Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ৬, ২০২৬

উপনির্বাচনে উত্তাপ ! নন্দীগ্রামে ভোট দিলেন মুখ্যমন্ত্রী, কংগ্রেসকে কটাক্ষ বিজেপির, রেজিনগরে গ্রেফতার হুমায়ুন কবীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
উপনির্বাচনে উত্তাপ ! নন্দীগ্রামে ভোট দিলেন মুখ্যমন্ত্রী, কংগ্রেসকে কটাক্ষ বিজেপির, রেজিনগরে গ্রেফতার হুমায়ুন কবীর

দুই কেন্দ্রে উপনির্বাচনের সকাল। এক দিকে নন্দীগ্রাম। অন্য দিকে রেজিনগর। দুই কেন্দ্রেই মঙ্গলবার উপনির্বাচন ঘিরে সকাল থেকেই টানটান উত্তেজনা। কোথাও বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টকে বুথে ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, কোথাও এজেন্টকে বার করে দেওয়ার দাবি। তার মধ্যেই রেজিনগরে পুলিশের সঙ্গে বচসা, ধস্তাধস্তির পরে গ্রেফতার আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীর। নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের অভিযোগ ঘিরে বিজেপির সঙ্গে বাদানুবাদ। সব মিলিয়ে ভোটের প্রথমার্ধেই দুই কেন্দ্রের রাজনীতির উত্তাপ চড়েছে বেশ কয়েক ধাপ।

যদিও প্রশাসনের দাবি, সামগ্রিক ভাবে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ। কোনো বুথে গোলমালের অভিযোগ এলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে প্রতিরোধমূলক গ্রেফতারও করা হবে। কিন্তু সে আশ্বাসের মধ্যেই বিরোধীদের তরফে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। নন্দীগ্রামে সকালেই ভোট দেন কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান। স্ত্রী অর্পিতা প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে সোনাচূড়া গাংড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৮০ নম্বর বুথে ভোট দেন তিনি। ভোট দিয়ে বেরিয়ে মিলনের বক্তব্য, বিভিন্ন জায়গায় রাত থেকেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মানুষের স্বাধীন ভাবে ভোট দেওয়ার অধিকারে হস্তক্ষেপ করা কোনও ভাবেই কাম্য নয়। প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।  তার পরেই বিভিন্ন বুথ ঘুরে পরিস্থিতি দেখছিলেন মিলন। সোনাচূড়ায় গিয়ে তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেসের পোলিং এজেন্টদের বুথে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। অভিযোগ শুনে বিজেপির কয়েক জন নেতা-কর্মীও সেখানে জড়ো হন। শুরু হয় বাদানুবাদ।

বিজেপির পাল্টা বক্তব্য, এলাকায় কংগ্রেসের সমর্থকই নেই। তা হলে পোলিং এজেন্ট আসবেন কোথা থেকে? সেই সময়ই বিজেপির এক কর্মী মিলনকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘আপনার প্লেয়ার নেই, তো খেলবেন কী ভাবে?’ মিলনের জবাব, ‘প্রথমে প্লেয়ার কারও থাকে না। পরে আসে।’ কথার লড়াই কিছু ক্ষণ চলার পরে সোনাচূড়া থেকে চলে যান কংগ্রেস প্রার্থী। তবে তাঁর অভিযোগ, এ দিন নন্দীগ্রামের একাধিক বুথেই কংগ্রেসের এজেন্টদের বসতে দেওয়া হয়নি। সারাদিন তিনি বিভিন্ন বুথে ঘুরে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখবেন বলেও জানান মিলন। নন্দীগ্রামে এ দিনের ভোটের শুরুতেই অবশ্য অন্য ছবি বিজেপির। প্রার্থী হাসিরানি রথ সকাল শুরু করেন রেয়াপাড়ার শিবমন্দিরে পুজো দিয়ে। পরে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের দিকে রওনা হন। বিরোধীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য, ‘ভোট ভালো হচ্ছে। জিতব।’ বিরোধীদের অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি।

