Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • আগস্ট ১৯, ২০২৫

উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মতবিভেদ কাটিয়ে, ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রার্থী প্রাক্তন বিচারপতি বি সুদর্শন রেড্ডি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মতবিভেদ কাটিয়ে, ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রার্থী প্রাক্তন বিচারপতি বি সুদর্শন রেড্ডি

উপ-রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নির্বাচন ঘিরে বিরোধী জোটে চলছিল মতভেদের ছায়া। মনোনয়ন জমার শেষ দিন বৃহস্পতিবার। তার আগে প্রার্থী ঠিক করতে জোরকদমে বৈঠক চলেছে ইন্ডিয়া জোটের অন্দরে। কোন প্রার্থী জোটের আদর্শ জোরদার করবে, আর কেই বা মোদি-শিবিরকে সুবিধা করে দেবেন, তাই নিয়েই মতভেদ ছিল তৃণমূল কংগ্রেস জানিয়েছিল, কোনো রাজনৈতিক মুখ নয়, চাই একেবারে অরাজনৈতিক ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী। পাশাপাশি, তৃণমূল জোর দিয়ে বলেছে, বিরোধী জোটের ‘তামিল বনাম তামিল’ প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথে হাঁটা উচিত নয় । তবে নানা আলোচনার শেষে মঙ্গলবার দুপুরে, বিরোধী জোটের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে উপরাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি বি সুদর্শন রেড্ডির নাম।

প্রাথমিকভাবে ডিএমকে প্রাক্তন ইসরো বিজ্ঞানী মাইলস্বামী আন্নাদুরাই কিংবা প্রবীণ সাংসদ তিরুচি শিবার নাম প্রস্তাব করে। যুক্তি ছিল, এনডিএ যখন তামিলনাড়ুর সিপি রাধাকৃষ্ণনকে প্রার্থী করেছে, তখন ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকেও তামিল গর্ব বজায় রাখা দরকার। কিন্তু তৃণমূল এবং কংগ্রেস তা নাকচ করে দেয়। তাদের মতে, ভাষাগত প্রতিযোগিতা ইন্ডিয়া জোটের মূল বার্তাকে দুর্বল করবে এবং বিজেপিকে সুযোগ করে দেবে। এর পর শরদ পওয়ারের এনসিপি প্রস্তাব করে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র, লেখক ও সমাজকর্মী তুষার গান্ধীর নাম। সম্প্রতি, তিনি আরএসএস এবং মোদি সরকারের শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। অনেক বিরোধী নেতা মনে করেছিলেন, তুষার গান্ধীর মতো একজন অরাজনৈতিক কিন্তু স্পষ্ট আদর্শিক অবস্থান নেওয়া মুখ এই প্রতীকী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারেন। বৈঠকে তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন স্পষ্ট বলেন, ‘প্রার্থী হোক এমন একজন, যিনি তামিল বা উত্তর ভারতীয় নন, বরং সার্বজনীন এক গ্রহণযোগ্য মুখ, যাঁর মাধ্যমে সঙ্ঘ-ভাবনার বিরোধিতা জোরদার হবে।’ জানা গেছিল, সোমবারের বৈঠকে স্থির হয়েছে, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে কথা বলবেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিন, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব-সহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে। মঙ্গলবার দুপুরে ফের বসবে বৈঠক। সেখানেই নাম চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে, ডিএমকে তাদের রাজ্য থেকে কেউ প্রার্থী হোক সে বিষয়েই অনড় ছিল। কারণ, বিজেপি ‘তামিল গর্ব’-এর ন্যারেটিভ তৈরি করে তাদের উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। সূত্র বলছে, কিছু নেতার পক্ষ থেকে বিহার বা অন্ধ্রপ্রদেশ থেকেও প্রার্থীর নাম তোলার প্রস্তাব এসেছিল। তাদের মতে, এনডিএ-র শরিক জেডিইউ (বিহার) এবং তেলুগু দেশম (অন্ধ্র) যদি বিজেপির ঘনিষ্ঠ হয়, তবে ওই রাজ্য থেকেই কোনো নিরপেক্ষ, সুশীল ব্যক্তিকে বিরোধীরা প্রার্থী করুক। সে তালিকাতেই উঠে আসে বি সুদর্শন রেড্ডি-র নাম।

