- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ২, ২০২৬
‘এসআইআর’ ঘিরে ঘরে-বাইরে বিক্ষোভ ! এবার বাদ পড়া ভোটারদের ফের তালিকাভুক্ত করতে বিশেষ অভিযান কমিশনের
‘এসআইআর’-এর পদ্ধতি নিয়ে নির্বাচনের কমিশনের অন্দরে ও বাইরে ক্ষোভ, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের ‘ভোটচুরি’-র অভিযোগ, লক্ষ লক্ষ নাগরিকের ভোটাধিকার হারানো ঘিরে দেশজুড়ে প্রতিবাদ আর বিক্ষোভ ক্রমশ দানা বাঁধছে। পথে নেমেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিকরা। এরকম পরিস্থিতিতে ‘এসআইআর’-এর তালিকা থেকে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের ফের খুঁজে বের করে তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় তোলার জন্য এ বার মাঠে নামতে নির্দেশ দিল নির্বাচন কমিশন। শুধু নাগরিক নিজে আবেদন করবেন, তার অপেক্ষায় বসে থাকা নয় — আগের এবং বর্তমান ভোটার তালিকা মিলিয়ে সম্ভাব্য ‘বাদ পড়া’ ভোটারদের চিহ্নিত করতে হবে। প্রয়োজনে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে। যোগ্য হলে ‘ফর্ম-৬’ পূরণে সাহায্য করতে হবে। এক মাসের মধ্যে এই যাচাই-প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্যমাত্রাও দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ যে ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ‘এসআইআর’-এর কাজ শেষ হয়েছে, সেখানে এই বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কমিশনের সাম্প্রতিক নির্দেশে প্রথম বার ভোট দেবেন, এমন তরুণ ভোটার এবং এখনো ভোটার তালিকায় নাম তুলতে না-পারা ‘যোগ্য’ নাগরিকদেরও এ অভিযানের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। ১ অক্টোবর সমস্ত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে বৈঠকের পর এ নির্দেশের কথা সামনে আসে। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করা কোনো এককালীন প্রক্রিয়া নয়। ‘এসআইআর’-এর সময় কোনো যোগ্য নাগরিকের নাম তালিকায় না উঠলেও পরবর্তী সময়ে তাঁর নাম নথিভুক্ত করার সুযোগ থাকবে। কমিশন এবং বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনী আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘এসআইআর’-এর পরে ৯ টি রাজ্য এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকায় মোট ১০.২ শতাংশের মতো ছাঁটাই হয়েছে। ওই প্রক্রিয়ায় ৬০ লক্ষেরও বেশি মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে ভোট কর্তৃপক্ষ।
প্রশ্ন উঠছে, ‘এসআইআর’-এ এত নাম বাদ পড়ার পরে এখন কমিশনকে কেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার খুঁজতে হচ্ছে? বিরোধীদের অভিযোগ, ‘এসআইআর’-এর প্রক্রিয়ায় যোগ্য নাগরিকদের নামও বাদ পড়েছে। কমিশন অবশ্য আগে এ অভিযোগ মানেনি। কমিশনের দাবি ছিল, ‘এসআইআর’-সহ সমস্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ভাবেই নেওয়া হয়েছে। তবে কমিশনের অন্দরে বিদ্রোহ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ও আমজনতার ধারাবাহিক বিক্ষোভে শঙ্কিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ফলে, ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই কমিশন বাদ পড়া নামগুলি ফের অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি পৃথক প্রশাসনিক পথ তৈরি করছে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিষয়টির গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘এসআইআর’-এর পরে ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না থাকা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক আপিল হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে এ সংক্রান্ত মোট ৩৮.২০ লক্ষ আপিলের মধ্যে তখন মাত্র ১.