Advertisement
  • এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • অক্টোবর ৬, ২০২৬

দক্ষিণ মেরুর হিমবাহের গভীরে ‘ভুতুড়ে কণা’-র সন্ধান ! পদার্থবিদ্যায় নোবেল ফ্রান্সিস হালজেনের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
দক্ষিণ মেরুর হিমবাহের গভীরে ‘ভুতুড়ে কণা’-র সন্ধান ! পদার্থবিদ্যায় নোবেল ফ্রান্সিস হালজেনের

মহাকাশের অন্ধকারে ছুটে চলা অদৃশ্য কণার সন্ধান। আর সেই সন্ধানের ঠিকানা পৃথিবীর একেবারে প্রান্তে — দক্ষিণ মেরু। বরফের গভীরে বসানো হাজার হাজার সেন্সরের সাহায্যে মহাবিশ্বের দূরতম প্রান্ত থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর হদিস পাওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন বেলজিয়ামের পদার্থবিদ ফ্রান্সিস হালজেন। তাঁর সেই বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা এবং ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’-তে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি মিলল এ বার। ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন ৮২ বছরের হালজেন।

রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস মঙ্গলবার জানায়, ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং মহাজাগতিক উৎসের উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য হালজেনকে এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল দেওয়া হয়েছে’। নোবেল কমিটির বক্তব্য, তাঁর ‘দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব’ আইসকিউব প্রকল্পের ক্ষেত্রে ছিল মৌলিক। হালজেন বর্তমানে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের অধ্যাপক। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণায় মহাজাগতিক রশ্মি এবং অ্যাস্ট্রোপার্টিকল ফিজ়িক্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি। তবে তাঁর সবচেয়ে বড়ো বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব সম্ভবত দক্ষিণ মেরুর বরফকে একটি বিশাল ‘টেলিস্কোপ’-এ পরিণত করার ভাবনা।

নিউট্রিনো হলো মৌলিক উপপরমাণুক কণা। এর বৈদ্যুতিক আধান নেই এবং এর ভর অত্যন্ত কম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সাধারণ পদার্থের সঙ্গে নিউট্রিনোর মিথস্ক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল। ফলে অন্য অনেক কণার মতো মাঝপথে বাধা পেয়ে তাদের গতিপথ বদলে যায় না। প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা না খেয়েই কোটি কোটি আলোকবর্ষ পথ পাড়ি দিতে পারে নিউট্রিনো। সূর্য-সহ মহাবিশ্বের বিভিন্ন নক্ষত্র এবং অত্যন্ত শক্তিশালী মহাজাগতিক প্রক্রিয়া থেকে নিয়মিত নিউট্রিনো তৈরি হয়। বিপুল সংখ্যক নিউট্রিনো প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীর উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। এমনকি অসংখ্য নিউট্রিনো আমাদের শরীরের মধ্য দিয়েও চলে যাচ্ছে। কিন্তু তারা এতটাই দুর্লভ ভাবে অন্য পদার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় যে সাধারণ ভাবে তাদের উপস্থিতি বোঝাই যায় না। এ কারণেই নিউট্রিনোকে বলা হয় ‘ভূতকণা’।

যে বৈশিষ্ট্য নিউট্রিনোকে শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে, সেটিই আবার বিজ্ঞানীদের কাছে তার সবচেয়ে বড়ো শক্তি। মহাকাশে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় নিউট্রিনো প্রায় কোনও বাধার সম্মুখীন হয় না। ফলে যে মহাজাগতিক পরিবেশে তার জন্ম, সেই জায়গার বহু তথ্য প্রায় অক্ষত অবস্থাতেই বহন করে পৃথিবীতে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ, নিউট্রিনোকে অনুসরণ করতে পারলে বহু দূরের মহাজাগতিক ঘটনার সরাসরি ‘বার্তা’ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু হালজেনের লক্ষ্য ছিল তার থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী নিউট্রিনো — যেগুলি তৈরি হয় মহাবিশ্বের ভয়াবহ শক্তিশালী পরিবেশে, আমাদের সৌরজগতের বহু দূরে। সমস্যা একটাই —নিউট্রিনোকে ধরা অত্যন্ত কঠিন। কোনো নিউট্রিনো যদি কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তবেই তার উপস্থিতির ক্ষীণ চিহ্ন পাওয়া যায়। আর এমন ঘটনা এতটাই বিরল যে কয়েকটি নিউট্রিনো শনাক্ত করতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ পদার্থ। সেখানেই হালজেনের ভাবনা — দক্ষিণ মেরুর হাজার হাজার কোটি টন বরফকেই যদি কাজে লাগানো যায় ?

