Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ২২, ২০২৫

বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও ভারতে ঢুকতে বাধা বিশ্ববন্দিত হিন্দি গবেষককে। কেন ‘নিষিদ্ধ’ তালিকায় নাম ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও ভারতে ঢুকতে বাধা বিশ্ববন্দিত হিন্দি গবেষককে। কেন ‘নিষিদ্ধ’ তালিকায় নাম ?

ভারতে প্রবেশের জন্য ৫ বছরের বৈধ ই-ভিসা ছিল। পরিকল্পনা ছিল বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার। কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরে নামার পরই বাধা। কর্তৃপক্ষ উদ্ধত কণ্ঠে জানিয়ে দিল — ‘আপনাকে এখনই ফিরে যেতে হবে।’ কারণ? সরকারি কর্তারা বলছেন, তিনি ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’।

বিশ্ববন্দিত হিন্দি ভাষা ও সাহিত্যের পণ্ডিত, লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ফ্রান্সেসকা অরসিনিকে রবিবার রাতে দিল্লির ইন্দিরা গাঁধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ভারতে প্রবেশ করতে না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর পাসপোর্টে বৈধ ই-ভিসা থাকা সত্ত্বেও, বলা হয়, তিনি ভারতের মাটি স্পর্শ করতে পারবেন না। সরকারি সূত্রে খবর, অরসিনিকে চুপিচুপি গত মার্চ মাসে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়েছিল। অভিযোগ, আগের সফরে তিনি পর্যটক ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে গবেষণামূলক কাজ করেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আগে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি, এমনকি বিমানবন্দরে তাঁর হাতে কোনো লিখিত নথিও দেওয়া হয়নি বলের অভিযোগ প্রফেসরের। অরসিনি রীতিমতো অবাক। দিল্লি বিমানবন্দর থেকে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছে আমি যেন দেশে ফিরে যাই। কেন এই পদক্ষেপ তার সুপষ্ট কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি। আমাকে শুধু জানানো হয়েছে আমার নাম রয়েছে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’-এ।’

কে এই ফ্রান্সেসকা অরসিনি ?

ভারতীয় সাহিত্যের গবেষণায় শিক্ষামহলে পরিচিত এক নাম ফ্রান্সেসকা অরসিনি। হিন্দি ভাষা ও সাহিত্যের উপর তাঁর গবেষণা দেশ-বিদেশে সমাদৃত। তাঁর লেখা ‘হিন্দি জনপরিসর ১৯২০–১৯৪০: জাতীয়তাবাদের যুগে ভাষা ও সাহিত্য’ বইটি হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাসে যুগান্তকারী কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে তাঁর ‘প্রিন্ট অ্যান্ড প্লেজার’ বইটিও ভারতে সাহিত্যের উৎপাদন ও পাঠের রাজনীতিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করেছে। বহু ভারতীয় ছাত্রছাত্রী বর্তমানে তাঁর তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করেছেন। কয়েক দশক ধরে তিনি হিন্দি সাহিত্য, উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাস এবং ঔপনিবেশিক যুগে পাঠক সমাজ নিয়ে গবেষণা করেছেন। ভারতের নানা রাজ্যে বহুবার সফর করেছেন গবেষণা ও পাঠচক্রে অংশ নিতে।

কেন তাঁকে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়েছে?

সরকারি সূত্র বলছে, পর্যটক ভিসা নিয়ে ভারতে এসে গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়াই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘এ ধরনের ভিসা লঙ্ঘন আন্তর্জাতিক পর্যায়েই গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। শুধু ভারতই নয়, বহু দেশেই এমন ঘটলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।’ তাই তাঁকে এই বছরের মার্চ মাসে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন কর্মকর্তা। তবে প্রশ্ন উঠছে, এর আগে তিনি ২০২৪ সালের অক্টোবরেও ভারতে এসেছিলেন, তখন কেন বাধা দেওয়া হয়নি। প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ভারতের শিক্ষা ও অ্যাকাডেমিক মহল ক্ষোভে ফুঁসছে। ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ একে ভারতের সরকারের ‘অজ্ঞানতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং চরম জড়তার পরিচয়’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, একজন পণ্ডিত যিনি ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে এত বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁকে এভাবে অপমান করা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের চিহ্ন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি বিভাগের অধ্যাপক অপূরবানন্দ এ ঘটনাকে সরাসরি ‘গবেষণার উপর আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর কথায়, অরসিনির মতো একজন বিশ্বখ্যাত গবেষকের সঙ্গে এমন ব্যবহার ভারতের বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলের জন্য লজ্জার। ঐতিহাসিক ও লেখক মুকুল কেশবন বলছেন, সরকার হিন্দিকে তার আদর্শের কেন্দ্রে রাখে বলে দাবি করলেও, বাস্তবে হিন্দির জন্য কাজ করা একজন বিদেশি গবেষককেও বরদাস্ত করতে পারছে না। এটি সরকারের ‘গভীর বুদ্ধিবিদ্বেষ’ এবং চিন্তার স্বাধীনতার প্রতি অবজ্ঞার নিদর্শন।

ফ্রান্সেসকা অরসিনিকে দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনাটি সামনে এল এমন এক সময়ে, যখন একাধিক আন্তর্জাতিক রিপোর্টে ভারতের অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেসব রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই এখন কোনো আলোচনা, সেমিনার বা প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করতে হলে প্রশাসনিক অনুমতি নিতে হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আগের মতো নেই। পুলিশি হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক চাপে কর্মসূচি বাতিল হওয়া, এমনকি ছাত্র ও শিক্ষকদের ওপর শারীরিক আক্রমণও বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দলিত অধিকারের পক্ষে কথা বলায় এক অধ্যাপককে মারধর করেছে গেরুয়া বাহিনী। সম্প্রতি, দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকদের সঙ্গে সেমিনার বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। উদয়পুরে একটি চলচ্চিত্র উৎসব হিন্দুত্ববাদী সদস্যদের চাপে বন্ধ করতে হয়েছে। এসব ঘটনা ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মত প্রকাশের সংকোচন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে। এই পটভূমিতে, অরসিনিকে এভাবে ফিরিয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে ভারতের শিক্ষাজগতে এক অন্ধকার বার্তা পাঠাল বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদেরা। শিক্ষামহলের একাংশ বলছেন, এ ধরণের উদাহরণ সংখ্যায় হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপ একদিকে যেমন বিদেশি পণ্ডিতদের ভারত থেকে ক্রমশ দূরে ঠেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে ভারতীয় গবেষকদের গবেষণার পরিসর ও মুক্ত মননের চর্চার পরিসরও সংকুচিত করছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!