- এই মুহূর্তে দে । শ
- ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬
আবগারি দুর্নীতি মামলায় বেকসুর খালাস কেজরীওয়াল-সিসৌদিয়া। তথ্য-প্রমাণ দিতে ব্যর্থ সিবিআই, তিরস্কার আদালতের
দিল্লির আবগারি দুর্নীতি ঘিরে বহুচর্চিত মামলায় নাটকীয় মোড়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়াল ও মণীশ সিসৌদিয়াকে বেকসুর খালাসের নির্দেশ দিল দিল্লির নিম্ন আদালত। একই সঙ্গে এই মামলায় অভিযুক্ত আরও ২১ জনকেও রেহাই দেওয়া হয়েছে। শুক্রবারের শুনানিতে, আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি সিবিআই। দীর্ঘ তদন্ত, গ্রেফতারি, জেলবাস এবং রাজনৈতিক চাপানউতোরের পর এ রায় কার্যত তদন্তকারী সংস্থার দাবিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল।
আদালত জানায়, গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে জোরালো ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ অপরিহার্য। কেজরিওয়ালের ক্ষেত্রে সিবিআই অভিযোগ তুলেছিল, আবগারি নীতির কথিত দুর্নীতিতে তিনিই ছিলেন ‘মূল চক্রান্তকারী’। কিন্তু বিচারকের পর্যবেক্ষণ, সে দাবির সপক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেশ করা যায়নি। নিম্ন আদালতের বিচারক জিতেন্দ্র সিংহ সিবিআইকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেন, অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ হাজির করতে না পারলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর জনসাধারণের আস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ে। আদালতের মতে, শুধুমাত্র অনুমাননির্ভর বা ব্যাখ্যাভিত্তিক অভিযোগে কাউকে কেন্দ্রীয় ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
মণীশ সিসৌদিয়ার ক্ষেত্রেও আদালতের অবস্থান স্পষ্ট। রায়ে বলা হয়েছে, তদন্তকারী সংস্থা এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ পেশ করতে পারেনি, যা থেকে তাঁর অপরাধমূলক মানসিকতা বা বেআইনি ভূমিকার ইঙ্গিত মেলে। নথিপত্র, দপ্তরীয় নোট এবং সাক্ষ্য একত্রে বিচার করলে প্রশাসনিক আলোচনাপ্রক্রিয়ার চিত্রই সামনে আসে, অপরাধমূলক যোগসাজশের নয়। আদালত আরও উল্লেখ করে, আবগারি নীতি প্রণয়নের সময় একাধিক স্তরে পরামর্শ ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার প্রমাণ রয়েছে, যা সিদ্ধান্তগ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।
কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত। কেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত বা নথি মামলার রেকর্ডে প্রতিফলিত হল না, সে বিষয়ে সিবিআইয়ের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ৩ জন আইন বিশেষজ্ঞের মতামতকে কী ভিত্তিতে নিজেদের পক্ষে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা নিয়েও আদালত সংশয় প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি অভিযোগপক্ষের ব্যবহৃত ‘সাউথ গ্রুপ’ শব্দবন্ধের স্পষ্ট সংজ্ঞা ও প্রমাণভিত্তি নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে। বিচারকের পর্যবেক্ষণ, মামলার উপস্থাপিত বয়ানে একাধিক অসংগতি রয়েছে এবং কথিত বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বিচারিক পরীক্ষায় টেকেনি।
প্রসঙ্গত, এই মামলার জেরে দীর্ঘ সময় জেলবন্দি থাকতে হয়েছে আম আদমি পার্টির দুই শীর্ষ নেতাকেই। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার হন সিসৌদিয়া। প্রায় ১৭ মাস কারাবাসের পর ২০২৪ সালের আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পান তিনি। কেজরিওয়ালকে গ্রেফতার করা হয় ২০২৪ সালের মার্চে, মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকাকালীনই। সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর জামিন মঞ্জুর করে। দীর্ঘ জেলবাস, টানা জেরা এবং রাজনৈতিক বিতর্ক; সব মিলিয়ে আবগারি নীতি মামলা গত দুই বছরে দিল্লির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। রায় ঘোষণার পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান কেজরিওয়াল। বলেন, ‘সত্যের জয় হয়েছে।’ তিনি এই মামলাকে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বড়ো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেন এবং অভিযোগ করেন, দিল্লিতে আম আদমি পার্টিকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে জেলে পাঠানো হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন কর্মরত মুখ্যমন্ত্রীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মাসের পর মাস বন্দি রাখা হয়েছিল, উপমুখ্যমন্ত্রীও প্রায় ২ বছর জেলে ছিলেন। ক্ষমতার রাজনীতিতে দেশ ও সংবিধানকে টেনে আনা উচিত নয়।’
উল্লেখ্য, মামলার সূত্রপাত ২০২২ সালের জুলাই মাসে। দিল্লির মুখ্যসচিবের একটি রিপোর্টে আবগারি নীতিতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তার ভিত্তিতে তদন্তের সুপারিশ করা হয়। তদন্তে নেমে সিবিআই ও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট অভিযোগ তোলে যে, ২০২১-২২ সালের আবগারি নীতির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি মদ ব্যবসায়ীকে অস্বাভাবিক সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। বেসরকারি লাভের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ শতাংশ করার সিদ্ধান্তকে ঘিরেই মূল বিতর্ক। অভিযোগ ছিল, এর বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। তবে আদালতের সাম্প্রতিক রায়ে সে অভিযোগ প্রমাণের পর্যায়ে পৌঁছয়নি বলেই স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আবগারি দুর্নীতি মামলা দিল্লির নির্বাচনী রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। বিরোধীদের তোপ, শাসকদলের পাল্টা অভিযোগ, সব মিলিয়ে বদলে গেছিল দিল্লির মসনদ জয়ের সমীকরণ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আম আদমি পার্টির ভরাডুবি এবং বিজেপির উত্থানের পেছনেও এ মামলার ছায়া দেখেছেন অনেকে। তবে আদালতের এই রায়ে আপাতত স্বস্তি কেজরিওয়াল-সিসৌদিয়া শিবিরে। তদন্ত, অভিযোগ এবং দীর্ঘ কারাবাসের পর বিচারিক অব্যাহতি, দিল্লির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
❤ Support Us