এ ভাবনা থেকেই তৈরি হয় ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’। হালজেনের ভাবনা ছিল, এই কাজে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদগুলির একটি — অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তর — ব্যবহার করা যায় কি না। ১৯৮৮ সালেই তিনি দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো শনাক্ত করার পরিকল্পনা সামনে আনেন। ভাবনাটি ছিল দুঃসাহসিক। দক্ষিণ মেরুর কয়েক কিলোমিটার গভীর বরফের স্তরকে একটি বিশাল প্রাকৃতিক ডিটেক্টর হিসেবে ব্যবহার করা হবে। বরফের গভীরে হাজার হাজার আলোক-সংবেদী সেন্সর বসিয়ে নিউট্রিনোর বিরল সংঘর্ষ থেকে তৈরি আলোর ক্ষীণ ঝলক ধরা হবে। কেন দক্ষিণ মেরু? কারণ, সেখানে রয়েছে বিপুল গভীরতার বরফের স্তর। গভীরে থাকা বরফ অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্বচ্ছ। প্রচণ্ড চাপের কারণে সেখানে বাতাসের বুদবুদও কার্যত থাকে না। ফলে আলো ছড়িয়ে পড়ার ধরন বিশ্লেষণ করে ক্ষীণতম সংকেতও শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

পাশাপাশি দক্ষিণ মেরু ভূতাত্ত্বিক ভাবে স্থিতিশীল হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের জন্যও জায়গাটি উপযোগী। হালজেনের সে ভাবনা শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ নেয় ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজ়ারভেটরি’-তে। প্রায় এক ঘন কিলোমিটার অ্যান্টার্কটিক বরফের গভীরে লম্বা তারের সঙ্গে যুক্ত করে বসানো হয় হাজার হাজার আলোক-সংবেদী সেন্সর। বরফের মধ্যে কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে তার ফলে তৈরি হওয়া দ্রুতগতির চার্জযুক্ত কণা নীলচে আলোর ক্ষীণ ঝলক তৈরি করে। সে আলোই ধরে ফেলে আইসকিউবের সেন্সর। আলোর ঝলকটি কোন সময়ে, কোন জায়গায় এবং কী ভাবে তৈরি হলো—তার হিসাব কষে বিজ্ঞানীরা অনুমান করতে পারেন নিউট্রিনোটি কোন দিক থেকে এসেছে। সে সূত্র ধরেই পৌঁছনো যায় তার মহাজাগতিক উৎসের কাছে।

আইসকিউবের কাজ শুরু হওয়ার পর খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। ২০১৩ সালে আইসকিউব সহযোগিতা মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর প্রথম শক্তিশালী প্রমাণ প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে আরও গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই নিউট্রিনোগুলির সঙ্গে মহাবিশ্বের নির্দিষ্ট দূরবর্তী উৎসের যোগসূত্র খুঁজতে শুরু করেন। এর ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং কণাপদার্থবিদ্যার মধ্যে তৈরি হয় নতুন এক সেতু। এত দিন মহাবিশ্বকে বোঝার প্রধান হাতিয়ার ছিল আলো — দৃশ্যমান আলো, রেডিয়ো তরঙ্গ, এক্স-রে, গামা রশ্মি ইত্যাদি। নিউট্রিনো সেই পরিচিত ছবিতে যোগ করল সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা। যে মহাজাগতিক অঞ্চল থেকে আলো বেরিয়ে আসতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে, সেই একই অঞ্চল সম্পর্কে নিউট্রিনো হয়তো সরাসরি তথ্য নিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছতে পারে। এই নতুন পদ্ধতিকেই বলা হচ্ছে ‘নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান’। নোবেল কমিটির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মার্ক পিয়ার্স জানিয়েছেন, হালজেন আন্তর্জাতিক গবেষক ও ইঞ্জিনিয়ারদের একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁদের তৈরি আইসকিউব শুধু একটি অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নয়, মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের এক নতুন পদ্ধতির দরজা। হালজেনের অধ্যবসায় এবং বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতার প্রশংসা করে নোবেল কমিটির তরফে বলা হয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে তৈরি এই ব্যবস্থা নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ খুলে দিয়েছে।

