Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫

দেশে নাগরিকত্ব ত্যাগের হিড়িক, সংসদে ১৪ বছরের পরিসংখ্যান পেশ বিদেশমন্ত্রকের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
দেশে নাগরিকত্ব ত্যাগের হিড়িক, সংসদে ১৪ বছরের পরিসংখ্যান পেশ বিদেশমন্ত্রকের

ব্যাপক হারে দেশ ছাড়ছেন ভারতীয় নাগরিকরা, এমন আশঙ্কা আর অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু সংখ্যাটা যে এমন বিপুল, তা বোধহয় কেউই ভাবেননি। সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে পেশ করা বিদেশমন্ত্রকের তথ্যে চমকে উঠেছেন সকলেই। তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে প্রায় ৯ লাখ ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। তার মধ্যে ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছরই ২ লক্ষের বেশি মানুষ ভারতীয় পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়েছেন।

এস জয়শঙ্করের মন্ত্রক যে তথ্য দিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নাগরিকত্ব ত্যাগের হার ছিল প্রায় স্থির। ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ১ লক্ষ ২০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৪৫ হাজার মানুষের মধ্যেই এই সংখ্যা ঘোরাফেরা করেছে। কিন্তু সে ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে ২০২২ সালে। ওই বছর থেকেই নাগরিকত্ব ত্যাগের সংখ্যা হঠাৎ করে বেড়ে গিয়ে ২ লক্ষের গণ্ডি ছাড়ায়, যা পরবর্তী বছরগুলিতেও আর কমেনি। পরিসংখ্যান আরো জানাচ্ছে, ২০২০ থেকে ২০২৪—এই মাত্র পাঁচ বছরেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন ৯ লক্ষেরও বেশি ভারতীয়। কোভিড অতিমারির সময়ে প্রক্রিয়া কার্যত থমকে যাওয়ার পর, পরবর্তী বছরগুলিতে জমে থাকা আবেদন নিষ্পত্তির ফলে সংখ্যা হঠাৎ বেড়েছিল বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও, ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও সেই উচ্চ হার বজায় থাকায় বিষয়টি আর সাময়িক বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। ২০১১ থেকে ২০২৪—১৪ বছরে মোট ২০.৬ লক্ষ ভারতীয় নাগরিকত্ব ছেড়েছেন।

এই বিপুল নাগরিকত্ব ত্যাগের পিছনে কী কারণ, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি বিদেশমন্ত্রক। তাদের বক্তব্য, ‘অনেকেই বিদেশের সুযোগ-সুবিধা ও ব্যক্তিগত কারণেই ভারতের নাগরিকত্ব ত্যাগ করছেন।’ তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, সংখ্যার এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি বৃহত্তর কোনও প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান সামনে আসতেই ফের নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ‘ব্রেন ড্রেন’ তত্ত্ব। যে তত্ত্ব অনুযায়ী, উন্নত শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার খোঁজে দেশের মেধাবী ছাত্র-যুবদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। সত্তরের দশক থেকেই এই প্রবাহ চলছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সে স্রোত এখন আরো প্রশস্ত হচ্ছে।

আরেকটি কারণ, ভারত দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। অর্থাৎ, অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেই স্বয়ংক্রিয় ভাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব হারাতে হয়। বিপরীতে, আমেরিকা, কানাডা বা ব্রিটেনের মতো দেশ দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ দেয়। ফলে কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা বহু ভারতীয় পূর্ণ নাগরিক অধিকার পেতে সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য হন। নিয়ম অনুযায়ী, সে মুহূর্তেই তাঁরা আর ভারতীয় নাগরিক থাকেন না। এই বাধ্যবাধকতা নিয়ে সমাজমাধ্যমে একাধিক বার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী ভারতীয়দের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, ভারতীয় পরিচয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই আবেগতাড়িত নয়, বরং আইনি বাধ্যবাধকতার ফল। অনেকে লিখেছেন, ভোটাধিকার, সামাজিক সুরক্ষা, স্থায়ী বাসস্থান বা পেশাগত স্থিতিশীলতা—এই সুবিধাগুলি নাগরিকত্বের সঙ্গে জড়িত বলেই তাঁদের বাধ্য হয়ে ভারতীয় পাসপোর্ট জমা দিতে হয়েছে। ভারতের ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া কার্ড ভিসামুক্ত যাতায়াতের সুবিধা দিলেও রাজনৈতিক অধিকার দেয় না। ফলে বিদেশে পরিবার নিয়ে স্থায়ী ভাবে থিতু হওয়া মানুষের কাছে নাগরিকত্ব ত্যাগ অনেক সময় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান দেশত্যাগের চেহারাও বদলেছে। এক সময় যেখানে মূলত শ্রমিক বা নির্দিষ্ট কিছু পেশার মানুষ দেশ ছাড়তেন, এখন সে তালিকায় রয়েছেন প্রযুক্তি ক্ষেত্রের পেশাদার, উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী, এমনকি উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানরাও। উন্নত নাগরিক পরিকাঠামো, পরিষ্কার পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং তুলনামূলক ভাবে পূর্বানুমেয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার টান তাঁদের অনেককেই বিদেশে স্থায়ী হতে উৎসাহিত করছে। এ দিকে, বৈপরীত্যের ছবি অন্য জায়গায়। বিশ্বব্যাঙ্কের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারত বিশ্বের সর্বাধিক রেমিট্যান্স পাওয়া দেশ, যার পরিমাণ প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলার। তবু প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের নাগরিকত্ব ত্যাগ প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারকদের অস্বস্তিতে ফেলছে। কারণ, এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার মান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে এক গভীর অসন্তোষের বার্তা। আশঙ্কাজনকভাবে ২০১৪ সালের পর থেকে প্রায় ২৩ হাজার ভারতীয় কোটিপতিও দেশ ছেড়েছেন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অভিবাসী-উৎস দেশ। ২০১৯ সালেই বিদেশে থাকা ভারতীয়ের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৫ লক্ষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় অভিবাসীদের মধ্যে ৮১ শতাংশেরই স্নাতক বা তার ঊর্ধ্বতন ডিগ্রি রয়েছে—যা সে দেশের গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। ছকটা প্রায় একই রকম— বিদেশে উচ্চশিক্ষা, তার পরে দক্ষ চাকরি, স্থায়ী বসবাস এবং শেষে নাগরিকত্ব। অনেকের বক্তব্য, বিদেশে একই কাজের জন্য বেতন বেশি, কর্মপরিবেশ উন্নত এবং জীবনযাত্রার মান তুলনামূলক ভাবে ভালো। ওয়াকিবহালদের মতে, দেশের মধ্যেই যদি আন্তর্জাতিক মানের কাজের সুযোগ, উন্নত নাগরিক পরিষেবা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে নাগরিকত্ব ত্যাগের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা আগামী দিনে আরো তীব্র আকার নিতে পারে। সংসদে পেশ হওয়া পরিসংখ্যান তাই শুধুই সংখ্যা নয়, বরং একটি সময়ের সামাজিক বাস্তবতার ভয়াবহ দলিল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!