- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জানুয়ারি ১৩, ২০২৬
আর নয় ১০ মিনিটে ডেলিভারি ! ‘গিগ’ আন্দোলনের চাপে পরিষেবা বদলের পথে কুইক-কমার্স সংস্থাগুলি?
মিনিট দশেকের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, দ্রুতগামী দুনিয়ায় লোভনীয় এক পরিষেবা। এবার সে দৌড়ই শেষ পর্যন্ত থামতে চলেছে ব্লিঙ্কিটের মতো কুইক-কমার্স সংস্থাগ্যুলি ? ‘গিগ’ কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ, কম মজুরি, একের পর এক দুর্ঘটনার অভিযোগ এবং সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে জোরালো দাবি ওঠার পর ১০ মিনিটে ডেলিভারি পরিষেবা বন্ধ হতে চলেছে, এমনটাই দাবি সর্বভারতীয় এক সংবাদমাধ্যমের।
গত কয়েক মাস ধরেই ‘কুইক কমার্স’-এর নামে অতিদ্রুত ডেলিভারি ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। গিগ কর্মীদের অভিযোগ, মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার চাপেই প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। বেপরোয়া গতিতে বাইক চালাতে গিয়ে বহু ক্ষেত্রে প্রাণ হারাচ্ছেন কর্মীরা। আবার সামান্য দেরি হলেই গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের জরিমানা। তার উপর রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার চাপ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব এবং সামাজিক সুরক্ষা না থাকার মতো গুরুতর সমস্যা। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির প্রতিবাদে গত বছরের শেষ দিকে কম মজুরি এবং অবাস্তব দ্রুত পরিষেবার বিরুদ্ধে পথে নামেন দেশের ‘গিগ’ কর্মীরা। একের পর এক ধর্মঘট, কর্মবিরতি আর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বিভিন্ন শহর। শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, ‘গিগ’ অর্থনীতির কাঠামো ক্রমশ কর্মীবান্ধব চরিত্র হারাচ্ছে। সংস্থাগুলির উপর চাপ তৈরি করতেই বারবার আন্দোলনের পথে হাঁটতে হচ্ছে তাঁদের। কর্মীদের দাবি, কারণ না দেখিয়ে ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও বিমার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি কাজের সময়সীমা ও ডেলিভারির সময়সীমা বাস্তবসম্মত করতে হবে।
শ্রমিক আন্দোলনের প্রতিধ্বনি পৌঁছায় সংসদের অন্দরেও। আম আদমি পার্টির সাংসদ রাঘব চাড্ডা শীতকালীন অধিবেশনে গিগ কর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে সরব হন। আমাজন, সুইগি, জোম্যাটো, জেপ্টো, ফ্লিপকার্ট এবং ব্লিঙ্কিটের মতো বিভিন্ন ডেলিভারি অ্যাপের কর্মীদের ডাকা ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানান তিনি। চাড্ডার বক্তব্য ছিল, মানুষের প্রাণের বিনিময়ে দ্রুত পরিষেবা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রবল চাপের মধ্যেই কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী মানসুখ মান্ডব্য কুইক-কমার্স ও খাদ্য সরবরাহকারী সংস্থাগুলির শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, ডেলিভারি কর্মীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে। দ্রুততার প্রতিযোগিতায় যদি প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ে, তা হলে সরকার হস্তক্ষেপ করবেই। বৈঠকের পরই ব্লিঙ্কিট তাদের চিরপরিচিত ট্যাগলাইন বদলে ফেলেছে। ‘১০ মিনিটে ১০ হাজারের বেশি পণ্য’— অ্যাপের এই ব্যানার সরিয়ে দিয়ে, তাতে লেখা হয়েছে, ‘৩০ হাজারের বেশি পণ্য আপনার দোরগোড়ায়’।
কেন্দ্রের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন রাঘব। তাঁর মতে, এ পদক্ষেপ মানবিক এবং সময়োপযোগী। আপ সাংসদ জানিয়েছেন, দ্রুত-বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির ‘১০ মিনিটে ডেলিভারি’ ব্র্যান্ডিং সরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ডেলিভারি কর্মীদের টি-শার্ট, জ্যাকেট বা ব্যাগে বড়ো বড়ো অক্ষরে ‘১০ মিনিট’ লেখা থাকে এবং একই সঙ্গে গ্রাহকের মোবাইলের পর্দায় সময় ছুটতে থাকে বিপরীতে, ওই মানসিক চাপ যে কতখানি তা গ্রাহকরা বুঝতে পারেন না। য়া সিদ্ধান্ত ডেলিভারি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাস্তায় চলাচলকারী সকলের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মত তাঁর। রাঘব জানান, গত কয়েক মাসে তিনি শত শত ডেলিভারি কর্মীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। তাঁদের অনেকেই কম পারিশ্রমিকে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, অবাস্তব সময়সীমা মানতে গিয়ে প্রতিদিন নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। ‘গিগ’ শ্রমিক আন্দোলনে যে সমস্ত নাগরিকরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, মানবজীবন, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানো এ সমর্থনই লড়াইয়ের শক্তি জুগিয়েছে। পাশাপাশি, ‘গিগ’ কর্মীদের উদ্দেশে রাঘব চাড্ডার বার্তা—তাঁরা একা নন, তাঁদের পাশে রয়েছে সমাজ ও সংসদের বড়ো অংশ।