০২ লক্ষের নিষ্পত্তি হয়েছিল। অর্থাৎ, কয়েক মাস ধরে চলা আপিল প্রক্রিয়ার পরেও বিপুল সংখ্যক আবেদন তখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। তার আগে প্রকাশিত তথ্যেও দেখা গিয়েছিল, ‘এসআইআর’-এর শেষ পর্যায়ে বাংলায় কয়েক লক্ষ মামলা আটকে ছিল। ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বা তথ্যগত অসঙ্গতি নিয়ে তৈরি হওয়া বিষয়গুলি খতিয়ে দেখার জন্য ট্রাইব্যুনালগুলিও কাজ করছে। ফলে এক দিকে যখন আপিল ও শুনানির প্রক্রিয়া চলছে, অন্য দিকে নতুন করে ভোটার তালিকার সঙ্গে পুরনো তালিকা মিলিয়ে বাদ পড়া যোগ্য নাগরিকদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে দুই প্রক্রিয়া এক নয়। আপিলের মাধ্যমে যাঁরা নিজের নাম নিয়ে দাবি জানাচ্ছেন, তাঁদের আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে। অন্য দিকে নতুন বিশেষ অভিযানে কমিশনের আধিকারিকেরাই পুরনো ও নতুন তালিকা মিলিয়ে সম্ভাব্য বাদ পড়া ভোটারদের চিহ্নিত করবেন। অর্থাৎ, ভোটারকে শুধু বলতে হবে না যে, ‘আমার নাম নেই’। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রশাসনিক স্তর থেকেও খোঁজ নেওয়া হবে — কে ছিলেন আগের তালিকায়, এখন কেন নেই, তিনি কোথায় গিয়েছেন এবং আদৌ যোগ্য ভোটার কি না। এ অভিযানের কেন্দ্রে থাকবেন বুথ লেভেল অফিসার বা ‘বিএলও’-রা। তাঁদের প্রথম কাজ হবে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান ভোটার তালিকা মিলিয়ে দেখা। আগের তালিকায় থাকা অথচ বর্তমান তালিকায় অনুপস্থিত ভোটারদের নিয়ে বুথভিত্তিক তালিকা তৈরি করতে হবে। তবে কারও নাম পুরনো তালিকায় ছিল অথচ নতুন তালিকায় নেই মানেই যে তিনি ভুল করে বাদ পড়েছেন, এমনটা ধরে নেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্য কোনো জায়গায় ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করেছেন কি না, তিনি স্থানান্তরিত হয়েছেন কি না, একই ব্যক্তির একাধিক নাম রয়েছে কি না অথবা তাঁর মৃত্যু হয়েছে কি না, এ সবই যাচাই করতে হবে।
সাম্প্রতিক ‘এসআইআর’-এর সময় ‘অনুপস্থিত’, ‘স্থানান্তরিত’, ‘মৃত’ এবং ‘ভুয়ো’, অর্থাৎ ‘এএসডিডি’ হিসেবে চিহ্নিত ভোটারদের তালিকাও তৈরি হয়েছিল। কমিশনের বক্তব্য, সেই তালিকা স্থানীয় সরকারি দফতর, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের কাছে এবং সংশ্লিষ্ট ‘সিইও’-দের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে নতুন অভিযানে কোনো নাম বাদ পড়েছে দেখলেই সরাসরি ফের যুক্ত করে দেওয়ার কথা বলা হয়নি। বরং আগে তার কারণ যাচাই করতে হবে। যদি দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্য কোথাও ভোটার নন, তিনি মৃত নন, ডুপ্লিকেট নন এবং এখনো ভোটার হওয়ার যোগ্য— তখন তাঁকে ‘বাদ পড়া যোগ্য ভোটার’ ভোটার হিসাবে চিহ্নিত করে নাম ফের তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। আর সে জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাইয়ের নির্দেশ। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী প্রত্যেক ‘বিএলও’-কে সপ্তাহে অন্তত ২০-২৫ জন এমন ভোটারের বিষয়ে যাচাই করতে হবে। এক মাসের মধ্যে এ কাজ শেষ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। শুধু আগের তালিকায় থাকা বাদ পড়া ভোটার নয়, বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রথম বার ভোট দিতে চলা ও এখনো তালিকায় নাম ওঠেনি এমন যোগ্য তরুণ ভোটারদেরও চিহ্নিত করতে হবে। কারও ‘ফর্ম-৬’ জমা পড়েছে কি না, কার নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করা হয়েছে, কার আবেদন এখনো বাকি— প্রতিটি তথ্য নথিভুক্ত করার নির্দেশ রয়েছে। এর ফলে ‘এসআইআর’-এর পরে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজটি শুধু ‘ইআরও’-র দফতরে বসে আবেদন নিষ্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বুথ স্তরে একটি সক্রিয় যাচাই-প্রক্রিয়া চালানোর কথা বলা হচ্ছে।
