- এই মুহূর্তে দে । শ
- ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫
সংবিগ্ন পাখিকূল ! বন্য পাখিদের জন্য প্রজাতি-নির্ভর কোনো সংরক্ষণ পরিকল্পনা নেই কেন্দ্রের
বৈচিত্র্যময় ভূগোল, জলাভূমি, অরণ্য এবং উপকূলবর্তী পরিবেশ, সব মিলিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির, বিপন্ন, লুপ্তপ্রায় পাখিদের আশ্রয়ের ঠিকানা ভারত। এখানে হাজারো বন্যপাখির প্রজাতির আবাস। শীতে আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও সাইবেরিয়া থেকে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী পাখি এসে ঠেকে স্বাভাবিক পরিবেশে। হিমালয়ের দক্ষিণে হাজারো জলাভূমি ও সমতলে। অনেক প্রজাতি কেবল শীতকালে আসে, গ্রীষ্মের শুরুতে আবার ফিরে যায় উৎসস্থলে। পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ঝাড়খণ্ড, কেরালা, রাজস্থান ও উত্তর‑পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি পাখির সংখ্যা পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নানা সময়ে পক্ষীপ্রেমিদের তরফে, পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের তরফে অভিযোগ ওঠে, দূষণ, প্রকৃতি ধ্বংস, শিকার ইত্যাদি কারণে দেশে বন্য পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, সরকার সব দেখেও পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাঁদের আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার প্রমাণ মিলল। বন্য পাখি, বিশেষত ভারতীয় রোলার সহ অন্যান্য প্রজাতির দুর্লভ পাখিদের সংরক্ষণে আলাদা কোনো প্রজাতি-নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই; সংসদে এমনটাই জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব।
এদিন, বিজেপি সাংসদ ডা. কে. লক্ষ্মণের প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ‘বন্য পাখিগুলি বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন অনুযায়ী সুরক্ষিত। শিকার রোধ, অবৈধ বাণিজ্য-এর বিরুদ্ধে এবং পশুপাখিদের বাসস্থান রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের নানান পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে নির্দিষ্ট করে কোনো পাখি প্রজাতির জন্য আলাদা কার্যকরী সংরক্ষণ পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, বন্য পাখি রক্ষায় মূল ভূমিকা রাজ্য সরকারগুলির। পাখি সংরক্ষণে আইনগত সুরক্ষা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর করতে রাজ্য প্রশাসন, বন বিভাগ ও স্থানীয় স্তরের সহায়তা অপরিহার্য।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গ্রেট ইন্ডিয়ান বাস্টার্ড সংরক্ষণের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ নিয়েও মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, গুজরাটসহ কয়েকটি রাজ্যে বাস্টার্ডের বেঁচে থাকার জন্য জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষত রাজস্থান এবং গুজরাটে প্রজনন কেন্দ্র চালু করে প্রজাতির সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাসল্যান্ড বা ঘাসস্থল পাখি ও বাস্টার্ড প্রজাতিগুলোর ক্ষেত্রে বাসস্থান হারানো এবং শিকারই প্রধান সমস্যা। তাই সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগ মিলিয়ে শুধু সুরক্ষা আইনের উপর ভর না দিয়ে ‘জমি-ভিত্তিক’ কর্মসূচি নেওয়া উচিত। যদিও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রজাতি-নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই, তবুও কিছু উদ্যোগ ইতোমধ্যেই চলমান রয়েছে। অসমের ভালচার প্রজাতির শকুন বা হিউম্ব্যাক্ড এবং স্লেন্ডার-বিল্ড ভালচার রক্ষায় ক্যাপটিভ-ব্রিডিং কেন্দ্র থেকে ৩৫টি ‘সংকটাপন্ন’ ভালচারকে কাজিরাঙ্গা ন্যাশনাল পার্কে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা প্রজাতি সংরক্ষণে একটি সফল উদ্যোগ মনে করা হচ্ছে। ঝাড়খণ্ডে প্রথমবার ‘শকুন সংরক্ষণ ও প্রজনন কেন্দ্র’ তৈরি হচ্ছে, যা শকুন প্রজাতির সংখ্যা বাড়াতে সহায়তা করবে বলে আশাবাদী পক্ষী বিশেষজ্ঞরা। ভারতে চলমান উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, সাধারণ পাখিদের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কোনো বিশেষ কর্মসূচী না থাকায় সমস্যার সম্মুখীন হতেই হয়, তবুও রাজ্যের প্রশাসনিক স্তর, বনবিভাগ ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো বন্য পাখি সংরক্ষণে নিরলস কাজ করে চলেছে।
ভারতে বন্য পাখি শিকার ও অবৈধ বাণিজ্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন, ১৯৭২-তে পাখিদের সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাখি শিকার, বাণিজ্য এবং পরিবহন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন আছে, বাস্তবে অবৈধ বাজার ও শিকারের ঘটনা এখনো পূর্ণমাত্রায় আছে। বিভিন্ন রাজ্যে, বিভিন্ন সময়ে পাখি পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান এবং বাজেয়াপ্তির উদাহরণই তা প্রমাণ করে। সম্প্রতি, দিল্লির জামা মসজিদ এলাকায় অবস্থিত কাবুতর মার্কেট থেকে পুলিশ ও বন বিভাগ বিভিন্ন প্রজাতির প্যারাকিট, মুনিয়া এবং হিল ময়না-সহ ১৭০০টিরও বেশি পাখিকে উদ্ধার করেছিল। কয়েকদিন আগেই, পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলায় শতাধিক বন্যপ্রাণী ও পাখি হত্যা করার অভিযোগে ৩০ জনকে আটক করা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ১৭৯০-এর