নন্দীগ্রামের ভোটে এ দিন নজর ছিল বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দিকেও। কনভয় থেকে নেমে টোটোয় চড়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছন তিনি। ভোট দেওয়ার পরে শুভেন্দুর দাবি, উপনির্বাচনে সাধারণত ভোটের হার কম থাকে। কিন্তু নন্দীগ্রামে ভোট শান্তিপূর্ণ ভাবেই হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, ‘আমি মুখ্যমন্ত্রী সরকারি নিরাপত্তা পাই। আইন সকলের মেনে চলা উচিত।’ ভোট দেওয়ার পরে নন্দীগ্রামের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের কথাও মনে করিয়ে দেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামের প্রার্থী হিসাবে তিনি অতীতে রেকর্ড ভোটে জিতেছিলেন। এ বারও বিজেপি রেকর্ড ভোটে জিতবে বলে তাঁর আশা। ভবানীপুর আসন না ছাড়ার কারণ নিয়েও এ দিন প্রশ্নের মুখে পড়েন শুভেন্দু। তাঁর ব্যাখ্যা, তিনি ভবানীপুর ছেড়ে দিলে অন্য কেউ সেখানে নির্বাচনে লড়তেন। তাই আসনটি ছাড়েননি। এই প্রসঙ্গে নাম না করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও আক্রমণ করেন তিনি।

নন্দীগ্রামের পাশাপাশি এ দিন সকাল থেকেই নজর ছিল রেজিনগরের দিকে। আর সেখানেই ভোট শুরু হওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রেজিনগরের বিধায়ক পদ ছেড়ে দিয়েছেন হুমায়ুন কবীর। তাঁর দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী এ বার তাঁরই ছেলে গোলাব নবি আজ়াদ। কিন্তু ভোটের দিন প্রার্থী না হয়েও সকাল থেকেই এলাকায় সক্রিয় ছিলেন হুমায়ুন। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ তুলছিলেন তিনি। হুমায়ুনের দাবি, তাঁর বাড়ির সামনে সকাল থেকেই পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। ভোট দিতে যাওয়ার সময়ও পুলিশের উপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ভোট দেওয়ার পরে বুথের বাইরে দাঁড়িয়েও পুলিশকে আক্রমণ করেন। পরে দলীয় কার্যালয়ে ফিরেও একই অভিযোগ করতে থাকেন। পুলিশের বিরুদ্ধে সরব হয়ে হুমায়ুন অভিযোগ করেন, শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশেই রেজিনগরের বিভিন্ন বুথে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ব্যাহত হচ্ছে। পুলিশকে আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকটা বুথে অ্যালসেশিয়ান ছেড়ে দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।’

সেখানেই থামেননি হুমায়ুন। পুলিশ তাঁকে আক্রমণ করতে এলে পাল্টা প্রতিরোধের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। রেজিনগরের মানুষকে পুলিশের বিরুদ্ধে ‘মুগুর নিয়ে’ দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, ইতিমধ্যেই তাঁর দলের ৬৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর পরেই পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়। নিজের দলীয় কার্যালয়ে পৌঁছন হুমায়ুন। কিছু ক্ষণের মধ্যেই সেখানে পুলিশ পৌঁছয়। শুরু হয় তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা। পুলিশকে উদ্দেশ করে হুমায়ুনকে বলতে শোনা যায়, ‘‘দালালি করবেন না, দালালি করবেন না।’’ বিতণ্ডা গড়ায় ধস্তাধস্তিতে। শেষ পর্যন্ত পুলিশকর্মীরা হুমায়ুনকে ধরে গাড়িতে তোলেন। তাঁকে জামা ধরে টেনে গাড়িতে তোলার অভিযোগও উঠেছে। পরে রেজিনগর থানায় নিয়ে গিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কেন হুমায়ুনকে গ্রেফতার করা হল, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছে পুলিশ। মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার সচীন মক্কর বলেন, হুমায়ুন এ বারের উপনির্বাচনের প্রার্থী নন। কোনো প্রার্থীর এজেন্টও নন। ফলে নির্বাচনী এলাকায় তাঁর এই ভাবে ঘোরাফেরা করার অনুমতি নেই। আইন ভঙ্গের অভিযোগেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