বেলজিয়ামের টিয়েনে ১৯৪৪ সালে জন্ম হালজেনের। ১৯৬৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব লুভাঁ থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ১৯৬৯ সালে পিএইচডি করেন তিনি। পরে পাড়ি দেন আমেরিকায়। ১৯৭২ সাল থেকে ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনে অধ্যাপনা করছেন। মহাজাগতিক রশ্মি এবং অ্যাস্ট্রোপার্টিকল ফিজিক্সের ক্ষেত্রে দীর্ঘ দিন ধরেই তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষক। তবে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব জড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর একেবারে প্রান্তে — দক্ষিণ মেরুর কয়েক কিলোমিটার গভীর বরফের নীচে।  নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির খবর পেয়ে হালজেন বলেন, ‘আমি যে কতটা ভাগ্যবান ছিলাম, তা জোর দিয়ে বলতে চাই। আমরা যখন প্রকল্পটি শুরু করি, তখন সবাই মনে করেছিল, এটি হয়তো ভালো ধারণা। কিন্তু খুব কম মানুষই ভেবেছিল, এটি সত্যিই কাজ করবে।’ তিনি  স্বীকার করেছেন, প্রকল্পের শুরুতে আইসকিউব সত্যিই কাজ করবে কি না, তা নিয়ে তাঁর নিজেরও সংশয় ছিল।  কিন্তু কাজ শেষ পর্যন্ত হয়েছিল। ২০১১ সালে আইসকিউবের নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়। তার পর খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। গবেষকেরা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করতে শুরু করেন। কয়েক বছর পর তাঁরা এমন নিউট্রিনোর অস্তিত্বের প্রমাণ প্রকাশ করেন, যেগুলির উৎস পৃথিবী বা সৌরজগতের আশপাশে নয় — দূর মহাবিশ্বে। সেখান থেকেই খুলে যায় নতুন এক জানালা।

নোবেল জয়ী পদার্থবিদ জানিয়েছেন, আইসকিউবের কাজ কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বরং নোবেল স্বীকৃতির পরে এই গবেষণার গুরুত্ব আরও বাড়ল। বরফের গভীরে বসানো হাজার হাজার সেন্সর প্রতিনিয়ত মহাকাশ থেকে আসা কণার সংকেত সংগ্রহ করছে। সেই বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে  ভবিষ্যতে আরও বেশি নিউট্রিনোর উৎস চিহ্নিত করতে চান তিনি। মহাবিশ্বের কোন কোন অঞ্চলে উচ্চ-শক্তির কণা তৈরি হয়, সেই প্রক্রিয়াগুলি ঠিক কী ভাবে কাজ করে এবং এখনও অজানা কী ধরনের মহাজাগতিক ঘটনা সেখানে ঘটছে — তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলবে।এমনও হতে পারে, নিউট্রিনোর মাধ্যমে এমন কোনও মহাজাগতিক ঘটনার সন্ধান মিলল, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের এখনো কোনো ধারণাই নেই। সে কারণেই হালজেনের নোবেল শুধু একটি আবিষ্কারের স্বীকৃতি নয়। এটি মহাবিশ্বকে দেখার নতুন চোখ তৈরির স্বীকৃতি।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!