- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- নভেম্বর ১৮, ২০২৫
বিরোধীদের চাপে এবার অসমেও ভোটার তালিকার ‘নিবিড়’ সংশোধন ? কেমন হবে প্রক্রিয়া, জানালো নির্বাচন কমিশন
দেশের ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে যখন গত মাসেই শুরু হয়ে গিয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর, তখন বাদ পড়েছিল অসম। কমিশনের পক্ষ থেকে সে সময় ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল— অসমে এনআরসি-র কাজ শেষের পথে, সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে চলছে পুরো প্রক্রিয়া, তাই উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যটিকে আপাতত আলাদা রাখা হয়েছে। কিন্তু বাংলায় ‘এসআইআর’ শুরুর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই চিত্রটা বদলে গেল। সোমবার কমিশনের তরফে প্রকাশিত নতুন বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিধানসভা ভোটের আগে অসমেও শুরু হচ্ছে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন, যাকে পোশাকি ভাষায় বলা হচ্ছে ‘স্পেশ্যাল রিভিশন’ বা এসআর। নাম আলাদা হলেও বাস্তবে তা এসআইআর-এর সঙ্গে প্রায় একই কাঠামোতে চলবে, এমনটাই মত ওয়াকিবহাল মহলের।
কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজ্যে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, দেশের এতগুলি রাজ্যে যখন এসআইআর চলছে, তখন অসমকে কেন বাদ রাখা হল? বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, ‘এনআরসি জটিলতা’ এবং ‘ডি-ভোটার’ ইস্যুর কারণে কমিশন ইচ্ছে করেই অসমকে সময় দিচ্ছিল। কমিশনের পক্ষ থেকে তখন অবশ্য জানানো হয়েছিল, অসমের জন্য আলাদা নির্দেশিকা আসবে, পৃথক সময়সূচিও ঘোষণা করা হবে। সে প্রতিশ্রুতির পরেই এদিন ঘোষণা এল বিশেষ সংশোধনের। ফলে প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি এনআরসি-র অবশিষ্ট কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে? নাকি বিরোধীদের লাগাতার চাপের মুখে কমিশন বাধ্য হয়েছে অসমেও এই প্রক্রিয়া শুরু করতে?
কমিশন অবশ্য নিজের অবস্থানে অনড়। তাদের যুক্তি, এসআর এবং এসআইআর-এর মূল উদ্দেশ্যে কোনো ফারাক নেই। দুটিই ভোটার তালিকা থেকে মৃত ব্যক্তির নাম বা স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার কাজ করবে, একই ব্যক্তির একাধিক জায়গায় নাম থাকলে তা ছেঁটে ফেলা হবে। আর যোগ্য নতুন ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই তিনটি কাজই সুনিশ্চিত ভাবতে করতেই এই বিশেষ প্রক্রিয়া। কেবল প্রক্রিয়ার কাঠামোয় সামান্য পার্থক্য আছে। এসআইআরের মতো এখানে নতুন এনুমারেশন ফর্ম দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বুথ-লেভেল অফিসাররা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে যে নথি যাচাই করবেন। বিএলওরা নথি নিয়ে যাবেন, যেখানে থাকবে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যমান ভোটারদের নাম-ঠিকানা-ছবি থাকবে। সে তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে বাস্তবের সঙ্গে। কোথাও ভুল পাওয়া গেলে সেখানেই সংশোধন করা হবে। অসমে এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হবে ২২ নভেম্বর থেকে এবং চলবে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর আগে ১৮ থেকে ২১ নভেম্বর নির্বাচন কর্মীদের প্রশিক্ষণ হবে। খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ পাবে ২৭ ডিসেম্বর। দাবি-আপত্তি জানানোর জন্য সময় থাকবে ২২ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত। তার পর ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত হবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা, যা দিয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে।
তবে কমিশনের বিজপ্তি জারি হতেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে ‘ডি-ভোটার’ বা সন্দেহভাজন ভোটারদের নিয়ে। এ প্রসঙ্গে কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘এসআর’-এ ডি-ভোটারদের নাম বা ঠিকানা বদলানো যাবে না। কোনো অবস্থাতেই ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল বা সংশ্লিষ্ট আদালতের নির্দেশ ছাড়া তালিকা থেকে তাঁদের নাম মুছে ফেলার অধিকার নেই বিএলওদের। এনআরসি ও নাগরিকত্ব ইস্যুর উত্তাপে বহুদিন ধরে পুড়ছে অসম। এমন পরিস্থিতিতে এ নির্দেশিকাকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনীতিকরা। যদিও, ভোটার তালিকা সংশোধনের নতুন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু কড়াকড়ি যোগ হয়েছে। বহু এলাকায় দেখা গিয়েছে— বাড়ির নম্বর দেওয়া নেই, আবার কোথাও বাড়ির নম্বর ছিল শূন্য। কমিশন জানিয়েছে, এ বার থেকে কোনো বাড়ির নম্বর শূন্য থাকতে পারবে না। যেসব বাড়ির নম্বর নেই, তাদের জন্য নতুন করে নন-জিরো নম্বর বরাদ্দ করতে হবে। পাশাপাশি ঝাপসা, অস্পষ্ট বা ‘নন-হিউম্যান’ ছবি পাওয়া গেলে সেগুলি অবিলম্বে বদলাতে হবে। একই সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনও ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ১২০০-এর বেশি ভোটার রাখা যাবে না, বিশেষ অনুমতি ছাড়া।
চা-বাগান অঞ্চল, নদীবিধৌত চরাঞ্চল, সীমান্ত জেলার জনসংখ্যা-পরিবর্তন থেকে শুরু করে এনআরসি-র কার্যক্রম, সব মিলিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের আসন্ন প্রক্রিয়া আসামের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড়োসড়ো পরিবর্তন আনতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বহু এলাকায় ভোটার সংখ্যা কমে যাওয়া বা বাড়ার ঘটনা সরাসরি নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এসআর-এর এই ধাপে ধাপে কঠোর প্রয়োগকে অনেকে ২০২৬-এর ভোটের আগে কমিশনের ‘বার্তা’ বলেই দেখছেন কমিশনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, ‘এটি গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সরকারের তরফে পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে।’ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে বোঝা যায়, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করতে আধার-ভোটার কার্ড যুক্তিকরণ, দপ্তরভিত্তিক যাচাই, এ সব উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।
❤ Support Us




