Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • মে ১৫, ২০২৬

জমি দখল, তোলাবাজি, পুলিশ বদলি, বিপুল আর্থিক লেনদেন, ডিসি শান্তনুর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ ইডির

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জমি দখল, তোলাবাজি, পুলিশ বদলি, বিপুল আর্থিক লেনদেন, ডিসি শান্তনুর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ ইডির

আর্থিক দুর্নীতি ও জমি দখল মামলায় গ্রেফতার কলকাতা পুলিশের ডিসি শান্তনু সিংহ বিশ্বাসকে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আনল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট । শুক্রবার ইডির বিশেষ আদালতে তদন্তকারী সংস্থা দাবি করে, জমি দখল, বেআইনি আর্থিক লেনদেন, পুলিশ আধিকারিকদের বদলি, তোলাবাজি — সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল শান্তনুর । আদালতে ইডির আইনজীবী মন্তব্য করেন, “গল্প মনে হলেও সব সত্যি। চার্জশিট জমা পড়লে তা প্রমাণিত হবে।”

যদিও সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করেছেন ধৃত পুলিশকর্তা। তাঁর দাবি, তিনি সম্ভ্রান্ত ও সম্পন্ন পরিবারের সদস্য এবং উত্তরাধিকার সূত্রেই বহু সম্পত্তির মালিক। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই বলেও দাবি করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার ‘সোনা পাপ্পু’ মামলায় কলকাতা পুলিশের ডিসি শান্তনু সিংহ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করে ইডি । শুক্রবার তাঁকে বিশেষ আদালতে পেশ করা হয় । তদন্তকারী সংস্থার দাবি, বেহালার ব্যবসায়ী তথা জমি কারবারি জয় কামদারকে নানা ভাবে সাহায্য করতেন শান্তনু । এমনকি কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন কর্মী ও আধিকারিকদের বদলির ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ ।

ইডির বক্তব্য অনুযায়ী, জয় কামদার, শান্তনু সিংহ বিশ্বাস এবং দক্ষিণ কলকাতার কুখ্যাত দুষ্কৃতী ‘সোনা পাপ্পু’-র মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র ছিল। এই ‘নেক্সাস’-এর মাধ্যমে জমি দখল ও আর্থিক দুর্নীতির চক্র চলত বলে দাবি তদন্তকারীদের ।

আদালতে ইডি জানায়, প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু জমিকে টার্গেট করা হত । তারপর রাজনৈতিক ও পুলিশি প্রভাব খাটিয়ে জমির মালিকদের চাপে ফেলা হত। অভিযোগ, প্রয়োজনে দুষ্কৃতীদেরও ব্যবহার করা হত ।

তদন্তকারী সংস্থার দাবি — জমি কেনাবেচার চুক্তি হওয়ার পর ইচ্ছাকৃত ভাবে পিছিয়ে যেতেন জয় কামদার । পরে কম দামে জমি বিক্রি না করলে মালিকদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হত। পুলিশ ও অপরাধী— দুই পক্ষকেই ব্যবহার করে জমির দখল নেওয়া হত। দক্ষিণ কলকাতার কুখ্যাত সোনা পাপ্পুর কাজ ছিল জমির মালিকদের ভয় দেখানো।

ইডির দাবি: পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার
ইডি আদালতে জানায়, শান্তনু সিংহ বিশ্বাস কলকাতা পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিক ছিলেন। তিনি পুলিশের ওয়েলফেয়ার বিভাগের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং ‘প্যান বেঙ্গল পুলিশ’-এর ওয়েলফেয়ার নোডাল অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সূত্রে অন্যান্য পুলিশকর্তাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং সেই প্রভাব কাজে লাগানো হত বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের।

জয় কামদারের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং উদ্ধার হওয়া নথি থেকে একাধিক তথ্যপ্রমাণ মিলেছে বলে আদালতে দাবি করেছে ইডি।

শান্তনুর বিরুদ্ধে ইডির মূল অভিযোগ–

পুলিশ আধিকারিকদের বদলি নিয়ন্ত্রণ
ইডির দাবি, কালীঘাট ও হেয়ার স্ট্রিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানায় দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন শান্তনু এবং বদলির ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব ছিল।