দশক পর্যন্ত ভারতের উত্তর-পশ্চিম বাজারগুলোতে অবৈধভাবে প্রায় ২৫০টি পাখি প্রজাতির ৬৪,৫০০টিরও বেশি পাখি অবৈধভাবে বিক্রি হয়েছিল, যা প্রমাণ করে দীর্ঘদিন ধরেই এই ব্যবসা চলে আসছে। অপরদিকে নাগপুরের লাকাডগঞ্জ এলাকায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অবৈধ পাখি ও প্রাণী বাজার প্রতি রবিবার সকালে চলছে। এখানে পাকিস্তি, প্যারাকিট, টার্টল সহ বিভিন্ন প্রজাতি আনা হচ্ছে ও বিক্রি করা হচ্ছে, এমন অভিযোগ এনেছেন পশুকল্যাণ সংস্থাগুলি। বছর উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে একটি বাস থেকে ২৮টি লাইভ প্যারাকিট উদ্ধার হয়। এ ধরনের ঘটনা শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক স্তরেও পাখি পাচার করা হয়। চেন্নাই বিমানবন্দরে মালয়েশিয়া থেকে আসা বিমানে ১০টি দুর্লভ ও বিপন্ন প্রজাতির ‘বালি স্টার্লিং’ বা বালি মায়নাস পাখি ছদ্ম পলিথিনের ভাঁজে লুকিয়ে নিয়ে আসার সময় কাস্টমস ও বন দফতরের কর্মকর্তারা তাদের জব্দ করেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
পাখিদের সংরক্ষণ সংক্রান্ত সরকারি উদ্যোগ ও সমীক্ষায় কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল দেখা গেছে। বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো, বনদপ্তর, কাস্টমস, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পাচার প্রতিরোধে কাজ করছে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ ও কমিউনিটি আউটরিচ চালাচ্ছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত মোট ২,৭০১টি বন্যপ্রাণী অপরাধ মামলার তথ্য সরকারি দিকে থেকে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ ও হারিয়ানা তুলনামূলকভাবে বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু সংরক্ষণ আইনের আওতায় রাখা যথেষ্ট নয়। পাখি সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পিত গবেষণা, বাসস্থান রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ জরুরি। বিশেষত মিগ্রেটরি বা পরিযায়ী পাখিদের সংখ্যা কমছে এমন ক্ষেত্রে জলাভূমি, বনায়ন ও অরণ্য পরিবেশকে স্বাভাবিকভাবে রাখতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘প্রজাতি যদি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তাহলে তার জন্য আলাদা পরিকল্পনা না থাকলে কার্যকর ফল পাওয়া কঠিন। কেন্দ্র ও রাজ্য মিলিয়ে একত্রে বহু স্তরীয় উদ্যোগ নিতে হবে।’ তবে, পাখি সংরক্ষণে বন বিভাগের লোকবল সংকটও বড়ো বাধা। কিছুমাত্র হাওরে যথাযথ নজরদারি না থাকায় শিকারীরা সহজেই পাখি শিকার চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে, এমনকি হাকালুকি হাওর সহ অন্যান্য জলাভূমিতে পাঠানো পর্যটন প্রচারে পাখিদের নিরাপত্তা বিষয়টি কম গুরুত্ব পেয়েছে বলে পরিবেশ কর্মীরা বলেছেন।
উল্লেখ্য, কোভিড পরবর্তী সময়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় উদ্যোগে বিভিন্ন পাখি গণনা ও সমীক্ষা চালানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তামিলনাড়ুর ২০২৫ পাখি গণনা অনুসারে সেখানে ৫.৫২ লাখ জলাভূমির পাখি চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ১,১৩,৬০৬ জন ছিল পরিযায়ী পাখি। মোট ৩৯৭টি প্রজাতির জলাভূমি পাখি এবং ৪০১টি স্থলভাগের পাখি সনাক্ত হয়েছে। ঝাড়খণ্ডের ১৪ জেলার ১৮১টি পাখি প্রজাতি সনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯টি প্রজাতি ‘সংকটাপন্ন’ বলে বিবেচিত হয়, যেমন এশিয়ান উলনি‑নেকড স্টর্ক, ফের্রুগিনাস ডাক, ও ফুলভাস হুইসলিং ডাক। বর্তমানে, ভারতে আনুমানিক ১৩০০-এরও বেশি বন্য পাখির প্রজাতি রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেরই সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সংরক্ষণ রিপোর্টে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞ ও সংরক্ষণী সংস্থা ‘স্টেট অব ইন্ডিয়াস বার্ডস’ –এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা গেছে, দেশে প্রায় ১৭৮টি পাখি প্রজাতিকে উচ্চ সংরক্ষণের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে, যাদের সংখ্যা দীর্ঘমেয়াদে কমে যাচ্ছে বলে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে রয়েছে এমন প্রজাতিও যাদের আগে ‘সহজ’ মনে করা হতো। যেমন, ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার’–এর ‘লাল তালিকা’য় ঢুকে পড়েছে ভারতীয় রোলার বা ‘নীলকন্ঠ’। গত ১২ বছরে এই পাখির সংখ্যা প্রায় ৩০% কমে গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যে উঠে এসেছে। পরিবেশকর্মীরা আরো একবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পাখি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, তারা বীজ বিকাশ, পরাগায়ণ এবং খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষায় ভূমিকা রাখে। তাই পাখিদের সংখ্যা হ্রাস পেলে সেটা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারানোর বিষয় নয়, সামগ্রিকভাবে জীববৈচিত্র্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। এমন পরিস্থিতিতে, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা একত্রে পাখি সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদী নীতি, বাড়তি নজরদারি, পরিবেশ শিক্ষা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ অবিলম্বে জোরদার করতে হবে।
❤ Support Us