হুমায়ুনের গ্রেফতারি নিয়ে রেজিনগরের বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকারের প্রতিক্রিয়াও এসেছে দ্রুত। তাঁর দাবি, ভোটের দিন অশান্তি বাধানোর উদ্দেশ্যেই হুমায়ুন এলাকায় উত্তেজনা তৈরি করছিলেন। কয়েক দিন আগে ভোটের দিন একাধিক প্রাণহানির আশঙ্কার কথা হুমায়ুন বলেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলে শাখারভ বলেন, ‘পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছে। আর কী!’ রেজিনগরে শুধু হুমায়ুনের গ্রেফতারিই নয়, আরও বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোট দিতে গিয়ে ভোটারদের আঙুলে কালি লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার পরে তাঁদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভোট দিতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশকে জানিয়েও কোনো ব্যবস্থা হয়নি বলে অভিযোগ বিরোধীদের।

কংগ্রেসের তরফে অভিযোগ, বিভিন্ন বুথ থেকে তাদের পোলিং এজেন্টদের বার করে দেওয়া হয়েছে। সিপিএমের অভিযোগ আরও নির্দিষ্ট। তাদের দাবি, রেজিনগরের ১১২, ১১৩, ১১৪ এবং ১২২ নম্বর বুথ-সহ দাদপুর অঞ্চলের মরাদিঘিতে তাদের পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে বাধা দিয়েছে পুলিশ। প্রতিবাদে রেজিনগর থানার সামনে অবস্থানে বসেন কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুল্লাহিল কাফি। তাঁর দাবি, ভোটগ্রহণের পরিবেশই যদি এমন থাকে, তা হলে এই উপনির্বাচন বাতিল করে নতুন করে ভোট করানো উচিত। নন্দীগ্রামেও অভিযোগের তালিকা কম নয়। সরবেড়িয়ার ১১২ নম্বর বুথে সিপিআইয়ের এক এজেন্টকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে বলে দলের তরফে দাবি করা হয়েছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, তাদের এজেন্টদেরও একাধিক বুথে ঢুকতে বাধা দিয়েছে পুলিশ। অবশ্য পুলিশের বক্তব্য, নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সে দিকে নজর রাখা হয়েছে।

ভোটের হারের দিক থেকেও দুই কেন্দ্রের মধ্যে কিছুটা ফারাক দেখা গিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাবে সকাল ৯টা পর্যন্ত রেজিনগরে ভোট পড়েছিল ১৮.০৫ শতাংশ। একই সময়ে নন্দীগ্রামে ভোট পড়ে ২০.৮৯ শতাংশ। বেলা ১১টা নাগাদ নন্দীগ্রামে ভোটদানের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩.৯৫ শতাংশ এবং রেজিনগরে ৩৮.৭১ শতাংশ। রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুই কেন্দ্রেই এ দিন ভোটের সঙ্গে সঙ্গে নজর শাসক ও বিরোধী শিবিরের নেতাদের গতিবিধির উপর। তবে দুপুর পর্যন্ত তৃণমূলের দুই শিবিরের কোনো শীর্ষ নেতাকে দুই কেন্দ্রেই বিশেষ সক্রিয় ভাবে দেখা যায়নি। বরং বিরোধীদের অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং পুলিশের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের সংঘাতই ভোটের প্রথমার্ধের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

রেজিনগরে হুমায়ুনের গ্রেফতারির ঘটনায় ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের নজর পড়েছে। দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে তাঁকে আটক এবং পরে গ্রেফতারের ঘটনায় জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে রিপোর্ট চেয়েছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর। ফলে ভোটের বাকি সময় রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম — দুই কেন্দ্রের পরিস্থিতির উপরই নজর থাকছে প্রশাসন এবং কমিশনের।

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!