- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- নভেম্বর ২৫, ২০২৫
শান্তি প্রস্তাব না পক্ষপাতিত্ব, দ্বিধায় ইউরোপ । ট্রাম্পের ২৮ দফায় কীসের ইঙ্গিত ?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর নামে কিয়েভকে পাঠানো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২৮ দফা শান্তি প্রস্তাব ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতির জগত অস্থির। স্বাধীনতা ও আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কি ইউক্রেন সব শর্ত মেনে নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পশ্চিমের গণমাধ্যমের পাশাপাশি মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনেও। মার্কিন প্রস্তাবিত খসড়া থেকেই স্পষ্ট যে, এটি মূলত রাশিয়াকে সুবিধাজনক অবস্থান দেওয়ার লক্ষ্যে তৈরি। শীর্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব ‘খণ্ডিত’ ইউক্রেন তৈরি করতে পারে।
নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে মার্কিন আর্মি সচিব ড্যান ড্রিসকল কিয়েভে পৌঁছান। সেখানে তিনি ট্রাম্পের তৈরি ২৮ দফা প্রস্তাব নিয়ে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় বসেন। তবে কিয়েভের শীর্ষ নেতৃত্ব শর্তগুলি চূড়ান্তভাবে মানতে রাজি হননি। ফলে ট্রাম্প আবারও কিয়েভকে খোঁচা দেন, এবং তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য পশ্চিমা নেতৃত্বের চাপ অপরিহার্য। ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, শান্তি প্রস্তাবের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হল রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়া, দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ককে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা। এই তিনটি অঞ্চলে রাশিয়ার প্রাধান্য বজায় থাকবেই। ক্রিমিয়া ২০১৪ সালে পুতিনের সামরিক অভিযানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, আর দোনেৎস্ক ও লুহানস্কে কিয়েভের নিয়ন্ত্রণ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলা যুদ্ধে হারায়। এ অঞ্চলে প্রায় সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে কিয়েভ বাহিনী পুনরায় দখল করতে পারেনি। ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, খেরসন এবং জাপোরিজিয়ারও একাংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সেখানে তৈরি হবে একটি স্থিতিশীল সীমারেখা। অর্থাৎ, যুদ্ধবিধ্বস্ত পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার প্রাধান্য নিশ্চিত হবে।
শান্তি সমঝোতার আরেকটি শর্ত অনুযায়ী, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী সর্বাধিক ৬ লাখ পর্যন্ত সীমিত থাকবে এবং নেটোর কোনো সৈনিক দেশের মাটিতে মোতায়েন করা যাবে না। যদিও ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন যে, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হবে না, যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলে যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভকে নিরাপত্তা আশ্বাস দেবে। নেটোর বিমানবাহিনী থাকবেই, তবে দেশের ভিতরে নয়, প্রতিবেশী পোল্যান্ডে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ দেওয়া হলেও তারা নেটোর অংশ হতে পারবে না। কৃষ্ণ সাগরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে থাকবে। ট্রাম্প যুদ্ধ থামানোর যুক্তি তুলে ধরতে বলেছেন, শীতের আগেই কিয়েভের জ্বালানি কেন্দ্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত এক মাসে প্রায় ২৫ হাজার সৈনিক নিহত হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে ৭ থেকে ৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত ধ্বংস আর কখনো হয়নি। তিনি জানান, যুদ্ধ চলতে দিলে মানবিক বিপর্যয় বাড়বে, তাই কিয়েভকে শান্তিপ্রস্তাব মানতেই হবে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ইঙ্গিত, প্রস্তাব না মানলে অস্ত্র, গোলাবারুদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
জেলেনস্কি এ প্রস্তাবের পরপরই জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি ইউক্রেন। আত্মসম্মান হারানো বা মার্কিন বন্ধুত্ব— এই কঠিন বিকল্পে আত্মসম্মান বেছে নেব আমরা। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি তিনি, এখনো করবেন না। কিয়েভ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে এবং রাফাল যুদ্ধবিমান সহ আধুনিক প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ট্রাম্প ইউক্রেনের পক্ষ থেকে এফ-৩৫ লাইটনিং টু চুক্তি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনও শান্তিপ্রস্তাবের প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি আলোচনা করার জন্য ‘ভালো ভিত্তি’ হতে পারে। তবে পুরো চুক্তি মেনে নেবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি। পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই যোগাযোগ শুরু করেছে, কিন্তু কিয়েভের অগ্রাধিকার বজায় রেখে পুরো প্রক্রিয়াটি জটিল।
পাশাপাশি, মার্কিন সেনেটের এক সদস্য মন্তব্য করেছেন যে, প্রস্তাবিত শান্তিপ্রস্তাবে রাশিয়ার লুকানো স্বার্থ প্রতিফলিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ মন্ত্রক অবশ্য এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে যে, প্রস্তাবটি তৈরি করার সময় রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের শান্তিপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জেলেনস্কি যদি পরবর্তী রুশ আক্রমণের প্রস্তুতি নেন, তাতেও লড়াই থামার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সম্ভাব্য রুশ হামলার ভয়ে কিয়েভকে সরবরাহ করা হচ্ছে অস্ত্র, গোলাবারুদ। ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানি নিয়মিত কিয়েভকে সমর্থন দিচ্ছে। পরিস্থিতি এখন দেখাচ্ছে, পূর্ব ইউরোপের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ কঠিন, আর ভবিষ্যতের কূটনৈতিক রণকৌশল এই মুহূর্তে স্থির হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিকরা জেনেভায় বৈঠক করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে। প্রস্তাবটি ইউক্রেনের সীমান্ত, সেনাবাহিনী আকার এবং সামরিক ক্ষমতা সংক্রান্ত রাশিয়ার দাবিকে প্রধান্য দিচ্ছে বলে ইউরোপীয় নেতারা উদ্বিগ্ন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ জোর দিয়ে বলেছেন, ‘ইউরোপকে শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হতে হবে। যুদ্ধের সমাধান কেবলমাত্র ইউক্রেনের অগত্যা সম্মতিতে সম্ভব।’ ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উর্সুলা ভন ডার লেইন বলেন, ‘শান্তি নিশ্চিত করতে হলে সীমান্তকে বলপ্রয়োগে পরিবর্তন করা যাবে না, ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে সীমিত করা যাবে না, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনের নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখবে।’ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁও সতর্ক করেছেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী ইউক্রেনের সেনাবাহিনী হ্রাস করা হলে এবং রাশিয়ার প্রতি অতিরিক্ত সমঝোতা করা হলে রাশিয়া ভবিষ্যতে পুনরায় আগ্রাসন চালাতে পারে।
❤ Support Us






