- বি। দে । শ
- জুলাই ৮, ২০২৬
হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যা মামলায় যোগ নেই ভারতের! লরেন্স বিষ্ণোই ও গোল্ডি ব্রারের বিরুদ্ধে ‘চার্জশিট’ গঠন যুক্তরাষ্ট্রের
কানাডার খালিস্তানপন্থী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে আন্তর্জাতিক তদন্তে নতুন মোড়। কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সতিন্দর জিৎ সিং ওরফে গোল্ডি ব্রারের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে কানাডায় নিজ্জরকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করেছে আমেরিকার বিচার বিভাগ। একই সঙ্গে বহু বছর ধরে চলা আন্তর্জাতিক তদন্তের অংশ হিসেবে ভারত-ভিত্তিক তিনটি আন্তঃদেশীয় সংগঠিত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন সমন্বিত অভিযানের ঘোষণা করেছে মার্কিন প্রশাসন।
আমেরিকার দাবি, অপরাধচক্রগুলি শুধু খুন বা চাঁদাবাজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ, অপহরণ, আন্তঃদেশীয় মাদক পাচার, মানবপাচার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র পরিচালনার মতো একাধিক গুরুতর অপরাধে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত অভিযুক্তরা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত সম্প্রদায়কে আতঙ্কের মধ্যে রেখে অর্থ আদায় করাই এ নেটওয়ার্কের অন্যতম কৌশল।
নয়া এই তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে ‘অপারেশন হার্ড বল’ নামে পরিচিত দীর্ঘমেয়াদি ফেডারেল অভিযানের অধীনে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এ অভিযানে ইতিমধ্যেই ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও সাতজন আগে থেকেই বিভিন্ন মামলায় হেফাজতে ছিলেন। মোট ৩৭ জনের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক অভিযোগপত্রে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, অভিযুক্তদের মধ্যে দু–জন ভারতে কারাবন্দি অবস্থাতেই আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র পরিচালনা করছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, লরেন্স বিষ্ণোই ২০১৫ সাল থেকে বন্দি থাকলেও কারাগারে চোরাপথে পৌঁছে দেওয়া মোবাইল ফোন এবং ‘ভয়েস-ওভার-ইন্টারনেট-প্রোটোকল
১ জুলাই আমেরিকার ‘ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি’র জমা দেওয়া নয় দফা অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পাঞ্জাবের বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সি লরেন্স বিষ্ণোই প্রথম জীবনে নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে তিনি রাজনীতি ছেড়ে সংগঠিত অপরাধের জগতে প্রবেশ করেন। ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। মার্কিন আইনজীবিদের দাবি, জনসমক্ষে বিষ্ণোই নিজেকে দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি এবং সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সে ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছিল। অভিযোগ, সে জনপ্রিয় ভাবমূর্তিকেই তিনি অপরাধচক্রে নতুন সদস্য নিয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, লরেন্সের অপরাধচক্রের বিস্তার একাধিক মহাদেশে। বিশ্বস্ত সহযোগীদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন দেশে গ্যাং পরিচালনা করেন। উত্তর আমেরিকার দায়িত্বে সতিন্দরজিৎ সিং ওরফে গোল্ডি ব্রার, ইউরোপের দায়িত্বে রাজস্থানের রোহিত গোদারা এবং পাঞ্জাব অঞ্চলের দায়িত্বে সুখরাজ সিং কাং। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ব্রার ও গোদারা কার্যত বিষ্ণোইয়ের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। অভিযোগপত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ২০২৩ সালের ১৮ জুন কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সারে শহরে শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যাকাণ্ডকে। ওইদিন গুরুদ্বার থেকে বেরিয়ে আসার সময় দুই বন্দুকধারী তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। অভিযোগ, হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন লরেন্স বিষ্ণোই এবং গোল্ডি ব্রার।
মার্কিন তদন্তকারীদের বক্তব্য, ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালানো এই অপরাধচক্রের কৌশল। উদ্দেশ্য, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং সেই ভয়কে কাজে লাগিয়ে চাঁদাবাজি করা। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বিশ্বের যে দেশেই এ গ্যাং সক্রিয়, সেখানেই তারা একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করেছে। ভয় প্রদর্শন, লক্ষ্য করে হত্যা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে ঘটনার প্রচারের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে তারা। এই মুহুর্তে ফেরার গোল্ডি ব্রারকে গ্রেফতারে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে মার্কিন ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। এফবিআই জানিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, চাঁদাবাজির মাধ্যমে বাণিজ্যে হস্তক্ষেপ, মাদক পাচারের ষড়যন্ত্র-সহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট আদালত ১ জুলাই তাঁর বিরুদ্ধে ফেডারেল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
এদিন, লস অ্যাঞ্জেলেসে সাংবাদিক বৈঠকে মার্কিন অ্যাটর্নির প্রথম সহকারী বিল এসাইলি বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধচক্রকে যেখানেই তারা সক্রিয় থাকুক না কেন, চিহ্নিত করে ধ্বংস করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ এবং এশিয়ার আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলি বদ্ধপরিকর। ‘এফবিআই’-এর শীর্ষ কর্মকর্তা প্যাট্রিক গ্র্যান্ডি বলেন, সম্প্রতি চালানো একাধিক অভিযান আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্রের কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে যারা সংগঠিত অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছিল, তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযান গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এনে দিয়েছে।
এ ঘটনার মধ্যেই কানাডা থেকে এসেছে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য। ‘রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ’-এর ডেপুটি কমিশনার লিসা মুরল্যান্ড জানিয়েছেন, নিজ্জর হত্যা তদন্তে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, তদন্তে ভারত সরকার সহযোগিতা করেছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ২০২৩ সালে তৎকালীন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো অভিযোগ করেছিলেন, ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশেই নিজ্জর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। ভারত সে অভিযোগকে শুরু থেকেই ‘অযৌক্তিক’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে খারিজ করে আসছে। মার্কিন অভিযোগপত্রেও ভারত সরকারের কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি। বরং তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে লরেন্স বিষ্ণোই নেতৃত্বাধীন আন্তঃদেশীয় সংগঠিত অপরাধচক্রকে। যদিও, মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগগুলি এখনো সে দেশের আদালতে প্রমাণিত হয়নি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া চলবে। তবে আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তাঁরা অপরাধী হিসেবে গণ্য নন।
❤ Support Us








