- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
বিতর্কের মাঝেই ‘বিদ্রোহী’ সতীর্থের সঙ্গে বৈঠক জ্ঞানেশ কুমারের, ‘এসআইআর’ নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত কমিশনের ?
নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলে মতপার্থক্য, ‘এসআইআর’ ঘিরে যখন জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র চাপানউতোর, ঠিক তখনই শনিবার সন্ধ্যায় মুখোমুখি হলেন কমিশনের তিন সদস্য। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক যোশী। বিতর্কের আবহে একই টেবিলে তিন কমিশনারের বসা এবং তার পরেই ‘এসআইআর’ নিয়ে একাধিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা—স্বাভাবিক ভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে শনিবারের বৈঠক।
বৈঠকের পর কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, ‘এসআইআর’-এর ‘আনম্যাপড’ কিংবা ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ হিসাবে চিহ্নিত ভোটারদের শুনানির প্রক্রিয়ায় বড়োসড়ো বদল আনা হচ্ছে। এখন থেকে সাধারণ পরিস্থিতিতে ওই ভোটারদের ‘ইআরও’ বা ‘এইআরও’ -র দফতরে গিয়ে সশরীরে হাজির হতে হবে না। বুথ স্তরের আধিকারিকেরা সংশ্লিষ্ট ভোটারের বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করবেন। সে নথি ‘ইসিআইনেট’-এ আপলোড করে ‘ইআরও’ অফিসারের কাছে পাঠানো হবে। প্রয়োজন মনে হলে তবেই শুনানির ব্যবস্থা করা হবে। সেক্ষেত্রেও সম্ভব হলে অনলাইনেই শুনানি করার কথা জানিয়েছে কমিশন।
অর্থাৎ, ‘এসআইআর’-এর নোটিস হাতে পেলেই যে সঙ্গে সঙ্গে দফতরে গিয়ে হাজির হতে হবে, এমন নয়। কমিশনের নতুন ব্যবস্থায় প্রথম ধাপে বাড়ি থেকেই নথি যাচাইয়ের সুযোগ মিলবে। কোনও বিশেষ ক্ষেত্রে ‘ইআরও’ শুনানি প্রয়োজন বলে মনে করলে তবেই তা ডাকা হবে। সংশ্লিষ্ট ভোটার নিজে উপস্থিত হতে না পারলে পরিবারের কোনও প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকেও তাঁর হয়ে শুনানিতে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। অনলাইন শুনানির পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার কথাও জানিয়েছে কমিশন। এ দিনের সিদ্ধান্তে শুধু শহর বা স্বচ্ছল ভোটারদের নয়, সমাজের প্রান্তিক অংশের মানুষের কথাও আলাদা করে বলা হয়েছে। জেলা নির্বাচন আধিকারিকদের স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত হেল্প ডেস্ক এবং বিশেষ শিবির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নাইট শেল্টারে থাকা মানুষ, শ্রমিক, দরিদ্র, গৃহহীন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারেন না — এমন ভোটারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে কমিশনের তরফে।
শনিবারের বৈঠকের আগে গত কয়েক দিন ধরেই নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলের কথিত মতপার্থক্য জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক যোশী অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। ওই প্রতিবেদনে নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনা-সহ একাধিক বিষয় নিয়ে তাঁদের আপত্তির কথা তুলে ধরা হয়েছিল। আরও একটি প্রতিবেদনে ‘ফর্ম-৬’-এর পরিবর্তন নিয়েও দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির কথা প্রকাশ্যে আসে। নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্তির ফর্মে ‘এসআইআর’-সংক্রান্ত কিছু তথ্য ও ঘোষণাপত্র যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে তাঁরা আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে জানিয়েছিল একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম।
খবর প্রকাশ্যে আসার পরই বিরোধী দলগুলি নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দলের নেতারা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানান। তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে পাল্টা বলা হয়েছিল, কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্ন মত থাকা অস্বাভাবিক নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কমিশনের সদস্যরা তাঁদের মতামত জানাতে পারেন। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পূর্ণাঙ্গ কমিশনের অনুমোদনেই নেওয়া হয়। ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিক্রিয়াতেও কমিশন জানিয়েছিল, গত এক বছরে তাদের সিদ্ধান্তগুলি পূর্ণাঙ্গ কমিশনের সর্বসম্মত অনুমোদনেই হয়েছে। শনিবারের বৈঠকের পরেও সেই অবস্থানই আরও একবার জানানোর চেষ্টা করল নির্বাচন কমিশন। ‘এসআইআর’ সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ‘সর্বসম্মত অনুমোদন’-এ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
শনিবার নির্বাচন সদনে বৈঠকে বসে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে ছিলেন সান্ধু ও বিবেক যোশী। কমিশনের তরফে প্রকাশিত ছবিতেও তিন কমিশনারকে একসঙ্গে দেখা গিয়েছে। গত কয়েক দিনের বিতর্কের পরে এই বৈঠক এবং তার পরবর্তী সিদ্ধান্তকে তাই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কমিশন জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ২৪ জুন দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ‘এসআইআর’ করার যে নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, সেটি পূর্ণাঙ্গ কমিশনের সর্বসম্মত অনুমোদনেই হয়েছিল। বিহারকে দিয়ে সে প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায় শুরু হয়। পরে পশ্চিমবঙ্গ-সহ আরও ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে তা সম্প্রসারিত হয়।
