Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • অক্টোবর ১৪, ২০২৬

উৎসবের মরশুমে শিল্পনির্ভর বাংলা ! ৬ হাজার কোটির ফেনল-অ্যাসিটোন কারখানার উদ্বোধন, আরও দুই শিল্পের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
উৎসবের মরশুমে শিল্পনির্ভর বাংলা ! ৬ হাজার কোটির ফেনল-অ্যাসিটোন কারখানার উদ্বোধন, আরও দুই শিল্পের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

উৎসবের মরশুমে বাংলার শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান নিয়ে একগুচ্ছ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে তৈরি দেশের বৃহত্তম ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্বোধন করে তিনি বললেন, ‘আজ ঐতিহাসিক দিন।’ একই সঙ্গে রাজ্যকে শিল্পনির্ভর করে তোলার বার্তা দিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘আমরা বড্ড ভাতানির্ভর হয়ে গিয়েছি। এ জায়গা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’ হলদিয়ায় পেপসির উৎপাদন কেন্দ্র এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির কারখানা গড়ার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি। অন্যদিকে, নদিয়ার হরিণঘাটায় রিলায়েন্স গোষ্ঠীর ক্যাম্পা কোলার কারখানা তৈরির উদ্যোগ ঘিরেও নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে শিল্পমহলে।

বুধবার, চতুর্থীর সকালে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের নতুন ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, অর্থমন্ত্রী স্বপন মজুমদার, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়-সহ একাধিক মন্ত্রী, বিধায়ক ও সাংসদ। ছিলেন হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের চেয়ারম্যান পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় এবং সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর নবনীত নারায়ণও। সংশ্লিষ্ট সংস্থার দাবি, প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে তৈরি এই কারখানায় বছরে ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার টন ফেনল এবং ২ লক্ষ ১৫ হাজার টন অ্যাসিটোন উৎপাদন করা যাবে।

রাসায়নিক শিল্পে এই উৎপাদন কেন্দ্রের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আত্মনির্ভরতার প্রসঙ্গ টেনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, এত দিন ফেনল ও অ্যাসিটোনের জন্য বিদেশের উপর নির্ভর করতে হতো। এ বার দেশেই বিপুল পরিমাণে এই দুই রাসায়নিক উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলো। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, ‘আগে বিদেশ থেকে ফেনল, অ্যাসিটোন আনতে হতো। আজ থেকে সেটা শূন্য হয়ে গেল। এটাই প্রধানমন্ত্রীর আত্মনির্ভর ভারত।’ উল্লেখ্য, ফেনল ও অ্যাসিটোন, দু-টিই বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক। প্লাস্টিক, রজন, ওষুধ, রং সহ নানা ধরনের শিল্পপণ্য তৈরিতে ফেনল ও অ্যাসিটোনের প্রয়োজন হয়। ফলে দেশে এই দুই রাসায়নিকের উৎপাদন বাড়লে সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলির কাঁচামালের জোগান আরও মজবুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার প্রসারেও সুবিধা হতে পারে। তবে তার বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে উৎপাদনের পরিমাণ, বাজারের চাহিদা এবং দেশীয় শিল্পের কাছে সরবরাহের উপর।

এ প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল ২০১৪ সালে। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে উৎপাদন কেন্দ্রটি চালু হওয়াকে সংস্থার বড়ো সাফল্য হিসাবেই তুলে ধরেছেন পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্যের সূত্র ধরেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্গাপুজোর আগে এত বড়ো দিন! আজ ঐতিহাসিক দিন।’ রাজ্যের শিল্পায়নের প্রসঙ্গেও এ দিন জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, ‘এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে আমরা আত্মনির্ভর হয়েছি। সমগ্র পশ্চিমবঙ্গকে আত্মনির্ভর করতে হবে। আমরা বড্ড ভাতানির্ভর হয়ে গিয়েছি। এই জায়গা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এটাই আমাদের আজকের শপথ হওয়া উচিত।’ নতুন কারখানা ঘিরে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও শুনিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে তৈরি এই প্রকল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রায় ১৪০০ জনের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি, রাজ্যে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। যদিও প্রস্তাবিত বিনিয়োগের প্রকৃতি, সময়সীমা এবং কর্মসংস্থানের বিস্তারিত হিসাব এখনো স্পষ্ট নয়।

শিল্পে বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের উপরেও বিশেষ জোর দিতে চান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ রাজ্যে এসে কাজ করতে পারেন। যোগ্য কর্মীদের স্বাগত জানানো হবে। তবে শিল্পের প্রয়োজন মেটাতে স্থানীয় এলাকার দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। এ প্রসঙ্গে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের চেয়ারম্যান পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্যের সূত্র ধরে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়কে একটি দায়িত্ব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। স্থানীয় শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হলদিয়ার আইটিআইগুলির পরিকাঠামো খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগের সঙ্গে স্থানীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সে উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের মান, শিল্পের চাহিদা এবং প্রশিক্ষিত যুবকদের নিয়োগের সুযোগের উপর।

ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্বোধনের মঞ্চ থেকেই হলদিয়ায় আরও দু-টি শিল্প প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চলে ৯৮ একর জমির উপর একটি নরম পানীয় উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি হবে। প্রকল্পটি পেপসির। পাশাপাশি, ৫০ একর জমিতে চিকিৎসা সংক্রান্ত সরঞ্জাম তৈরির কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। দু-টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হলদিয়ায় শিল্পের বহুমুখীকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এত দিন রাসায়নিক ও পেট্রোরসায়ন শিল্পের জন্য পরিচিত হলদিয়ায় পানীয় এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রের প্রসার ঘটলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবহণ, গুদামজাতকরণ, সরবরাহ এবং অন্যান্য সহযোগী পরিষেবাতেও কাজের সুযোগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নতুন দুই কারখানার নির্মাণকাজ কবে শুরু হবে, কবে উৎপাদন চালু হবে, কত জনের কর্মসংস্থান হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি। ফলে আপাতত প্রকল্পগুলি ঘোষণার স্তরেই রয়েছে। বাস্তবায়নের অগ্রগতির উপরেই নির্ভর করবে হলদিয়ার শিল্পাঞ্চলে তার প্রভাব।

হলদিয়ার পাশাপাশি নদিয়ার হরিণঘাটাতেও পানীয় উৎপাদন শিল্পে বড়ো বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। রিলায়েন্স গোষ্ঠী সেখানে ক্যাম্পা কোলার উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে চলেছে। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৮ অক্টোবর, বুধবার, এই কারখানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার কথা। ক্যাম্পা কোলার উৎপাদন কেন্দ্র চালু হলে রাজ্যে পানীয় শিল্পের পরিসর বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহ, প্যাকেজিং, পরিবহণ ও বিপণনের মতো সহযোগী ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।  হলদিয়ায় পেপসির প্রকল্প এবং হরিণঘাটায় ক্যাম্পা কোলার কারখানা — দুটি উদ্যোগই রাজ্যের পানীয় উৎপাদন শিল্পে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই ক্ষেত্রে একাধিক বৃহৎ সংস্থার বিনিয়োগ রাজ্যে উৎপাদন ও সরবরাহের পরিকাঠামোকে কতটা শক্তিশালী করে, তা দেখার অপেক্ষা।

শিল্পের প্রসারের পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দিকেও নজর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। হলদিয়া শিল্পাঞ্চলে দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ৫০ শয্যার একটি ট্রমা কেয়ার ও বার্ন ইউনিট তৈরির ঘোষণা করেছেন তিনি। প্রকল্পটির জন্য ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা জানানো হয়েছে। ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে কেন্দ্রটি তৈরি করার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। বড়ো বড়ো শিল্পাঞ্চলে ভারী যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক পদার্থ এবং দাহ্য উপকরণ নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। ফলে জরুরি চিকিৎসার পরিকাঠামো উন্নত করা শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি চালু হলে দুর্ঘটনাজনিত আঘাত, দগ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণ শেষ করা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার শিল্পায়ন, বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থান দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিল্পের অভাব, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, কাজের সন্ধানে ভিন্‌রাজ্যে চলে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে রাজ্যে নতুন শিল্প গড়ে তোলা ও বিনিয়োগ টেনে আনার প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রেও রয়েছে। বর্তমান উদ্যোগগুলির মধ্যে রাসায়নিক শিল্পে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের নতুন উৎপাদন কেন্দ্রটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগগুলির একটি। এর পাশাপাশি লাক্স কোজির নতুন কারখানা, আমূলের কারখানা তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড়ে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বড়ো বড়ো শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক এবং নিউ টাউনে আদানি গোষ্ঠীর হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

তবে প্রকল্প ঘোষণা আর বাস্তবে শিল্প গড়ে ওঠার মধ্যে ফারাক থাকে। জমি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, অর্থের জোগান, নির্মাণের অগ্রগতি এবং বাজারের চাহিদা — একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে একটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন। একই ভাবে, কোনো কারখানা চালু হলেই সবসময় ঘোষিত সংখ্যক মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়ে যায় না। প্রত্যক্ষ চাকরির পাশাপাশি অস্থায়ী ও পরোক্ষ কাজের সংখ্যা, কর্মীদের বেতন ও স্থানীয় মানুষের নিয়োগের হারও গুরুত্বপূর্ণ। হলদিয়ায় ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্বোধন তাই এক দিকে যেমন রাজ্যের রাসায়নিক শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, অন্য দিকে তেমনই নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেরও পরীক্ষা। পেপসির উৎপাদন কেন্দ্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির কারখানা এবং হরিণঘাটায় ক্যাম্পা কোলার প্রকল্প — সব ক-টির ক্ষেত্রেই এখন নজর থাকবে নির্মাণকাজ শুরুর সময়, উৎপাদন চালুর নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব হিসাবের দিকে। শিল্পায়নের মাধ্যমে বাংলাকে ‘আত্মনির্ভর’ করে তোলার যে বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী, তাতে আশার সঞ্চার যে ঘটল তা নিয়ে সন্দেহ নেই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!