প্রসঙ্গত, হায়দ্রাবাদে এক ডেলিভারি রাইডারের মর্মান্তিক মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে মুখ খুলল দ্রুত-কমার্স সংস্থা জেপ্টো। সংস্থার দাবি, দুর্ঘটনায় নিহত যুবক তাদের ডেলিভারি কর্মী ছিলেন না। দুর্ঘটনার সময় তিনি জেপ্টোর কোনো অর্ডার পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেনও না। সংস্থার বক্তব্য, নিজেদের ডাটাবেস যাচাই, ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি এবং স্টোর নেটওয়ার্কের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ভুল ধারণা তৈরি হওয়ায় মেহদিপাটনম থানার পুলিশের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রেখেছে বলেও দাবি জেপ্টোর। সংস্থার আরো দাবি, জেপ্টোর সমস্ত ডেলিভারি পার্টনারই বিমার আওতায় থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দুর্ঘটনাজনিত বিমা এবং ১ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্য বিমা। তবে এ ঘটনায় কোনো বিমা দাবি করা হয়নি, কারণ নিহত ব্যক্তি তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনাটি ঘটে ৫ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ ব্যস্ত টোলিচৌকি–মেহদিপাটনম সড়কে। মৃতের নাম অভিষেক। তিনি দ্রুত গতিতে বাইকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় পড়ে যান তিনি। সে সময় পেছন থেকে আসা একটি বেসরকারি বাস তাঁকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর। পরে দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ওসমানিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনায় বাসচালককে আটক করেছে পুলিশ। মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে। কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটল, দায় কার, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে বিষয়টি ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজের জেরে অতিদ্রুত ডেলিভারি ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তেলেঙ্গানা গিগ অ্যান্ড প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন দাবি করেছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে জীবন বিপন্ন হচ্ছে ডেলিভারি কর্মীদের। সাম্প্রতিক কালে রাজ্যের একাধিক ডেলিভারি কর্মী দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় উদ্বেগ আরো বেড়েছে। সংগঠনের সভাপতি শেখ সালাউদ্দিন বলেন, ‘১০ মিনিটের ডেলিভারি সময়মতোই করানো হয়, অথচ কর্মীর মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ সময়মতো আসে না। কর্মীরা মানুষ, যন্ত্র নয়।’ তাঁর দাবি, নিহত অভিষেকের পরিবারের জন্য ৫ লক্ষ টাকা এককালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হো। ‘গিগ’ কর্মীদের সুরক্ষায় অবিলম্বে রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, নতুন বছরের শুরুতে কেন্দ্রের তরফে আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘোষণা সামনে এসেছে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ‘গিগ ও প্ল্যাটফর্ম’ কর্মীদের জন্য একশো দিনের কাজের আদলে একটি নতুন প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে মোদি সরকার। এই প্রকল্পের আওতায় ‘গিগ’ কর্মীদের আধার নথিভুক্তিকরণ, ডিজিটাল পরিচয়পত্র এবং সামাজিক সুরক্ষা কোডের সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত ডেলিভারি কর্মী, ক্যাব চালক, স্বাধীন পেশাজীবী এবং অ্যাপ-নির্ভর কর্মীদের জন্য এমন পদক্ষেপকে ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২০ সালের সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত আইনেও ‘গিগ ও প্ল্যাটফর্ম’ কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার স্বীকৃত। চলতি মাসে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রক যে ৪টি শ্রম আইনের খসড়া নিয়ম প্রকাশ করেছে, সেখানেও ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং সামাজিক বিমার আওতায় ‘গিগ’ কর্মীদের আনার কথা বলা হয়েছে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে নয়া চারটি আইন কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্র। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেই ব্লিঙ্কিটের ১০ মিনিটে ডেলিভারি পরিষেবা বন্ধের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও সংস্থার তরফে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি, কবে সেই ঘোষণা আসে, সেদিকেই এখন নজর ‘গিগ’ কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহক, সবারই।
❤ Support Us