স্ত্রী ও পুত্রের নামে ব্যবসা
তদন্তকারীদের দাবি, শান্তনুর ছেলে একটি ফার্মের মালিক। স্ত্রী ও ছেলের নামে ব্যবসা চালানো হত। একাধিক মেডিক্যাল কলেজে ক্যান্টিন পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে।

প্রতিদিন পরিকল্পনা চলত
মোবাইল ফোনের চ্যাট থেকে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত তিন জন— জয়, শান্তনু ও সোনা পাপ্পু— নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং বিভিন্ন পরিকল্পনা করতেন।

তদন্তে অসহযোগিতা
ইডির অভিযোগ, শান্তনু তদন্তে সহযোগিতা করেননি এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছেন।

কান্দির বাড়ি সংস্কারে আড়াই কোটি টাকা
কান্দিতে বাড়ি আধুনিকীকরণের জন্য প্রায় আড়াই কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের।

রাজনৈতিক যোগাযোগ
ধৃত জয় কামদারের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া নথিতে আগের সরকারের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে বলে আদালতে জানানো হয়েছে।

তলবে গিয়ে মোবাইল না নেওয়া
ইডির দাবি, সমন পেয়ে হাজিরা দিতে এলেও শান্তনু মোবাইল ফোন সঙ্গে আনেননি।

জোর করে জমি দখলের অভিযোগ
আইনত মালিকদের থেকে জোর করে জমি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে জয় কামদারের বিরুদ্ধে, এবং সেই কাজে পুলিশি মদতের অভিযোগও উঠেছে।

মেডিক্যাল কলেজে ক্যান্টিন ব্যবসা
শান্তনুর স্ত্রীর নামে পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজে ক্যান্টিন ব্যবসা ছিল বলে দাবি ইডির। কলকাতা পুলিশের এক আধিকারিকও এই ব্যবসার অংশীদার ছিলেন বলে অভিযোগ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোটি টাকার লেনদেন
‘বিবেকজ্যোতি সম্মান’ পাওয়া পুলিশকর্তা শান্তনুর বিরুদ্ধে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রায় ১ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।

কাউন্সিলর-পুলিশ-সিন্ডিকেট যোগ
ইডির দাবি, জয় কামদারের সঙ্গে স্থানীয় কাউন্সিলর ও পুলিশের যোগাযোগ ছিল। কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় নির্মাণকারীদের কাছ থেকে তোলাবাজির চক্র চালানো হত।

তদন্তকারীদের কথায়, “নতুন প্রোজেক্ট শুরু করতে গেলে টাকা দিতে হত। না হলে এক জন মেথরও কাজ শুরু করতে পারতেন না।”

শান্তনু সিংহ বিশ্বাস আদালতে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য —

তিনি সোনা পাপ্পুকে চেনেন না।

জয় কামদার তাঁকে টাকা দেননি, বরং ফ্ল্যাট কেনার জন্য তিনিই জয়কে টাকা দিয়েছিলেন।

পরে সেই ফ্ল্যাট কেনা হয়নি।

পারিবারিক সূত্রে তিনি ধনী এবং বহু সম্পত্তির মালিক।

জয় তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে উপহার দিয়েছিলেন, কিন্তু তা কোনও দুর্নীতির লেনদেন নয়।

বিলাসবহুল ব্যাগ ও ঘড়ি প্রসঙ্গে শান্তনু বলেন, “যে ব্যাগ আর ঘড়ির কথা বলা হচ্ছে, তার দাম ১ কোটি টাকা নয়, প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকার মতো হবে।”

তিনি আরও বলেন, “জয় বা সোনা পাপ্পু কী করেছে, তা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমার নির্দিষ্ট ভূমিকা কোথায়?”

শান্তনুর আরও দাবি, ইডির সমন পাওয়ার পর তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। তদন্তকারী সংস্থাকেও নির্দিষ্ট সময়ে হাজিরা দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর মেধাবী পুত্রকেও তদন্তের নামে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!