নতুন অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘ফর্ম-৬’। নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার জন্য যে বিধিবদ্ধ ফর্ম ব্যবহার করা হয়, সেই ‘ফর্ম-৬’-এর মাধ্যমেই বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদেরও ফের নাম তোলার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে এখানেই সাম্প্রতিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ‘এসআইআর’ চলাকালীন অনলাইন ‘ফর্ম-৬’-এ একটি অতিরিক্ত ঘোষণা যোগ করা হয়েছিল। সেখানে আবেদনকারীকে জানাতে হতো, তাঁর নিজের, বাবা-মা অথবা দাদু-দিদার নাম আগের ‘এসআইআর’-এর ভোটার তালিকায় ছিল কি না। ‘ফর্ম-৬’-এ এই অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভিতরেই আপত্তি উঠেছিল। দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী এই পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তাঁদের বক্তব্যের মূল প্রশ্ন ছিল— ‘নির্বাচক বিধি নিবন্ধন, ১৯৬০’-এ নির্ধারিত একটি বিধিবদ্ধ ফর্মে নিয়ম পরিবর্তন না করে কমিশনের নির্দেশে অতিরিক্ত ঘোষণা যোগ করা যায় কি না। কারণ নতুন ভোটার, বিশেষ করে প্রথম বার ভোট দিতে চলা তরুণদের জন্য অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার বিষয়টি বাধ্যতামূলক হওয়ার ফলে তাঁরা সমস্যায় পড়তে পারেন— এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন দুই কমিশনার।
এর পর কমিশন স্পষ্ট করেছে, ‘এসআইআর’-সংক্রান্ত ওই অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া শুধুমাত্র এই সময়ের জন্য প্রযোজ্য। যে সব রাজ্যে সংশোধন প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, সেখানে সাধারণ বিধিবদ্ধ ‘ফর্ম-৬’-ই ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে নতুন করে নাম তোলা বা বাদ পড়া যোগ্য ভোটারকে ফের তালিকায় আনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঘোষণাটি আর প্রযোজ্য নয়। ফলে ‘এসআইআর’-এ যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের জন্য ‘ফর্ম-৬’ একটি নতুন প্রশাসনিক পথ তৈরি করছে। তবে, ‘ফর্ম-৬’ জমা পড়লেই নাম স্বয়ংক্রিয় ভাবে ভোটার তালিকায় উঠে যাবে না। আবেদন যাচাই করে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিকই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন এ কথাও স্পষ্ট করেছে নির্বাচন কমিশন।
শুধু নির্দিষ্ট ঠিকানায় থাকা নাগরিকদের মধ্যেই এই বিশেষ অভিযান সীমাবদ্ধ রাখার কথা যাবে না বলেও জানিয়েছে কমিশন। বুথ লেভেল ক্যাম্প আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। রাতের আশ্রয়কেন্দ্র, শ্রমিক কলোনি, গৃহহীন মানুষ এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ শিবির করার কথাও বলা হয়েছে। কারণ, ভোটার তালিকার সবচেয়ে বড়ো সমস্যাগুলির অন্যতম স্থায়ী ঠিকানার সঙ্গে নাগরিকের বাস্তব অবস্থানের ফারাক। শ্রমিক, গৃহহীন বা অস্থায়ী ভাবে বসবাসকারী মানুষের ক্ষেত্রে সে সমস্যা আরও প্রকট। তাই বাড়ি বাড়ি যাচাইয়ের পাশাপাশি বিশেষ শিবিরের মাধ্যমে তাঁদেরও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনসংযোগ কর্মসূচি, প্রচার এবং অন্যান্য মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রথম বার ভোট দিতে চলা তরুণদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার বিষয়ে উৎসাহিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা নিয়ে এখন কার্যত পাশাপাশি দু–টি প্রক্রিয়া চলতে পারে। এক দিকে ‘এসআইআর’-সংক্রান্ত আপিল ও অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে। যাঁরা নিজেদের নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আবেদন করেছেন, তাঁদের আবেদন সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে। অন্য দিকে, নতুন বিশেষ অভিযানে কমিশনের আধিকারিকেরা নিজেরাই পুরনো ও নতুন ভোটার তালিকা মিলিয়ে ‘বাদ পড়া যোগ্য’ ভোটারদের খুঁজবেন।
❤ Support Us







