- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- ডিসেম্বর ২৭, ২০২৪
জ্যোতির্ময় মনমোহন
৯২ বছর বয়সে প্রয়াত দেশের অর্থনীতিকে বদলে দেওয়া প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তাঁর হাত ধরেই ভারতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পরিবর্তন এসেছিল। অর্থনৈতিক সংস্কার করে বদলে দিয়েছিলেন দেশের চালচিত্র। ভারতীয় অর্থনীতিকে ধসে পড়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন মনমোহন সিং। জনসেবা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্যই প্রজন্মের পর প্রজন্ম আজীবন মনে রাখবে দেশের এই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে।
১৯৩২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অধুনা পাকিস্তানের পাঞ্জাবের গাহতে জন্ম। দেশভাগের পর হলদোয়ানি ও অমৃতসরে বেড়ে ওঠা। অমৃতসর হিন্দু কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক হওয়ার পর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। এরপর অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। পরে দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিক্সে যোগদান।
১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের হয়ে কাজ করেছিলেন মনমোহন সিং। এরপর ভারতীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৭১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে ভারতীয় অর্থনীতির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদই দায়িত্ব সহকারে সামলেছেন। ১৯৭২ সালে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব সামলান। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব সামলান। ১৯৮২ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর নিযুক্ত হন। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন। এরপর যোজনা কমিশনের উপাধ্যক্ষর দায়িত্ব পান। ২ বছর এই পদে ছিলেন। ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর মতো গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয় মনমোহন সিংয়ের ওপর।
ইন্দিরা গান্ধি ঘোষিত জরুরি অবস্থা চলাকালীন ৩ বছর অর্থমন্ত্রকের মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা পদ সামলেছিলেন মনমোহন সিং। জরুরি অবস্থা নিয়ে মনমোহনের দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর প্রযুক্তিগত পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় ছিল মনমোহনের। আর্থিক নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনমোহনের পরামর্শও নিতেন ইন্দিরা গান্ধী। জরুরি অবস্থাকালীন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করেছিলেন মনমোহন। পরামর্শ মেনে তড়িঘড়ি মন্ত্রিসভার অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন ইন্দিরাও।
পিভি নরসিমা রাওয়ের সরকারে অর্থমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন। অর্থ মন্ত্রকের দায়িত্ব যে তিনি মনমোহনকে দিতে চান, আগেই জানিয়েছিলেন নরসিমা রাও। প্রথমে সেই প্রস্তাবে মোটেই গুরুত্ব দেননি মনমোহন সিং। এমনকী মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের দিনও রোজকার মতো ইউজিসির অফিসে চলে গিয়েছিলেন তিনি। ফোন করে সন্ধের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তাঁকে যোগ দিতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী রাও। তড়িঘড়ি বাড়ি গিয়ে তৈরি হয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে শপথ নেন মনমোহন। বাকিটা সকলের জানা। অর্থনীতির সংজ্ঞা পাল্টে ফেলে ইতিহাস রচনা করেছিলেন মনমোহন সিং।
১৯৯১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় অর্থনীতিতে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছিল। থিতিয়ে পড়েছিল বিদেশি পুঁজি, দুই অঙ্কে পৌঁছে গেছিল মুদ্রাস্ফীতির হার, রাজকোষে ঘাটতির পরিমাণ ছিল মারাত্মক। এই পরিস্থিতে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় মনমোহনকে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের অনুমোদন ছিলই। আর তাই একের পর এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ঘোষণা করেছিলেন রাওয়ের অর্থমন্ত্রী মনমোহন। বেনজির ও বেসামাল অর্থনীতিতে দ্রুত সুরাহার প্রয়োজন ছিল। ওই বছরই জুলাইতে ভারতীয় মুদ্রার দু’দুবার অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে রপ্তানির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো হয়েছিল। যার জেরে বিদেশি মুদ্রা অর্জনে এগিয়ে গিয়েছিল ভারত। ওই একই সময়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কগুলিতে ৪৭ টন সোনা বন্দক রেখে ৬০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্কও। অর্থব্যবস্থায় অধোগতি রোধে আইএমএফ থেকে আরও ২০০ কোটি ডলার জরুরি ভিত্তিতে ঋণ নিয়েছিল ভারত।
ওই বছরেই ২৪ জুলাই প্রথম বাজেট প্রকাশ করেন মনমোহন সিং। লাইসেন্স রাজের বিনাশ ঘটিয়ে বাজেটে বিদেশি বিনিয়োগের শর্তাবলী শিথিল করা হয়। ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। যদিও অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য মাশুলও গুনতে হয়েছিল। বাড়তি কর্পোরেট ট্যাক্স গুনতে হয়েছিল জনতাকে। রান্নার গ্যাস, চিনিতে ভর্তুকি কমিয়ে জ্বালানির খরচ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রবণতা জিইয়ে রেখেছিল নরসিমা রাওয়ের সরকার। একে বাণিজ্যনীতি শিথিল করা, করব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সেই সমস্ত কমিটির মাথায় ছিলেন রাজা চেলিয়া, এম নরসিংহমরের মতো অর্থনীতিবিদরা। ওই সমস্ত সংস্কারের জেরে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হতে শুরু করেছিল। অত্যাধুনিক শিল্পের ছোঁয়ায় বৃদ্ধির হারও ঊর্ধ্বগতিতে বাঁক নিতে শুরু করেছিল। মনমোহনের অবদান শুধু যুগান্তকারী পদক্ষেপেই নয়, বরং ভারতও যে আগামিদিনে ঘুরে দাঁড়াতে পারে সেই বিশ্বাসের উপর জোর দিতেন তিনি। তাঁর অনমনীয় মনোভাব ও কঠিন কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা দেশকে যে অনেকটাই উত্তরণের পথে এগিয়ে দিয়েছে তা সন্দেহাতীত।
১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতার পদ সামলান মনমোহন। ২০০৪ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহন করেন। ২০১৪ পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বে দেশে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল। ১০০ দিনের কাজ, আদিবাসী অধিকার, প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার, খাদ্য সুরক্ষা, জমি অধিগ্রহন ও পুনর্বাসন আইন চালু করা হয়। তাঁর নেতৃত্বেই আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করে ভারত। তাঁর প্রধানমন্ত্রীতেই দেশের আর্থিক বৃদ্ধি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য আজীবন মনে রাখবে পরবর্তী প্রজন্ম।
Paid tributes to Dr. Manmohan Singh Ji at his residence. India will forever remember his contribution to our nation. pic.twitter.com/nnNZjiSowN
— Narendra Modi (@narendramodi) December 27, 2024
Profoundly stunned and saddened by the sudden demise of our former Prime Minister Manmohan Singh ji.
I had worked with him and saw him from very close quarters in the Union Cabinet. His erudition and wisdom were unquestionable, and the depth of the financial reforms ushered in…
— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) December 26, 2024
❤ Support Us





