- এই মুহূর্তে দে । শ
- জানুয়ারি ৩, ২০২৬
আলিপুরদুয়ারের সভা থেকেও বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ, ‘এক দেশ এক ভোট’ রুখে দেবার সংকল্প অভিষেকের
বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তরবঙ্গে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়াচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। শনিবার আলিপুরদুয়ারে চা-বাগান শ্রমিকদের জনসভা থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপিকে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়াই লক্ষ্য। একই সঙ্গে তাঁর হুঙ্কার— ‘এক দেশ এক ভোট’ করার যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা কোনও ভাবেই বাস্তবায়িত হতে দেওয়া হবে না। চা-বাগান অধ্যুষিত আলিপুরদুয়ারে দাঁড়িয়ে অভিষেক বলেন, এ বার এই জেলাকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। তাঁর লক্ষ্য, জেলার পাঁচটি বিধানসভা আসনেই তৃণমূলের জয় নিশ্চিত করা। অভিষেকের কথায়, ‘প্রতিটি বুথে বিজেপিকে হারাতে পারলেই উপযুক্ত জবাব দেওয়া যাবে।’ তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকা বিজেপিকে সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগের যথাযথ প্রতিদান মানুষ পাননি।
সভায় বিজেপি ও নির্বাচঞ্জ কমিশনের বিরুদ্ধে আমজনতার ভোটাধিকার খর্ব করার অভিযোগও তোলেন অভিষেক। ‘এসআইআর’ প্রসঙ্গে তাঁর কটাক্ষ, আগে মানুষ ঠিক করত সরকারে কে বসবে, আর এখন সরকারই ঠিক করছে কে ভোটার হবে। তাঁর অভিযোগ, বিশেষ করে বয়স্ক ভোটারদের নানা ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ‘এক দেশ এক ভোট’ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে সাধারণ ভোটারদের মতামতের আর কোনো মূল্য থাকবে না। সে কারণেই তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো মূল্যেই এই ব্যবস্থাকে মেনে নেওয়া হবে না।
তবে সবচেয়ে নজরকারা বিষয়, এ দিনের সভায় বক্তৃতা শেষ করেই মঞ্চ ছেড়ে চলে যাননি অভিষেক। উল্টে তিনি সরাসরি জনতার সঙ্গে যোগাযোগে আগ্রহী হন। সভাস্থলে উপস্থিত মানুষের কাছ থেকে লিখিত আকারে অভিযোগ ও সমস্যার কথা নেওয়া হয়। সে সব কাগজ হাতে নিয়েই তিনি একে একে পড়ে শোনেন এবং সীমিত সময়ের মধ্যেই সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। অভিষেক জানান, একতরফা বক্তৃতার রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাস করেন না; মানুষের প্রশ্ন থাকবে, আর সেসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই তাঁর দায়িত্ব। চা বাগান শ্রমিকদের একাধিক সমস্যা উঠে আসে সভায়। কুমারগ্রামের এক শ্রমিক রাজেশ ওরাওঁ তাঁর দৈনিক মজুরি কম হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে পাকা ঘরের অভাব, স্বাস্থ্য পরিষেবার দুরবস্থা, বাগানের হাসপাতালে ওষুধ না থাকা, অ্যাম্বুল্যান্সের অভাব এবং শিক্ষা ও পানীয় জলের সমস্যার কথা। রাজেশকে মঞ্চে ডেকে এনে তাঁর সব কথা শোনেন অভিষেক।
জনতার অভিযোগ শোনার পর অভিষেক বলেন, শ্রমিকদের দাবি যুক্তিসঙ্গত। তিনি মনে করিয়ে দেন, তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার আগে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র ৬৭ টাকা। গত ১৪ বছরে তা বেড়ে ২৫০ টাকা হয়েছে। তবে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির বাজারে এই মজুরি যে পর্যাপ্ত নয়, তা স্বীকার করেন তিনি। আশ্বাস দেন, চতুর্থ বার তৃণমূল সরকার গঠিত হলে সরকার তৈরি হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ডাকা হবে। আর সেই বৈঠকের ৭ দিনের মধ্যেই কাজ শুরু করে দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকায় উন্নীত করা হবে বলে জানান তিনি। চা বাগান এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা ও পরিকাঠামো নিয়েও প্রতিশ্রুতি দেন অভিষেক। তিন জানান, চা-বাগান এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। যেগুলি এখনো বাকি রয়েছে, সেগুলিও দ্রুত তৈরি করা হবে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা এবং শ্রমিকদের শিশুদের জন্য ‘ক্রেশ’ চালু করার কথাও তিনি জানান। সর্বোচ্চ ২ বছরের মধ্যে সব প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ‘ক্রেশ’ কার্যকর করার আশ্বাস দেন তিনি।
এদিন, কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধেও বঞ্চনার অভিযোগ তোলেন তৃণমুলের ‘সেনাপতি’। তাঁর দাবি, গত কয়েক বছরে আইটি ও জিএসটির মাধ্যমে বাংলা থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করা হলেও রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ দেওয়া হয়নি। আলিপুরদুয়ারে বিজেপির সাংসদ ও বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও চা বাগানের সমস্যা নিয়ে কেন্দ্রের কাছে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প বন্ধ করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলেও তাঁর অভিযোগ। সভা থেকে বিজেপি সাংসদদের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানান অভিষেক। তিনি বলেন, বিজেপির প্রতিনিধিরা মানুষের উপকার না করে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিই করেন। সে কারণে ভোটারদের সতর্ক করে তিনি আবেদন জানান, এ বার যেন ভুল করেও বিজেপিকে সুযোগ না দেওয়া হয়। বরং তৃণমূলকে দায়িত্ব দিলে মানুষের জন্য কাজ করা হবে বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি নিজের দায়বদ্ধতার কথাও তুলে ধরে বলেন, তৃণমূল যদি মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তা হলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ চাইলে তাঁদের সরিয়ে দিতে পারেন।
নির্বাচনী কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অভিষেক নির্বাচন কমিশনকেও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। নাম না করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, জ্যান্ত মানুষকে ভূত বানিয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ পরিস্থিতিতে ‘ম্যাজিকের পাল্টা ম্যাজিক’ করার ডাক দিয়ে তিনি বলেন, বিজেপির লোকেরা ভোট চাইতে এলে তাঁদের আশ্বাস দেওয়া হোক, কিন্তু ভোটের দিন লাইনে দাঁড়িয়ে জোড়াফুলে ছাপ দিতে হবে।
❤ Support Us







