Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জানুয়ারি ১, ২০২৬

শাহী টনিকে চটজলদি কাজ, নির্বাসন কাটিয়ে ফের ‘মাঠে’ দিলীপ। ‘দলের প্রয়োজনে সব সময় প্রস্তুত’— বললেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
শাহী টনিকে চটজলদি কাজ, নির্বাসন কাটিয়ে ফের ‘মাঠে’ দিলীপ। ‘দলের প্রয়োজনে সব সময় প্রস্তুত’— বললেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি

প্রায় ১ বছর দলীয় কর্মসূচির বাইরে থাকার পর ফের বঙ্গ বিজেপির রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরছেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর থেকেই তাঁর সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। বৃহস্পতিবার রাজ্য বিজেপি দফতরে শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার আলোচনার পর, সাংবাদিক বৈঠকে প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, দল ডাকলে তিনি সব সময়ই প্রস্তুত। প্রার্থী হওয়া থেকে শুরু করে সংগঠনের যে কোনো দায়িত্ব, সবই নিতে রাজি তিনি।

এদিন, সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে দিলীপ ঘোষ বললেন, ‘পার্টির যখন আমাকে প্রয়োজন, আমি আছি। দল বললে প্রার্থী হব। রাজ্য সভাপতির কথা অনুযায়ী চলব।’ গেরুয়া শিবির সূত্রে খবর,  বুধবার সন্ধ্যায় সল্টলেকে অমিত শাহের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে নির্বাচন ও সংগঠনের নানা বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন তিনি। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা ওই বৈঠকে দিলীপ ঘোষকে সাংগঠনিক ভাবে কী ভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পথসভা, মিছিল ও জনসভায় তাঁকে আরও সক্রিয় ভাবে ব্যবহার করার বিষয়েও কথা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

বুধবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতের পর বৃহস্পতিবারই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন দিলীপ। এদিন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলনে তৃণমূল কংগ্রেসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি।

বঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘দিলীপ ঘোষ বাড়িতে বসে থাকার লোক নন। নির্বাচনের আগে তাঁকে সর্বত্রই দেখা যাবে।’ তাঁর কথায় স্পষ্ট ইঙ্গিত, আসন্ন বিধানসভা ভোটে দিলীপ ঘোষকে ‘মাঠ জুড়ে খেলানো’ হবে। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির কোনো বড়ো কর্মসূচিতে দিলীপ ঘোষকে দেখা যায়নি। এমনকি দলীয় অনুষ্ঠানে ডাকও পাচ্ছিলেন না তিনি। নিজের মতো করে কিছু সভা করলেও, সেগুলির সঙ্গে দলের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিল না। তবে ভোটের বাজারে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে বলেই ইঙ্গিত মিলছে। জানুয়ারির শুরুতেই বারাকপুর ও কোচবিহারে দিলীপ ঘোষের সভা রয়েছে, যা রাজ্য নেতৃত্বের অনুমোদন পেয়েছে বলে খবর। পাশাপাশি, ১৩ জানুয়ারি দুর্গাপুরে শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে যৌথ সভাতেও থাকবেন তিনি।

সাংবাদিক বৈঠকে দিলীপ ঘোষ জানান, বঙ্গে এসে অমিত শাহ আলাদা করে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। দিলীপ জানিয়েছেন, ‘ভেবেছিলাম দলে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু অমিত শাহজি আমায় ডেকে বললেন, লেগে পড়ুন। আমি বলেছি, আমি তো লেগেই আছি। কাজটা দিতে হবে।’ ওই বৈঠকেই নির্বাচনী প্রস্তুতি ও সংগঠন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। যদিও এখনো নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়নি। বিধানসভা ভোটে প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গেও নিজের আগ্রহের কথা লুকোননি প্রাক্তন সাংসদ। খড়্গপুর থেকেই লড়তে চান বলে স্পষ্ট জানান তিনি। ‘খড়্গপুরের সঙ্গে আমার আবেগ জড়িত। সেটাই আমার পছন্দের আসন। অন্য জায়গা থেকে লড়তে হয়েছিল, তার ফল কী হয়েছে, পার্টি বুঝেছে।’ মন্তব্য দিলীপের।

দলে আদি-নব্য দ্বন্দ্ব রয়েছে কি না, এ প্রশ্নের কৌশলী উত্তর দিয়ে দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘আদি-নব্য বলে কিছু নেই। নতুন লোক এলে তাঁদের বিজেপির সংস্কৃতি শিখতে হয়। অনেকেই সেটা করছেন।’ নব্য নেতারা তাঁকে বুঝতে পারছেন কি না, এ প্রশ্নে তাঁর সাফ জবাব, ‘পার্টি আমাকে বুঝলেই হল। কে বুঝল আর কে বুঝল না, সেটা বোঝানো আমার দায়িত্ব নয়।’ অতীতে দলের কর্মীদের একাংশের বিক্ষোভ প্রসঙ্গেও মুখ খোলেন তিনি। বলেন, ‘আমাকে পার্টির কর্মীরা বিক্ষোভ দেখায়নি। বাইরে থেকে ঢুকে আসা কিছু লোক পুরনো অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। কখন কাকে কালো পতাকা দেখাতে হয়, সেটা তাঁরা ভুলে যান।’