জল্পনার অবসান ঘটিয়ে, মঙ্গলবার দুপুরে ইন্ডিয়া জোটের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে উপরাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করা হয় সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি বি সুদর্শন রেড্ডির নাম। অন্ধ্রপ্রদেশের প্রাক্তন বিচারপতি গুয়াহাটি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন, পরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রার্থী ঘোষণা করে, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, ‘তিনি ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট, প্রগতিশীল এবং সাহসী আইনবিদ। গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের পক্ষে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার। বহু রায়ে দেখা গেছে তিনি কীভাবে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় ন্যায়সঙ্গত রায় দিয়েছেন।’

অন্যদিকে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ প্রার্থী হিসাবে তামিল মুখ ঘোষণা করেই শুরু করেছে চিরাচরিত চাপের কৌশল। তামিল গর্বকে সামনে রেখে তারা ডিএমকে-কে কাঠগড়ায় তুলছে। তামিলনাড়ুর বিজেপি সভাপতি কে নাইনার নাগেন্দ্রন বলেছেন, ‘এটা তামিল সমাজের জন্য গর্বের মুহূর্ত। রাজনীতি নয়, সম্মানের কথা ভাবা উচিত।’ এসব কথায় অবশ্য সায় নেই স্ট্যালিনের ডিএমকে-র। দলের প্রবীণ নেতা টি কে এস ইলাঙ্গোভান বলেন, ‘উনি (সিপি রাধাকৃষ্ণন) আরএসএস-এর লোক। বিজেপি প্রার্থী। ভাষার দৃষ্টিকোণ নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা উচিত। আমাদের রাজ্য থেকে আগেও রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, আর ভেঙ্কটরামান, এপিজে আবদুল কালাম। আমাদের তামিল গর্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে সমস্যা নেই। এরই মধ্যে এনডিএ তাদের প্রার্থীর প্রচারে নেমে পড়েছে। সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘সি পি রাধাকৃষ্ণন জীবনে কখনো কোনো বিতর্কে জড়াননি। দুর্নীতিমুক্ত, নিষ্কলঙ্ক, সমাজসেবায় নিয়োজিত এক সাধারণ মানুষ তিনি। এমন মানুষ ভাইস প্রেসিডেন্ট হলে দেশ উপকৃত হবে।’ সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরণ রিজিজুও একই সুরে বলেন, ‘এই ভোট কোনো দলে নয়, চরিত্রে বিশ্বাস রাখার ভোট।’

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের উপ-রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীরা মার্গারেট আলভার নাম ঘোষণা করলেও, তৃণমূল ভোটে অংশ নেয়নি। অভিযোগ ছিল, তাঁদের না জানিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এবার চিত্র বদলেছে। তৃণমূল নেতৃত্বের তরফে ডেরেক ও’ব্রায়েন নিয়মিত বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। জানিয়েছেন, এবারের প্রার্থী ঠিক হোক সম্মিলিত সিদ্ধান্তে। তবে শর্ত— অরাজনৈতিক, গ্রহণযোগ্য মুখ চাই। এবং কোনো অবস্থাতেই যেন ভোটে ‘তামিল বনাম তামিল’ প্রতিযোগিতা না হয়। উল্লেখ্য, উপ-রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন লোকসভা ও রাজ্যসভার সব সদস্যরা। বর্তমানে ৭৮২ জন সাংসদ রয়েছেন। জয়ের জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ৩৯২ ভোট। লোকসভায় এনডিএ-র সংখ্যা ২৯৩, রাজ্যসভায় ১৩৩। এই হিসাব বলছে, এনডিএ-র জয় কার্যত নিশ্চিত। যদি না শাসক জোটে বড়োসড়ো বিদ্রোহ ঘটে। অতএব, বিরোধীদের পক্ষে এ লড়াই মূলত প্রতীকী। কিন্তু প্রতীকী লড়াইও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইন্ডিয়া জোট এই মূহূর্তে গণআন্দোলনের জমি শক্ত করে নির্বাচন অনিয়ম ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নে মোদি-শাহ সরকারকে চাপে ফেলতে চাইছে । ফলে, উপ-রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নির্বাচন তাদের ঐক্য প্রদর্শনের মঞ্চও বটে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!