- বি। দে । শ
- অক্টোবর ১৩, ২০২৫
বদ্ধভূমিতে চুপ প্রাণীরাও: গাজায় পরিবেশ ধ্বংসের দুঃসহ আখ্যান
৭৬ হাজার প্রাণ, প্রাণবন্ত আস্ত একটি শহরের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবার বিনিময়ে গাজায় ‘শান্তি’ নেমেছে। দলে দলে ঘরছাড়া মানুষ দিনশেষের ম্লান আলোয় নীল সমুদ্রের পাশ দিয়ে ‘সংসার’ কাঁধে, সন্তান কিংবা তাঁদের স্মৃতি কাঁধে ঘরে ফিরছেন। কোথায় সে ঘর? বোমার আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়া ছাদের নীচে, প্রিয় গাছটার লাশের পাশে না কি গণকবরে সন্তানের দেহের পাশে, কোথায় ঘর! হামাস যুদ্ধবন্ধী ২০ জনকে ফেরত পাঠাচ্ছে নিজের দেশে, সঙ্গে লাশ যাচ্ছে বাকিদের। ইজরায়েলের জেল থেকে মুক্তি পাবেন ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি। শ্বেত কবুতর নিয়ে ‘আঙ্কেল স্যাম’-ও হাজির চমৎকার দৃশ্য উপভোগ করতে, মেডেল নিতে। তেল আভিবের রাস্তায় বেলুন উড়ছে, চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ছে আলো। বিশ্বের ২০ দেশের রাষ্ট্র প্রতিনিধিরাও উৎসবে সামিল।
‘কুকুর-বেড়ালগুলোও ডেকে ওঠে না। ফ্যালফ্যাল চোখে আর জন্মের খিদে নিয়ে শুধু তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে’ — খান ইউনূসের এক উদ্বাস্তু বাসিন্দা এমন কথাই বলেছিলেন। এই কথাগুলোই যেন গাজার বর্তমান অবস্থা বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। এমন এক নীরবতা, যার সাথে জীবনের যোগ কম, বরং দীর্ঘ যুদ্ধের পরিবেশে অনেকবেশি কাছের হয়ে উঠেছে মৃত্যু। যুদ্ধ আজ শুধু মানুষের রক্তে সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে জীবনের প্রতিটি স্তরে—পশুপাখি, গাছপালা, নদী, সাগর, বাতাসের দিকে। এক অদৃশ্য ভাইরাস, যা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে জীবনের সব রূপকে। বোমার আঘাতে, স্থিরলক্ষ্য বুলেটে মানুষ মরছে আর তাঁদের সাথে মরছে পৃথিবীর সম্পূর্ণ পরিবেশব্যবস্থা। অবরোধ, ক্ষুধা, বোমাবর্ষণ আর পরিকাঠামোর ধ্বংস মিলে গাজাকে পরিণত করেছে মৃতদের ভূখণ্ডে। আগে যেখানে শিশুরা খেলত, অলিভ বাগানে ফুল ফুটত মেলা, আজ সেখানে কেবল ধুলো, ধোঁয়া, আর প্রাণহীন দেহের স্তূপ। এমন এক মৃত্যু, যার কোনো শবযাত্রাও নেই।
ফিলিস্তিনে মানুষের খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছে—এ খবর পৃথিবী জানে। তিলে তিলে মারা যাচ্ছে শয়ে শয়ে শিশু। কিন্তু গাজায় প্রাণীদের জন্যও আর কোনো খাদ্য নেই এ কথা আলোচনা হয় না বললেই চলে। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। রাস্তার ধারে পড়ে থাকা মৃত কুকুরের দেহ অপরিচিত দৃশ্য তো নয়। হাজার হাজার বেড়াল, যাদের গাজার মানুষরা পরিবারে সদস্যের মতো যত্ন করত, তারাও অদৃশ্য হয়ে গেছে। খান ইউনিসের এক পশুচিকিৎসক মাজেদ আল-বায়ুমি জানাচ্ছেন, ‘ওষুধ নেই, খাবার নেই, জল নেই। প্রাণীরাও অনাহারে মরছে, আমাদের মতোই।’ যুদ্ধের আগে গাজায় শতাধিক ছোট-বড় খামার ছিল, যেখানে ডিম, দুধ, মাংস উৎপাদন হতো। আজ হাতে গোনা কয়েকটি খামার টিকে আছে, তাও কেবল নামমাত্রে। গরু ও ছাগলেরা শুকিয়ে মরছে, জল পাওয়া যায় না, আর খাবার থাকলেও তা দূষিত বা বারুদের ধোঁয়ায় বিষাক্ত।
