনে ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে।’ পলিটব্যুরোর বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে জানান। সবশেষে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘বাংলাকে বাঁচাতে বামপন্থার পুনরুত্থান দরকার। খেটে খাওয়া মানুষের শ্রেণি সংগঠনকে এক করার লড়াই আমরা চালাচ্ছি।’ এ দিনের সম্মেলনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেন্টার গড়ে তোলার কথাও জানান সেলিম। এজেসি রোডে, প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনের কাছেই হবে সেই কেন্দ্র। সব মিলিয়ে, আবেগ, সতর্কতা, রাজনৈতিক কৌশল— সবই মিশে গেল এক সাংবাদিক বৈঠকে। প্রতীক উরকে ঘিরে জল্পনা এখনও কাটেনি। তিনি আদৌ দল ছাড়বেন, না কি মতভেদের মীমাংসা হবে অন্দরেই, তা সময়ই বলবে। তবে এ দিনের বার্তা স্পষ্ট, সিপিআইএম এখনই প্রকাশ্যে সম্পর্কের সেতু ভাঙতে চাইছে না, কিন্তু শৃঙ্খলার প্রশ্নেও আপসও করবে না।
❤ Support Us