কমিশনের বক্তব্য, ওই নির্দেশকে ২০২৬ সালের ২৭ মে সুপ্রিম কোর্টও বহাল রেখেছে। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এবং ২০২৬ সালের ১৪ মে আরও ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে SIR-এর যে সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছিল, সেটিও পূর্ণাঙ্গ কমিশনের অনুমোদনেই হয়েছিল বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের হিসাবে, ইতিমধ্যেই বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ-সহ ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ‘এসআইআর’-এর কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে তৃতীয় পর্যায়ের কাজ শেষ করে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরই মোট ভোটারের সংখ্যা স্পষ্ট হবে। এর পাশাপাশি নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্তির ‘ফঈম-৬’ নিয়েও শনিবার অবস্থান স্পষ্ট করেছে কমিশন। ‘এসআইআর’ চলাকালীন ‘ফর্ম-৬’-এর সঙ্গে সংযুক্ত ঘোষণাপত্রের প্রয়োজনীয়তা বহাল থাকছে। কমিশনের বক্তব্য, ওই ঘোষণাপত্র সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থানও রয়েছে।
তবে SIR-এর সময়কাল বাদ দিলে, স্বাভাবিক সময়ে নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে ‘নির্বাচক তালিকা নিবন্ধন বিধি, ১৯৬০’-এ নির্ধারিত ফর্মই ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ ‘এসআইআর’-এর জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা এবং সাধারণ সময়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলার প্রক্রিয়াকে আলাদা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বাদ পড়াদের জন্যও বিশেষ উদ্যোগের ঘোষণা করা হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, ‘পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এ বাদ পড়া, বিশেষ করে তরুণ এবং প্রথম বার ভোট দিতে চলা ভোটারদের নাম যাতে বাদ না থাকে, তার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাম অন্তর্ভুক্তির সুযোগ থাকবে। মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক, জেলা নির্বাচন আধিকারিক এবং ‘ইআরও’-দের এই ধরনের ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার জন্য বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবারের বৈঠকে আরও বড়ো সিদ্ধান্ত দিল্লি এবং মহারাষ্ট্রকে ঘিরে। দিল্লিতে দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ অক্টোবর ২০২৬ করা হয়েছে। ওই দাবি ও আপত্তি নিষ্পত্তির সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ নভেম্বর করা হয়েছে। মহারাষ্ট্রে দাবি ও আপত্তি জানানোর শেষ তারিখ করা হয়েছে ১২ অক্টোবর। সেগুলি নিষ্পত্তির সময়সীমা বাড়িয়ে ১০ নভেম্বর করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের হাতে নিজেদের নাম এবং ভোটার তালিকায় থাকা তথ্য নিয়ে দাবি বা আপত্তি জানানোর জন্য আরও সময় থাকছে। এর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে নিয়েও এ দিন একাধিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। ‘ইসিআইনেট’-এর কার্যপ্রণালী সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এক জন সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার ওই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন। তাঁর সঙ্গে একটি আইআইটি বা আইআইআইটি-এর স্বাধীন বিশেষজ্ঞও থাকবেন। কমিটি রিপোর্ট জমা দেবে কমিশনের কাছে।
কমিশনের দাবি, রাজ্যগুলির মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকদের কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শের ভিত্তিতে ‘ইসিআইনেট’-এ ইতিমধ্যেই একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করা আধিকারিকদের আরও কোনও নমনীয়তার প্রয়োজন হলে সেটিও কার্যকর করা হবে। ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত নতুন কোনও মডিউল বা পোর্টাল চালুর আগে কমিটি অফিসার বা ‘সিওও’-তে তা আলোচনা করতে হবে। তার পরে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে নতুন উদ্যোগ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি নিয়েও ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে। কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের খবরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো একটি চিঠির বিষয়ও। শনিবার কমিশন জানিয়েছে, ওই চিঠি কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। কমিশনে ডেপুটেশনে থাকা এক আধিকারিকের কাজকর্ম নিয়ে প্রশাসনিক বিষয়েই ওই চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলে কমিশনের বক্তব্য।
কমিশন আরও জানিয়েছে, ওই আধিকারিকের তরফে কাজের পুনর্বণ্টনের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা দুই নির্বাচন কমিশনারের নির্দেশের পর কার্যকর হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উপর ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের নজরদারিও ‘কখনও বাস্তবে প্রত্যাহার করা হয়নি’ বলে দাবি করেছে কমিশন। শুধু ‘এসআইআর’ বা ‘ইসিআইনেট’ নয়, কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্মেও বেশ কিছু নিয়ম নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এখন থেকে কমিশনের সব বৈঠকের আলোচ্যসূচি আগেই সদস্যদের মধ্যে পাঠাতে হবে। বৈঠকের কার্যবিবরণীও প্রকাশ করতে হবে। প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সমস্ত আধিকারিকের বার্ষিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন রিপোর্ট সম্পূর্ণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের আধিকারিকদের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও কমিশনের অনুমোদন নিতে হবে। কমিশনাররা কমিশনের আধিকারিকদের যে নির্দেশ দেবেন, তা ‘সযত্নে পালন’ করার কথাও বলা হয়েছে।
❤ Support Us