রাফার ছোট্ট চিড়িয়াখানাটি একসময় ছিল গাজার শিশুদের সবচেয়ে আনন্দের জায়গা। এখন সেটি পরিণত হয়েছে প্রাণীর কবরস্থানে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে আছে সিংহের হাড়, খাঁচায় ঝুলে আছে মৃত বাঁদর, আর পাখিদের কঙ্কাল গড়াগড়ি খাচ্ছে ধুলোয়। ২০১৪ সালের যুদ্ধের পরে আন্তর্জাতিক সংগঠন এখানকার কিছু পশু উদ্ধার করেছিল, কিন্তু এবার তারা গাজায় ঢুকতেই পারেনি। তাদের মুখপাত্রের কথায়, ‘এ শুধু হাজার হাজার মানুষ আর প্রাণীদের মৃত্যু নয়, এ এক সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের পতন।’ গাজার সমুদ্রের অবস্থা আরো ভয়াবহ। বিদ্যুৎকেন্দ্র আর নিকাশি ব্যবস্থার ধ্বংসে এখন কাঁচা পয়ঃনিষ্কাশন সরাসরি ঢুকছে ভূমধ্যসাগরে। মাছ মরছে, জলে পচনের গন্ধ। মাছ ধরার নৌকা প্রায় চলেই না। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন— এ দূষণ কেবল গাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ইজরায়েল, মিশর এমনকি লেবাননের উপকূলেও ছড়িয়ে পড়ছে। গাজার ধ্বংস তাই শুধু স্থানিক নয়, তা আঞ্চলিক, এমনকি বৈশ্বিক এক পরিবেশ বিপর্যয়।
গাজার গাধাগুলোও এ যুদ্ধের অচেনা সৈনিক। একসময় জ্বালানি না থাকলে গাধাই ছিল গাজার মানুষদের যানবাহন, পানীয় জল টানার ভরসা, আহতদের বয়ে আনার বাহন। সেই গাধাগুলোর মৃতদেহ পড়ে আছে গলির পাশে। ওরা যতক্ষণ না পড়ে যেত, ততক্ষণ কাজ করত, যখন আমার গাধাটা মারা গেল, আমি বন্ধুবিয়োগের মতো কেঁদেছিলাম।’— বলছিল ১৯ বছরের আনাস। যুদ্ধের আগে গাজায় ছোটো হলেও একটি পরিবেশ দফতর ছিল। তারা মাটির মান, বর্জ্য, জলের বিশুদ্ধতা, সবকিছুর উপর বিশেষ নজর রাখত। সে অফিস ইজরায়েলি হানায় ভস্মীভূত। কোনো পরিকাঠামো নেই, কোনো প্রশাসক জীবিত নেই। যুদ্ধ চলাকালীন জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘গাজার পরিবেশ ধ্বংস এখন এক নতুন ধরনের যুদ্ধ—ইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার, যেখানে লক্ষ্য হচ্ছে জীবনের উপকরণ ধ্বংস করা।’ এই ধ্বংসকে এখন আন্তর্জাতিক আইনে নতুন একটি শব্দে বর্ণনা করা হচ্ছে— ‘ইকোসাইড’ অর্থ পরিবেশের ইচ্ছাকৃত গণহত্যা। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মারিয়া রেসা বলেন, ‘গাজার পরিবেশবিনাশ কোনো রূপক নয়। এটি মাপা যায়—বিষাক্ত বাতাসে, দূষিত ভূগর্ভজলে, মৃত পশুদের দেহে, আর অচাষযোগ্য মাটিতে।’
অজস্র মৃত্যুর মৃত্যু ঘটেছে মমতা বোধেরও। গাজার মানুষ আজ নিজেদের সন্তানদের জন্য খাবার জোগাতেই ব্যর্থ। প্রাণীদের খাওয়ানো তাদের কাছে এখন বিলাসিতা। বেইত হানুনের এক বৃদ্ধের কথা ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে। তিনি নিজের মৃত বিড়ালটিকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন ধ্বংসস্তূপে। তিনি বলছিলেন, ‘ও আমার সঙ্গে খেতো। এখন কারো জন্যই খাবার নেই। ওর জন্যও ছিল না। গাজার আকাশে একসময় উড়ে যেত হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি। বোমারু বিমানের গর্জন থামলেও তাঁর অনুররণে আকাশ এখনো ফাঁকা, স্থির। পরিবেশবিদরা জানাচ্ছেন, ‘পাখিরা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্র এড়িয়ে চলে। তারা ধোঁয়া, শব্দ, আগুন বুঝতে পারে। গাজার আকাশ এখন মৃত, তাই পাখিবিহীন।’
তবু, মৃত্যুর তুফানের ভেতরেও কিছু মানুষ জীবনকে আঁকড়ে ধরছে। এখনো গাজার শিশুদের দেখা যায় আশ্রয়শিবিরে রুটির টুকরো ভাগ করতে বেড়ালের সঙ্গে। কেউ কেউ ভাঙা পাত্রে জল রেখে দেয় রাস্তায়, যাতে কুকুর বা পাখিরা বাঁচে। ফিলিস্তিনি কবি মোসাব আবু তোহা লিখেছিলেন, ‘আজ গাজায় কোনো প্রাণীকে খাওয়ানো মানে প্রতিরোধ। এটা জানান দেয়, জীবন এখনো শেষ হয়নি।’ তাই যুদ্ধ থামলেও গাজার লড়াই শেষ হয়নি। তাদের নতুন করে গড়তে হবে সব। শুধু ঘরবাড়ি নয়, মাটির উর্বরতা, সমুদ্রের স্বচ্ছতা, প্রাণীদের আশ্রয়, আর মানুষ ও প্রকৃতির সেই প্রাচীন বন্ধন। জাতিসংঘের এক পরিবেশ মিশন সতর্ক করেছে—‘পুনর্গঠন যদি পুনর্জীবনহীন হয়, তা হলে তা কেবল বিষমাটির উপর নতুন ধ্বংস তৈরি করবে।’ গাজার ট্র্যাজেডি তাই কেবল রাজনৈতিক নয়, মানবিক নয়— পরিবেশেরও অস্তিত্ব সংকটের আখ্যান।
❤ Support Us