এ দিন ‘এসআইআর’ ইস্যুতেও তৃণমূলকে নিশানা করেন দিলীপ ঘোষ। তাঁর মন্তব্য, ‘এসআইআর-এর জন্য তৃণমূলে আগুন লেগে গিয়েছে। যদি এক কোটি মানুষের নাম বাদ যায়, তাহলে তৃণমূল কোথায় থাকবে?’ এদিকে দিলীপ ঘোষের প্রত্যাবর্তন নিয়ে কটাক্ষ করেছে তৃণমূল। তৃণমূল নেতা জয়প্রকাশ মজুমদারের দাবি, বিজেপি এখন আইসিইউতে রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘দলটা মুমূর্ষু। তাই বিশেষ ডাক্তার হিসেবে দিলীপ ঘোষকে আনা হচ্ছে। অথচ তাঁকে তো দল থেকে প্রায় সরিয়েই দেওয়া হয়েছে।’ যদিও বিজেপির পাল্টা বক্তব্য, ছাব্বিশের আগে সংগঠনকে চাঙ্গা করতেই শীর্ষ নেতৃত্বের পরামর্শ মেনেই অভিজ্ঞ নেতাদের ফের মাঠে নামানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে, শাহী বৈঠকের পর আবার স্বমেজাজে ফিরছেন বঙ্গ বিজেপির বেবাক নেতা।

উল্লেখ্য, বঙ্গ বিজেপির ইতিহাসে দিলীপ ঘোষের রাজ্য সভাপতি থাকার সময়কাল আলাদা করে চিহ্নিত হয়ে আছে। ২০১৫ সালে দিলীপ ঘোষ যখন রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব নেন, তখন বাংলায় বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি ছিল সীমিত। লোকসভাতেও বিজেপি ছিল প্রান্তিক শক্তি। সেই পরিস্থিতিতে ‘সংগঠন আগে, ভোট পরে’—এই নীতিতেই পথ চলা শুরু করেন দিলীপ ঘোষ। বুথ স্তর থেকে সংগঠন গড়ে তোলাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। ২০১৫ থেকে ২০২১, ওই সময়েই বাংলায় বিজেপির সংগঠনগত বিস্তার, রাজনৈতিক উপস্থিতি এবং নির্বাচনী সাফল্যের সবচেয়ে বড়ো উত্থান দেখা গিয়েছিল। দিলীপ ঘোষের হাত ধরেই দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থায় থাকা গেরুয়া শিবির প্রথম বার রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলির কাতারে উঠে আসে, এ কথা দলের অন্দরেও অস্বীকার করেন না অনেকেই। দিলীপ-পর্বে বিজেপির সংগঠনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে গ্রামবাংলায়। আরএসএস ঘরানার সাংগঠনিক কৌশল কাজে লাগিয়ে জেলার পর জেলা ঘুরে কর্মী তৈরি, বুথ কমিটি গঠন এবং স্থানীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলার উপর জোর দেন তিনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সময়েই প্রথম বার তৃণমূলের ‘অপরাজেয়’ বলে পরিচিত বহু এলাকায় বিজেপির সংগঠনের ভিত শক্ত হয়।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন ছিল দিলীপ ঘোষের সভাপতিত্বকালের সবচেয়ে বড় সাফল্য। ওই নির্বাচনে বাংলায় বিজেপি ১৮টি আসনে জয় পায়। উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিজেপির অভূতপূর্ব ফল রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেয়। দিলীপ ঘোষের আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক ভাষা ও রাজপথের উপস্থিতি দলের কর্মীদের মধ্যে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন ছিল দিলীপ ঘোষের সভাপতিত্বকালের শেষ বড়ো পরীক্ষা। ওই নির্বাচনে বিজেপি ৭৭টি আসনে জয় পায়, যা বাংলায় বিজেপির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যদিও ক্ষমতায় আসা সম্ভব হয়নি, তবু প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিজেপির উত্থান ঘটে সে সময়েই। তবে এ পর্বেই দলের অন্দরে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে একাধিক তৃণমূল নেতা বিজেপিতে যোগ দেন। নতুন মুখদের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয় পুরনো সংগঠকদের একাংশকে। এই প্রেক্ষাপটেই দিলীপ ঘোষের সঙ্গে দলের দূরত্ব বাড়তে শুরু করে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। ২০২১ সালের পর রাজ্য সভাপতি পদ থেকে সরে যান দিলীপ ঘোষ। তাঁর জায়গায় নতুন নেতৃত্ব আসে। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের আগে অভিজ্ঞ এই নেতার সংগঠনিক অভিজ্ঞতাকেই ফের কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব, এমনটাই মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!